স্বাধীনতা বিপ্লবে গণেশ চতুর্থীই ছিল লোকমান্য তিলকের অস্ত্র, কীভাবে গণপতি হলেন 'গণনায়ক'?
Buddhadeb Halder
চার দেওয়ালের বাইরে শোনা যেত না ঢাকের কাঠি। আগে কেবল মহারাষ্টের ঘরে ঘরেই পালিত হত গণেশ চতুর্থী। অন্দরমহলের এই পুজোকে বাইরে এনে টানা ১০ দিন উৎসব পালন করার প্রতিভূ বাল গঙ্গাধর তিলক। পরাধীন ভারতে গণআন্দোলনের মশাল জ্বালাতে তিনি দেশের মানুষকে এক ছাদের তলায় আনতে চেয়েছিলেন। আর তা অন্য কোনও উপায়ে সম্ভব ছিল না। জাত-ধর্ম নির্বিশেষে তিনি আমজনতাকে এক সুতোয় বাঁধতে ঘরের গণেশকে নিয়ে এলেন রাজপথের উৎসবে। উনিশ শতকের শেষলগ্নে অবরুদ্ধ ভারতে ধর্মীয় সামাজিক আয়োজনই হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক প্রতিরোধ সংগঠিত করার নীরব অস্ত্র। বিঘ্নহর্তা গণপতির আরাধনায় লুকিয়ে ছিল পরাধীনতার মহাভীতি জয়ের সংকল্প।
১৮৯৩ সালের আগের কথা। মহারাষ্ট্রের ঘরে ঘরে গণেশ চতুর্থী পালিত হত নিভৃত ঠাকুরঘরে। ছিল একদিনের পুজো। প্রধানত ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের গৃহস্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এই আচার। তিলক দেখলেন, ব্রিটিশ রাজপুরুষেরা রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ ও জনজমায়েতের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু ধর্মীয় উৎসবে হস্তক্ষেপ করতে তারা দ্বিধাগ্রস্ত। এই সুযোগটিকেই তিনি গণআন্দোলনের সোপান হিসেবে বেছে নিলেন।
আরও পড়ুন:
তিলক উপলব্ধি করেছিলেন, আবেদন-নিবেদন বা ভিক্ষা করে স্বরাজ মেলে না। লালা লাজপত রায়, বিপিনচন্দ্র পাল ও বাল গঙ্গাধর তিলকের তৈরি ‘লাল-বাল-পাল’ অক্ষের দর্শন ছিল স্পষ্ট— স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে হবে। ঘরের পুজোকে তিলক নিয়ে এলেন রাজপথে। একদিনের পুজো বদলে গেল ১০ দিনের বারোয়ারি মহোৎসবে। মণ্ডপে মণ্ডপে গণপতির রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে আবাহন ঘটল ‘জনগণেশ’-এর।
পুজোর এই মঞ্চ থেকেই ধ্বনিত হতে লাগল ব্রিটিশ বিরোধী রাজনৈতিক সুর। জাতীয়তাবাদী থিম, স্বদেশী গান এবং স্বরাজের বার্তা পৌঁছে গেল দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে। দশম দিনে আরব সাগরের জলে ধুমধাম করে গণেশ বিসর্জনের শোভাযাত্রা কার্যত রূপ নিল প্রতিরোধ পদযাত্রায়।
এই কৌশলী পদক্ষেপে ভেঙে গেল বহুদিনের সামাজিক প্রাচীর। ব্রাহ্মণ, উচ্চবর্ণ, দলিত ও অব্রাহ্মণ— সব শ্রেণিকে তিলক এক ছাতার তলায় নিয়ে এলেন। ১৮৮১ সালে জি জি আগরকারের সঙ্গে যৌথভাবে প্রতিষ্ঠিত ‘কেশরী’ (মারাঠি) এবং ‘মহারাট্টা’ (ইংরেজি) পত্রিকার মাধ্যমে যে জাতীয়তাবাদী চেতনার বীজ তিনি বুনেছিলেন, গণেশ উৎসবের মাধ্যমে তা রূপ নিল বিশাল মহীরুহে। তুষের আগুন পরিণত হল স্বরাজের জ্বলন্ত মশালে।