‘কুকথা নিয়ে জ্ঞান দিতে গেলে ভেবে বলুন’, বিজেপির উদ্দেশে হুঁশিয়ারি কুণাল ঘোষের

09:05 AM Sep 23, 2022 |
Advertisement

কুণাল ঘোষ: রাজনীতিতে আপত্তিকর শব্দ, কুভাষা, কুরুচির প্রয়োগের বিষয়টি বেশ সামনে চলে এসেছে। অনেকে গেল গেল রব তুলছেন। আগের দিন এবিপি আনন্দে সুমন দে-র ‘যুক্তি তক্কো’তে অংশ নিলাম। বৃহস্পতিবার আনন্দবাজার পত্রিকায় দেবাশিস ভট্টাচার্যর লেখা পড়লাম। কুশব্দ বর্জনীয়, একমত। কিন্তু, পুরনো কথায় না গিয়ে, শুধু সাম্প্রতিক অতীত ধরেও বলি, নিরপেক্ষ আলোচনার বিভ্রান্তিকর মোড়কে তৃণমূলের (TMC) ঘাড়ে দোষ চাপানো ঠিক হচ্ছে না। দেবাশিসবাবু যা লিখেছেন, তার গোদা অর্থ, ইট আগে তৃণমূল ছুড়েছে, জবাবে পাটকেল ছুড়েছে বিজেপি (BJP)।

Advertisement

ভুল। সত্যের অপলাপ।
২০২১ বিধানসভা নির্বাচন (West Bengal Assembly Poll 2021)। ইভটিজারদের মতো মোদিজি বলছেন, ‘ওওওওও দিদি’। তার আগে শুভেন্দু অধিকারী দলবদল করা থেকেই তাঁর এতদিনের নেত্রীকে কী কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ! অভিষেক সম্পর্কে পরের পর কুৎসিত বিশেষণ। পিসি, ভাইপো, গরুচোর, কয়লাচোর, তোলামূল, এজেন্সি, এরপর অমুকের বাড়ি, খোকাবাবু, পরিবার প্রাইভেট লিমিটেড, বেগম – ইত্যাদি নানা শব্দ ও অঙ্গভঙ্গি। বিজেপি আগাগোড়া কুৎসা, কুশব্দ দেখাল। তৃণমূল উন্নয়নের স্কিম তুলে ধরে ভোটে গিয়েছে। জিতেছে। তখন কারও কুশব্দ ঠেকানোর তাগিদ দেখিনি তো? এই কুশব্দ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাচ্ছে শুভেন্দু (Suvendu Adhikari)। এবার তার জবাব গেলে তখন গেল গেল রব? এখন রুচির জ্ঞান? আরও দু-একজন বিজেপি নেতাও বলে চলেছেন। তখন খুব মজা লাগে, না?

[আরও পড়ুন: উত্তরপ্রদেশে গণধর্ষণের পর গর্ভপাত অন্তঃসত্ত্বার, মৃত ভ্রূণ নিয়ে থানায় অভিযোগ জানাল পরিবার]

যে তৃণমূল দল ও সরকারের সবরকম শীর্ষদায়িত্বে ছিল শুভেন্দু, যে দল থেকে তার বাবা, দুই ভাইয়েরও বারবার বড় পদপ্রাপ্তি, হঠাৎ ভোটের মুখে সিবিআই, ইডি এড়াতে সে দলবদল করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেককে আক্রমণ করলে প্রতিক্রিয়া হবে না? আর শুধু দল বা নেতানেত্রী? এখন যে কোনও সাংবাদিক সম্মেলনে অপছন্দের প্রশ্ন হলেই ‘চটিচাটা মিডিয়া’ বলে প্রকাশ্যে গালমন্দ, এটা কোন হরিনামের পর্যায়ে পড়ে? দেবাশিসবাবু এতদিন শুনতে পাননি? সাংবাদিক হিসাবে প্রতিবাদের কোনও কলম দেখিনি তো?

Advertising
Advertising

আমার কথা ধরুন। দলের মুখপাত্র হিসাবে আমি কোনও প্রশ্ন করলে তার জবাব দিতে ব্যর্থ শুভেন্দু বলে, আমি জেলে ছিলাম, তাই জবাব দেবে না। হ্যাঁ, জেলে ছিলাম। শুভেন্দুরা সারদার টাকা নিয়েছিল। আমার কাঁধে বন্দুক রেখে জেলে পাঠানো হয়েছিল। আইনে লড়ছি। তার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক কী? আর জেল যদি খারাপ, তাহলে যে অমিত শাহর (Amit Shah) পা ধরে শুভেন্দু বিজেপিতে গেল, তিনি খুনের মামলায় যখন জেলে ছিলেন, সেটা কি তাজমহল ছিল? শুভেন্দু জেলের ভয়ে দলবদল করেছে, সেটা বীরত্ব?

