দূষিত জল, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন আর বর্ষায় সংক্রমণের বাড়বাড়ন্ত— এই তিনের কবলে ভারতে জলবাহিত রোগ এখন বড়সড় জনস্বাস্থ্য সঙ্কট। গত পাঁচ বছরে দেশে ১ কোটি ৭০ লক্ষেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এ এবং ই, কলেরা এবং লেপ্টোস্পাইরোসিসে। ইন্টিগ্রেটেড ডিজিজ সার্ভিলেন্স প্রোগ্রাম (আইডিএসপি) এবং আইডিএসপি-আইএইচআইপি-র দেওয়া তথ্যে উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক ছবি।
সবচেয়ে বড় আকার ধারণ করেছে ডায়রিয়া। শুধু ২০২১ সালেই দেশে ৬০ লক্ষের বেশি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব, দূষিত খাবার এবং জল দূষণ এখনও দেশের বহু অংশে বড় বিপদের কারণ।
জলেই জীবন, জলেই বিপদ! ছবি: সংগৃহীত
ডায়রিয়া: নীরব বিপদ
জলবাহিত রোগের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা ডায়রিয়ার। ২০২১ সালে ৬০,১৫,৫০৬টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা কমে প্রায় ২৩.৫ লক্ষে এলেও বিপদ এখনও কাটেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ছবি পশ্চিমবঙ্গে। ২০২১ সালে রাজ্যে প্রায় ২০.৬ লক্ষ ডায়রিয়ার ঘটনা ধরা পড়ে। এছাড়া ওডিশা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র এবং কেরলেও সংক্রমণের হার ব্যাপক।
ডায়রিয়ার উপসর্গ
- পাতলা পায়খানা
- পেটে মোচড় বা ব্যথা
- বমিভাব
- অবস্থা গুরুতর হলে জ্বর, বমি, পায়খানায় রক্ত, মাথা ঘোরা, শরীরে জলশূন্যতা, প্রস্রাব কমে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, ডিহাইড্রেশনই ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে।
টাইফয়েড: কয়েক বছরে তিনগুণ বৃদ্ধি
টাইফয়েড এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম জলবাহিত স্বাস্থ্যঝুঁকি। ২০২১ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৯ লক্ষ। ২০২৪ সালে তা পৌঁছয় প্রায় ৬ লক্ষে। মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগঢ় ও কর্নাটকে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা গেছে। বিহার, দিল্লি, তামিলনাড়ু ও উত্তরপ্রদেশেও আক্রান্তের হদিশ মিলছে।
টাইফয়েডের লক্ষণ
- দীর্ঘদিন উচ্চ জ্বর
- মাথাব্যথা
- কাঁপুনি
- খিদে কমে যাওয়া
- পেট ব্যথা
- বমিভাব
- ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য
অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা দেরিতে শুরু হলে অন্ত্রে গুরুতর সংক্রমণ বা সেপসিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
জরুরি বিশুদ্ধ জলপান। ছবি: সংগৃহীত
হেপাটাইটিস এ এবং ই: বাড়ছে লিভারের সংক্রমণ
হেপাটাইটিস এ এবং ই-এর সংক্রমণও দ্রুত বাড়ছে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে। কেরলে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এরপর রয়েছে গুজরাট, দিল্লি ও তামিলনাড়ু।
২০২৪-২৫ সালে হেপাটাইটিস এ-এর সংক্রমণ প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
হেপাটাইটিসের উপসর্গ
- জ্বর
- ক্লান্তি
- গাঁটে ব্যথা
- বমি ও বমিভাব
- পেটব্যথা
- গাঢ় রঙের প্রস্রাব
- ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া (জন্ডিস)
বিশেষজ্ঞদের মতে, দূষিত খাবার ও জল থেকেই এই ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়।
বর্ষার জমা জলেই কলেরার জীবাণুর বাড়বাড়ন্ত। ছবি: সংগৃহীত
কলেরা ও লেপ্টোস্পাইরোসিস: বর্ষাতেই বাড়ে আতঙ্ক
কলেরার সংক্রমণ তুলনামূলক কম হলেও গুজরাটে এর প্রকোপ বেশি। ২০২৪ সালে শুধু ওই রাজ্যেই প্রায় ৬০০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, বর্ষার সময় জল জমা এলাকা ও নর্দমার জলের সংস্পর্শে লেপ্টোস্পাইরোসিস দ্রুত ছড়ায়। কেরল ও তামিলনাড়ু এই রোগের হটস্পট।
কলেরার লক্ষণ
- প্রবল ডায়রিয়া
- অতিরিক্ত তেষ্টা
- দুর্বলতা
- পেশিতে টান
- মাথা ঘোরা
- লেপ্টোস্পাইরোসিসের লক্ষণ
- জ্বর
- চোখ লাল হওয়া
- পেশিতে ব্যথা
- বমি ও ডায়রিয়া
- জন্ডিস
- গুরুতর ক্ষেত্রে ফুসফুস, কিডনি ও লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
চিকিৎসকদের পরামর্শ, উপসর্গ দু থেকে তিন দিনের বেশি থাকলে বা দ্রুত খারাপ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে যদি দেখা দেয়—
- টানা জ্বর
- অতিরিক্ত বমি
- শ্বাসকষ্ট
- মল বা ইউরিনে রক্ত
- শরীরে জলশূন্যতা
- জন্ডিস
- বিভ্রান্তি বা অস্বাভাবিক দুর্বলতা
সময়ে চিকিৎসা শুরু না হলে কিডনি বিকল হওয়া, সেপসিস বা প্রাণঘাতী জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
