বিদেশে নিষিদ্ধ জেল নেলপলিশের রাসায়নিক, ভারতেও হবে? জানেন, মহিলাদের জন্য কতটা বিপজ্জনক?
Pritimoy Roy Burman
পুজো মানেই নতুন পোশাক, সাজগোজ আর নিজেকে একটু অন্যরকম করে তোলা। সেই সাজের অন্যতম অংশ এখন নেল আর্ট ও জেল ম্যানিকিউর। এতে নখ দীর্ঘক্ষণ চকচকে থাকে, সহজে রং-ও ওঠে না, তাই পুজোর আগে অনেকেই জেল নেলপলিশ করানোর পরিকল্পনা করেন। কিন্তু এই ঝকঝকে নখের নেপথ্যে থাকা একটি রাসায়নিক নিয়েই উঠেছে প্রশ্ন। নাম ট্রাইমিথাইলবেনজয়েল ডাইফেনাইলফসফিন অক্সাইড। সংক্ষেপে টিপিও।
জেল নেলপলিশকে জমাট বাঁধতে বা সেট করতে ইউভি বা এলইডি ল্যাম্পের আলোয় ব্যবহৃত এই রাসায়নিককে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৫ সালে কসমেটিকসে নিষিদ্ধ করেছে। ব্রিটেনেও ১৫ আগস্ট ২০২৬ থেকে টিপিও-যুক্ত নেলপলিশের উৎপাদন ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। কারণ, উচ্চ মাত্রায় প্রাণীদের উপর পরীক্ষায় এই রাসায়নিকের সঙ্গে পুরুষ প্রজননের ক্ষতির যোগ পাওয়া গিয়েছে।
আরও পড়ুন:
টিপিও কী কাজ করে?
টিপিও হল একটি ফটো-ইনিশিয়েটর। সহজ করে বললে, ইউভি বা এলইডি ল্যাম্পের আলো পড়লে এটি রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু করে, যার ফলে তরল নেলপলিশ দ্রুত জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে যায়। জেল ম্যানিকিউরের দীর্ঘস্থায়ী ও সুন্দর ফিনিশ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাই এই উপাদানটি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে টিপিও শুধু নেল কসমেটিকসেই ব্যবহৃত হয় না। বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে আলো দিয়ে দ্রুত শুকনো করা প্রয়োজন এমন কিছু উপাদানেও এর ব্যবহার রয়েছে।
কেন নিষিদ্ধ হল?
টিপিও-কে ঘিরে মূল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে রিপ্রোডাক্টিভ টক্সিসিটি নিয়ে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে দেখা যায়, উচ্চ মাত্রায় দীর্ঘদিন টিপিও খাওয়ানো হলে পরীক্ষাগারের ইঁদুরের লিভার ও কিডনিতে ক্ষতি হয়। পুরুষ ইঁদুরের ক্ষেত্রে টেস্টিকুলার এট্রোফি-ও দেখা যায়।
অন্যদিকে, বিভিন্ন পরীক্ষায় টিপিও-র ডিএনএ বা জিনগত ক্ষতি করার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, রাসায়নিকটি যে মানুষের ক্ষেত্রে সরাসরি ক্যানসার বা জিনগত পরিবর্তন ঘটায়, এমন প্রমাণ নেই।
তাহলে নিষেধাজ্ঞা কেন? কারণ ইউরোপীয় কসমেটিকস আইনে কোনও রাসায়নিককে কারসিনোজেনিক (ক্যানসার সৃষ্টিকারী), মিউটাজেনিক বা রিপ্রোডাক্টিভ টক্সিসিটি (প্রজনন-বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হলে, বাস্তবে মানুষ কতটা পরিমাণে তার সংস্পর্শে আসছে, সেটি বিবেচনার আগেই কসমেটিকসে তার ব্যবহার নিষিদ্ধ করার নিয়ম রয়েছে।
পুজোর আগে একবার জেল নেল পলিশ করালেই বিপদ?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, টিপিও নিয়ে খবর শুনে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রাণীদের উপর যে ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, তা উচ্চ মাত্রার এক্সপোজারের ক্ষেত্রে। সাধারণ গ্রাহক মাঝেমধ্যে নেল ম্যানিকিউর করালে তাঁর এক্সপোজার সেই মাত্রার কাছাকাছি পৌঁছয় না বলেই বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নে মনে করা হয়েছে।
তবে যাঁরা প্রতিদিন পার্লারে এই রাসায়নিকের সংস্পর্শে কাজ করেন, তাঁদের এক্সপোজার তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। তাই পেশাদার নেল টেকনিশায়ানদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশে কী পরিস্থিতি?
ইউরোপ ও ব্রিটেনে নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও ভারতে টিপিও-কে এখনও একইভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফলে ইউভি বা এলইডি-ভিত্তিক জেল নেলপলিশে এই উপাদান থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
পুজোর আগে জেল ম্যানিকিউর করানোর পরিকল্পনা থাকলে তাই পার্লারে ব্যবহৃত নেল পলিশের উপাদান সম্পর্কে জেনে নেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে টিপিও-মুক্ত ফর্মুলা পাওয়া গেলে সেটি বেছে নেওয়া একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হতে পারে।
বিদেশের বাজারে টিপিও-র পরিবর্তে টিপিও-এল-এর মতো বিকল্প ফটো-ইনিশিয়েটর ব্যবহার করে ইতিমধ্যেই অনেক ফর্মুলা তৈরি হচ্ছে। ফলে পুজোর সাজে জেল নেলপলিশ করাবেন কি না, সিদ্ধান্তটা একেবারে ব্যক্তিগত, তবে সাজের সঙ্গে সচেতনতাটুকু থাকলে ক্ষতি কী!