‘ডোন্ট টাচ মাই বডি’ নিয়ে এত কথা! বিরোধী দলনেতা হাসির খোরাক হবে আর সেটা বলা যাবে না? একসময় আমার সঙ্গে পুলিশের সংঘাত চলত। একবার এভাবেই মহিলা পুলিশ দিয়ে আমাকে ঘেরা হয়েছিল। আনন্দবাজার-সহ বহু মিডিয়ায় ছবি, খবর আছে। আমি ঠান্ডা মাথায় সামলেছিলাম, শুভেন্দুর মতো তিড়িং বিড়িং করে লাফাইনি। আর ‘ডোন্ট টাচ মি’ বলেছিলাম পুরুষ পুলিশকে, প্রতিবাদ করেছিলাম, আমাকে মেরেধরে নিয়ে যেতে হয়েছিল। ওই আলুভাতের মতো একা হেঁটে পুলিশের গাড়িতে উঠিনি।

রইল সমকামী প্রসঙ্গ। আমিও আধুনিকমনস্ক। সমকামিতা অন্যায় নয়। তাঁদের পূর্ণ অধিকার আছে। শুধু শুভেন্দুর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে মেল-ফিমেল বিতর্কের সূত্রে। এটা সামলানোর স্পোর্টসম্যান স্পিরিট নেই? ওরা কুকথা বললে কারও কানে যায় না; আমরা প্রশ্ন দিলে গায়ে ফোসকা? তখন আবার অভিষেকের পিতৃপরিচয় তুলে আক্রমণ? দেবাশিসবাবু লিখেছেন, তৃণমূলের অবিমৃশ্রকারিতাই এহেন পাঁক পলিটিক্সের উৎস। যখন শুভেন্দু ধারাবাহিকভাবে দলকে ‘তোলামূল’ বলে নেত্রী-নেতাকে অকথ্যভাষায় আক্রমণ করছিল, মিডিয়ার একাংশকে ‘চটিচাটা’ বলে, তখন আপনার বিবেক ঘুমোয়?

নবান্ন অভিযানের দিন মহিলা পুলিশকে ধমক শুভেন্দুর।

অভিষেক একবারও কপাল নিশানা করে গুলির নিদান দেয়নি। ও বরং যে উপ-নগরপাল এত মার খেয়েও পালটা গুলি চালাননি, তাঁর সহিষ্ণুতাকে স্যালুট করেছে। এটা করতে গিয়েই ও ওই তুলনাটা দিয়েছে। এই কথাকে বিকৃত করে ব্যাখ্যা করা আপত্তিজনক। এটা বিরোধী দল যা-ও বা করতে পারে, নিরপেক্ষ সাংবাদিক করতে পারেন না।

[আরও পড়ুন: বাংলা মন্ত্রে পুষ্পাঞ্জলি দিলে কোনও দোষ হয়? কী বললেন নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী]

শুভেন্দু আমার ব্যক্তিগত বন্ধু, শত্রু কোনওটাই নয়। ওকে চিনি অনেকদিন, বড়জোর এটা বলতে পারি। কিন্তু ও একটা দল থেকে সবরকম সম্মান পেয়েও একটা সন্ধিক্ষণে দলবদলে পুরনো দল ও নেতানেত্রীদের নামে যে চড়া মাত্রার কুকথা, ব্যক্তিগত আক্রমণ করে চলেছে, দলের মুখপাত্ররা তার জবাব দেবেনই। আমরাও চাই ব্যক্তিগত আক্রমণ বাদ যাক। কিন্তু ওরা করলে হাততালি আর আমরা দু’-একটা কড়া কথা বললে জ্ঞানবিতরণ, এটা হয় না।

গল্প বলি একটা। এক পাড়ার মুরুব্বির কাছে গিয়েছেন রমেনবাবু। বললেন, ‘‘দেখুন পাশের পাড়ার চিত্ত এসে বিনা অধিকারে আমার একতলার দুটো ঘর দখল করে রোজ সন্ধেতে আড্ডা বসায়। ও নাকি আপনার চেনা। আপনি ওকে বারণ করে দিন।’’ মুরুব্বি সব শুনে বিচার করে বললেন, ‘‘রমেনবাবুর দখলে পুরো দোতলা থাক। আর একতলাটা চিত্তর। একদম সমান সমান। চিত্ত, তুই উপরে উঠবি না। আমার এখানে ন্যায়বিচারই হয়।’’ কুকথা নিয়ে কিছু মিডিয়ার ‘সবাই থামুন’ থিওরিটা ঠিক এমন একটা ন্যায়বিচার।

Advertisement
Next