দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে এখন ভয়াবহ তাপপ্রবাহ। দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, পঞ্জাব ও হরিয়ানার বহু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে, কোথাও কোথাও তা পৌঁছেছে প্রায় ৪৮ ডিগ্রিতে। কলকাতার তাপমাত্রার পারদও ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। রাস্তায় বেরলেই গরম হাওয়ার দমকা ঝাপটা। রাতেও মিলছে না স্বস্তি। এই ভয়াবহ দাবদাহে বাড়ছে ডিহাইড্রেশন, হিট এগ্জশন ও হিটস্ট্রোকের আশঙ্কা।
এ সময় ফ্রিজ খুললেই অনেকের প্রথম পছন্দ ঠান্ডা তরমুজ, আঙুর বা আপেল। এক টুকরো ঠান্ডা তরমুজ মুখে দিলেই যেন শরীর জুড়িয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হল—এই ঠান্ডা ফল কি সত্যিই গরমে শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে, নাকি এটা শুধুই সাময়িক আরাম?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিমাণে ও সঠিকভাবে খেলে ঠান্ডা ফল গরমে শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে।
ডায়েটে রোজ থাকুক ফল। ছবি: সংগৃহীত
গরমে ঠান্ডা ফল কেন এত স্বস্তি দেয়?
তীব্র গরমে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে ক্রমাগত ঘাম ঝরায়। ফলে শরীর থেকে দ্রুত জল ও কিছু প্রয়োজনীয় খনিজ বেরিয়ে যায়। এই কারণেই গরমে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা বা অতিরিক্ত তেষ্টা অনুভব হয়।
এই পরিস্থিতিতে জলসমৃদ্ধ ফল শরীরকে কিছুটা হাইড্রেটেড রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে ফ্রিজের হালকা ঠান্ডা ফল শরীরে তাৎক্ষণিক সতেজ অনুভূতি আনে। এতে পেটও ভার হয় না, শরীরেও আসে স্বস্তি।
তবে চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন—ঠান্ডা ফল কোনওভাবেই হিটস্ট্রোকের চিকিৎসা নয়। এগুলো শুধুই শরীরকে কিছুটা আরাম দিতে পারে।
রবফ-ঠান্ডা নয়। ছবি: সংগৃহীত
গরমে কোন ফলগুলো সবচেয়ে বেশি উপকারী?
তরমুজ: গরমের রাজা বলা হয় তরমুজকে। এতে জলের পরিমাণ বেশি। দুপুরের তীব্র গরমে ঠান্ডা তরমুজ শরীরে আনে সতেজতা।
খরমুজ: রসালো ও সহজপাচ্য এই ফল গরমে শরীরকে হালকা রাখে। অতিরিক্ত মিষ্টি না হলেও প্রাকৃতিক স্বাদে ভরপুর।
আঙুর: ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা আঙুর দ্রুত শক্তি ও সতেজতা দিতে পারে। বাইরে থেকে ফিরে অনেকেই এটি খেতে পছন্দ করেন।
কমলালেবু ও মুসাম্বি: এই ধরনের ফলে জলের পরিমাণ বেশি। গরমে ক্লান্ত শরীরে তা স্বস্তি এনে দিতে পারে।
পেঁপে: পেঁপে সরাসরি ঠান্ডা অনুভূতি না দিলেও হজম ভালো রাখতে সাহায্য করে, যা গরমকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রিজ থেকে বের করে সঙ্গে সঙ্গে খাবেন না। ছবি: সংগৃহীত
খুব ঠান্ডা ফল কি শরীরের ক্ষতি করতে পারে?
অনেকেই মনে করেন ফ্রিজের ফল খেলেই সর্দি-কাশি হয়। সাধারণভাবে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এর স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকলেও, অতিরিক্ত ঠান্ডা খাবার গলা বা দাঁতে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যাঁদের সংবেদনশীলতা রয়েছে।
যাঁদের ফুসফুসের ক্রনিক অসুখ রয়েছে বা যাঁদের কোল্ড অ্যালার্জি রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে বরফ-ঠান্ডা ফলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। আবার ঠান্ডা ফল খেয়ে যদি গলা ব্যথা বা সর্দি-কাশির উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলেও ঠান্ডা ফল খাওয়া থেকে দূরে থাকাই শ্রেয়।
তবে সবার জন্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বরফ জমে যাওয়া ফলের বদলে সাধারণভাবে ঠান্ডা করা ফল খান। ফ্রিজ থেকে বের করে কয়েক মিনিট বাইরে রেখে তারপর ফল খান।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল পরিমাণ। অতিরিক্ত তরমুজ বা একসঙ্গে অনেক রকম ফল খেলে পেট ফাঁপা, অস্বস্তি বা হজমের সমস্যা হতে পারে।
একসঙ্গে অনেকটা নয়। ছবি: সংগৃহীত
শুধু ফল নয়, সবচেয়ে জরুরি পর্যাপ্ত জল
গরমে অনেকেই ভাবেন বেশি ফল খেলেই শরীরের জলের চাহিদা পূরণ হয়ে যাবে। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। ফলে জল থাকলেও নিয়মিত পর্যাপ্ত জলপান অত্যন্ত জরুরি। প্রয়োজন হলে ওআরএস, লেবুর শরবত বা অন্যান্য তরলও খেতে হবে। পাশাপাশি দুপুরের কড়া রোদ এড়িয়ে চলা, হালকা পোশাক পরা এবং বিশ্রাম নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ, ঠান্ডা ফল গরমে শরীরকে কিছুটা আরাম দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু দাবদাহ থেকে বাঁচতে শুধু ফলের উপর নির্ভর করলে চলবে না। শরীরকে নিরাপদ রাখতে প্রয়োজন সঠিক হাইড্রেশন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং সচেতনতা।
