যুদ্ধের পর জনশূন্য, ৬৪ বছর বাদে পর্যটনের হাত ধরে বেঁচে উঠতে চলেছে উত্তরাখণ্ডের ভূতুড়ে গ্রাম
Utsa Tarafdar
খাঁ খাঁ করছে গোটা গ্রাম, যেদিকে চোখ যায়, দেখা মেলে না জনমানবের। রুক্ষ পাহাড়ের কোলে, বিস্তৃত প্রান্তর জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একের পর ফাঁকা বাড়ি, গলিপথ। সাম্প্রতিকতম উদ্যোগে এই তথাকথিত 'ভূতুড়ে' গ্রামটিকেই নতুন করে পর্যটককেন্দ্র করে তোলার প্রয়াস চলছে উত্তরাখণ্ডের (Uttarakhand)!
উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশী জেলার ভারত-চিন সীমান্তের কাছে অবস্থিত জাদুং এবং নেলাং একসময় ছিল জাধ-ভোটিয়া সম্প্রদায়ের বসতি। কৃষিকাজ, পশুপালন এবং তিব্বতের সঙ্গে সীমান্তপারের বাণিজ্য ছিল তাঁদের জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পর নিরাপত্তাজনিত কারণে গ্রাম দু’টির বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। বহু পরিবার পরে বাগোরি, ডুন্ডা-সহ অন্য এলাকায় বসতি গড়ে তোলে। এর ফলে শুধু ঘরবাড়ি নয়, তাঁদের দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রা, জমি ও বাণিজ্যের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন হয়।
আরও পড়ুন:
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলি তাঁদের পূর্বপুরুষের গ্রামে ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়ে চলেছিল। ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় সরকার উত্তরাখণ্ড সরকারকে তাঁদের পুনর্বাসনের দাবি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেয়। এরপর ২০২২ সালে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা জাদুং এলাকায় সমীক্ষা চালান। ধীরে ধীরে গ্রাম দু’টিকে আবার বসবাসযোগ্য করে তোলার পরিকল্পনা করা হয়।
এক্ষেত্রে পর্যটনকেই অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে সরকার। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে উত্তরাখণ্ড মন্ত্রিসভা জাদুংয়ের ছ’টি জরাজীর্ণ বাড়ি সংস্কার করে হোমস্টে হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা অনুমোদন করে। বাড়িগুলির সংস্কারে গ্রামের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলী ও স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হবে। ২০২৪ সালে প্রথম পর্যায়ের প্রকল্পে আনুমানিক ৩.৬৫ কোটি টাকা খরচ ধরা হয়। পরবর্তী সময়ে আরও আটটি হোমস্টে নিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে, যার আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৪.৯ কোটি টাকা।
এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু পর্যটকদের থাকার জায়গা তৈরি করা নয়। ১৯৬২ সালের পর যাঁদের পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তাঁদের জন্য স্থানীয়ভাবে আয়ের সুযোগ তৈরি করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। পর্যটন দফতরের তরফে আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা ও বিপণন সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে শুধু পর্যটক এলেই কোনও পরিত্যক্ত গ্রাম আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে না। সারা বছর আয়, স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা না থাকলে তরুণ প্রজন্ম সেখানে স্থায়ীভাবে ফিরতে চাইবে কি-না, সেটিই বড় প্রশ্ন। আগামী দিনে উত্তরাখন্ড ভ্রমণের প্ল্যান করলে, জাদুং ও নেলাংকে এখন থেকেই রাখতে পারেন বাকেট লিস্টে। কারণ এখানকার প্রাকৃতিক শোভা যে অসামান্য, তা নিয়ে কোনও সন্দেহই থাকে না।