দীর্ঘমেয়াদে ভাল রিটার্নের প্রত্যাশা সব ইনভেস্টররাই করেন। কিন্তু তার চাবিকাঠি কী? খোঁজই বা পাবেন কীভাবে? মুশকিল আসানে নীলাঞ্জন দে
কেন লার্জ ও মিডক্যাপ ফান্ডে বিনিয়োগ জরুরি? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজেছি, ইনভেস্টমেন্ট মহলের নানা কোণে চালু থাকা বিভিন্ন ধারণা এক জায়গায় নিয়ে এসেছি আজকের আলোচনায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্ন পেতে এবং ঝুঁকির ভারসাম্য বজায় রাখতে সাধারণ ইনভেস্টরদের পোর্টফোলিওর এক বড় অংশ লার্জ এবং মিডক্যাপে রাখা দরকার।
● লার্জক্যাপ প্রকল্প দেশের প্রথম সারির একশোটা বড় সংস্থায় বিনিয়োগ করে। এই কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে শক্তিশালী, বাজারে এদের ভিত বেশ মজবুত বলে গণ্য। মন্দার বাজারে এরা খুব সহজে ভেঙে পড়ে না, ফলে লগ্নিকারীদের টাকা তুলনামূলক ভাবে সুরক্ষিত থাকে।
● মিডক্যাপ পোর্টফোলিও বেছে নেয় বাজারের এর পরের ধাপ থেকে দেড়শো মাঝারি সংস্থায়। এই কোম্পানিগুলোর মধ্যে ভবিষ্যতে বড় হয়ে ওঠার এবং দ্রুত গতিতে রিটার্ন দেওয়ার ক্ষমতা থাকে বলে বিশ্বাস করেন প্রফেশনালরা।
● লার্জ ও মিডক্যাপের ‘যুগলবন্দি’ ইনভেস্টরদের কম-বেশি কাজে লাগে; লার্জক্যাপ দিতে পারে স্থায়িত্ব এবং মিডক্যাপ খুলে দিতে পারে বেশি রিটার্ন পাওয়ার দরজা।
● বিশেষজ্ঞদের মতে বাজার সামগ্রিকভাবে চাঙ্গা থাকলে মিডক্যাপ বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে নিয়ে যাবে। আর বাজার সাধারণভাবে পড়লে লার্জক্যাপ বড়সড় পতনের হাত থেকে কিছুটা হলেও বাঁচাবে।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে কোনও ইনভেস্টর দুই ধরনের নীতি বা স্ট্র্যাটেজি বেছে নিতে পারেন। অ্যাক্টিভ এবং প্যাসিভ। অ্যাক্টিভ অনেকেই পছন্দ করেন, তবে ইদানিং প্যাসিভও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। অ্যাক্টিভের ক্ষেত্রে পেশাদার ফান্ড ম্যানেজাররা ও তাঁদের রিসার্চ টিম নিয়মিত বাজারের ওপর নজর রাখেন। তাঁরা নিজেরা বিশ্লেষণ করে যথাযথ ভাবে বেছে নেন, কোন সেক্টর ও স্টক আগামী দিনে ভালো ফল করতে পারে। মিডক্যাপের ক্ষেত্রে (মনে রাখবেন, এখানে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্যের খবরাখবর সাধারণ মানুষের কাছে থাকে না) সক্রিয় ভূমিকা অবশ্যই আছে। ভাল ফান্ড ম্যানেজাররা তুলনায় খারাপ স্টক/সেক্টর বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ভালো পারফর্ম করা নামগুলো বেছে নিতে পারেন। উদ্দেশ্য সহজ: বাজারের সূচক বা ইনডেক্সের চেয়েও বেশি রিটার্ন (যা Alpha বলে পরিচিত) এনে দেওয়া।
ইনডেক্স ফান্ড: সহজ ও কম খরচের রাস্তা
ইনভেস্টর পেশাদার পরিচালকের সিদ্ধান্তের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে না চাইতেও পারেন। তার বদলে তিনি যদি বাজারের গড় রিটার্ন পেতে চান, তাহলে ইনডেক্স ফান্ড তাঁর জন্য সুবিধাজনক। ইনডেক্স ফান্ডের স্ট্র্যাটেজি একেবারেই আলাদা, তা বোঝা বেশ সহজ।
উদাহরণ হিসাবে নিফটি লার্জমিডক্যাপ ২৫০ সূচকের কথা বলা চলে। যদি ইনডেক্স ফান্ড হয়, তাহলে এই বিশেষ ইনডেক্স একেবারে হুবহু অনুকরণ করা হয়। এখানে কোনও ফান্ড ম্যানেজার কিন্ত নিজের পছন্দে স্টক বাছাই করেন না। অথবা বিশেষ কোনও সেক্টরের প্রতি পক্ষপাত দেখান না। সূচকে যে আড়াইশো লার্জ এবং মিডক্যাপ স্টক যেভাবে রয়েছে, সেই অনুপাতেই বিনিয়োগ করা হয়।
এর সবচেয়ে বড় সুবিধা কী? দু'টি পয়েন্ট তোলা যায় এখানে -
* এক, personal judgement অথবা bias থাকে না। তার মানে ব্যক্তিগত ভুল বা অনুমানের কোনো জায়গা নেই। তাই বাজারের স্বাভাবিক বৃদ্ধির সুযোগ এলে তা হাতছাড়া হয় না।
* দুই, ইনডেক্স-ভিত্তিক পোর্টফোলিও চালাতে খরচ কম হয়। তার মানে এক্সপেন্স রেশিও অ্যাক্টিভ ফান্ডের তুলনায় সহনীয় থাকে। দীর্ঘমেয়াদে দেখা গেছে যে এই কম খরচ ইনভেস্টরদের লাভের অঙ্ক বাড়িয়ে দেয়। অতএব আমরা যদি বাজারে নতুন-আসা লগ্নিকারী হই, অথবা মাঝারি ঝুঁকি নিয়ে রিটার্ন খুঁজি, তাহলে লার্জ ও মিডক্যাপ ইন্ডেক্স আমাদের কাজে লাগবে। রিস্ক বুঝে নিয়ে এগিয়ে যেতে বলেন বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞরা। অ্যাক্টিভ এবং ইনডেক্স ফান্ডের ভাল মিশ্রণ খুব কার্যকর হতে পারে। অনেক ইনভেস্টরের জন্য সিস্টেম্যাটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (SIP) সঠিক পদক্ষেপ। ছোট অঙ্কের টাকা দিয়েও শুরু করতে পারেন।
আপনার বয়স এবং আর্থিক লক্ষ্য অনুযায়ী লার্জ ও মিডক্যাপ ফান্ডে কত শতাংশ টাকা রাখা উচিত?
একাধিক প্রফেশনালারের বক্তব্য আমরা সংক্ষেপে সাজিয়ে দিলাম। এখানে একটা সহজ গাইডলাইন দেওয়া হল।
* বয়স ও ঝুঁকির ভিত্তিতে বরাদ্দ -- Asset Allocation
বিনিয়োগের এক সাধারণ নিয়ম হল ‘১০০ মাইনাস আপনার বয়স’। তবে এটা ‘Rule of Thumb’, সাধারণ এক সূত্র। ইনভেস্টরের যা বয়স, তা ১০০ থেকে বাদ দিলে যে সংখ্যা থাকে, তত শতাংশ টাকা ইক্যুইটি মানে স্টক মার্কেটে রাখা যেতে পারে।
তরুণ লগ্নিকারী, ধরা যাক ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সি
এই বয়সে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা সাধারণত বেশি থাকে। নিজের মোট ইক্যুইটি পোর্টফোলিওর ৫০% থেকে ৬০% (মানে বড় অংশই) লার্জ ও মিডক্যাপে রাখতে পারেন। তবে স্মল ক্যাপের জায়গাটাও খুব বিরাট। মনে রাখতে হবে, এর মধ্যে লার্জক্যাপ দেবে স্থায়িত্ব আর মিডক্যাপ দেবে দ্রুত বৃদ্ধির সুযোগ। বাকি টাকা স্মলক্যাপ বা থিমেটিক ফান্ডে রাখা যায়।
মধ্য বয়সি, মনে করুন ৩৬ থেকে ৫০ বছর
এই সময়ে সংসারের দায়িত্ব বাড়তে পারে, তাই সতর্কতা প্রয়োজন। নিজের ইক্যুইটি বরাদ্দের ৬০% থেকে ৭০% এই ক্যাটাগরিতে রাখা যেতে পারে। বাজারে বড় ধরনের ধ্বস নামলেও, পুঁজির নিরাপদ থাকতে পারে।
অবসর জীবনের কাছাকাছি, তার মানে ৫০ বছরের বেশি
এই বয়সে নিজের ক্যাপিটাল সুরক্ষিত রাখা সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হয়। বেশিরভাগ মানুষই সেভাবে প্ল্যান করেন। তাই নিজের পোর্টফোলিওর সিংহভাগ, তা হয়তো ৭০% থেকে ৮০% হতে পারে, লার্জক্যাপে রাখলে ভাল হয়। উদ্দেশ্য, মুদ্রাস্ফীতিকে হারিয়ে নিয়মিত রিটার্ন আনা।
