মানুষ-বন্যপ্রাণ সহাবস্থানেই বাজিমাত! জঙ্গলমহলের প্রথম অভয়ারণ্য হচ্ছে পুরুলিয়ায়
Sucheta Sengupta
মানুষ ও বন্যপ্রাণীদের মধ্যে সহাবস্থানেই কেল্লাফতে! এই অস্ত্রকে কাজে লাগিয়ে জঙ্গলমহলে এই প্রথম অভয়ারণ্য গড়ছে রাজ্য। বনমহল পুরুলিয়ার কোটশিলা বনাঞ্চলের সিমনি ও নোয়াহাতু বিট এবং ঝালদা বনাঞ্চলের কলমা বিটকে ঘিরে ৩৬০৯.৪০ হেক্টরের ২১ টি মৌজা জুড়ে এই অভয়ারণ্য বিস্তৃত হবে। মানুষ ও বন্যপ্রাণের সহাবস্থান হবে যার মূল বৈশিষ্ট্য। সাধারণভাবে অভয়ারণ্য গড়তে গেলে একাধিক গ্রামকে স্থানান্তর করতে হয়। কিন্তু এই মেগা প্রকল্পে কাউকেই ভিটেমাটি ছাড়তে হচ্ছে না। যেভাবে ২০২২ থেকে কোটশিলা ও ঝালদা বনাঞ্চলের ওই তিন বিট সংলগ্ন গ্রামের মানুষজন চিতাবাঘের ঘর-সংসার আগলে রেখেছেন, এ যেন তারই উপহার!
সিমনি বিটে চিতা বাঘ। ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়া ছবি। পুরুলিয়া বনবিভাগ থেকে সংগৃহীত।
বন্যপ্রাণ ও জঙ্গল নিয়ে ওই গ্রামগুলির মানুষজনের উপর আস্থা রয়েছে পুরুলিয়া বনবিভাগের। গত ৪ বছরের বেশি সময় ধরে চিতাবাঘ গ্রামে হানা দিয়ে তাদের একের পর এক গরু খেয়ে ফেললেও শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণটুকু ছাড়া একজনেরও কোনও ক্ষোভ নেই। বরং তাদের একটাই কথা, জঙ্গলে চিতাবাঘ তো থাকবেই! জানা যাচ্ছে, এহেন সহাবস্থানকে ভিত্তি করে পুরুলিয়ায় অভয়ারণ্য তৈরির ডিটেলস প্রজেক্ট রিপোর্ট ইতিমধ্যেই অরণ্য ভবনে জমা পড়েছে। এই রিপোর্ট রাজ্য বন বিভাগের কাছে জমা পড়ার আগেই পুরুলিয়ার সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো অভয়ারণ্যের ওই প্রস্তাবিত এলাকা নিজে ঘুরে দেখেছেন। এই বিষয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে দরবারও করেন। অরণ্য ভবন সূত্রে খবর, এটি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। সবুজ সংকেত পাওয়া শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা।
আরও পড়ুন:
পুরুলিয়া বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া ওই বনাঞ্চলে আনুমানিক পূর্ণবয়স্ক ৬ টি চিতাবাঘ ও তিনটি শাবক রয়েছে। এছাড়া ভাল্লুকের (স্লথ বিয়ার)সংখ্যা কমবেশি ১০টি। পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী প্রাণী বিরল হানি ব্যাজার রয়েছে প্রায় ৫০ টি। সেইসঙ্গে মরীচিকা বিড়ালের ১০টি আবাসস্থল চিহ্নিত করা গিয়েছে। তারা একসঙ্গে থাকতে ভালোবাসে। এছাড়া প্যাঙ্গোলিন, হায়না, বার্কিং ডিয়ার, সজারু, বন্য শূকর তো রয়েইছে।
বনদপ্তরের আশা, সব কিছু ঠিক থাকলে চলতি আর্থিক বছরের মধ্যেই জঙ্গলমহলের প্রথম অভয়ারণ্যের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়ে যাবে। রবিবার পুরুলিয়ায় আসছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। প্রশাসনিক বৈঠকে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে বলে প্রশাসন সূত্রে খবর। এনিয়ে সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো বলেন, ‘‘এই বিষয়ে আমি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করেছি। বিষয়টি প্রক্রিয়ায় রয়েছে। পুরুলিয়ার বনাঞ্চল এখন ভীষণভাবেই সমৃদ্ধ।"
কোটশিলা ও ঝালদার ওই বিস্তীর্ণ এলাকা বহুদিন ধরেই হাতির করিডর। তাদের দীর্ঘদিনের আবাসস্থল। ক্যামেরা ট্র্যাপের আগেও ওই এলাকায় ভাল্লুকের মুখোমুখি হয়েছেন এই অঞ্চলের একাধিক মানুষ। সাতের দশকের শেষের থেকে আটের দশকের গোড়ায় ওই এলাকায় একটি চিতাবাঘের আসা-যাওয়া থাকলেও পরবর্তীকালে তার অস্তিত্ব বোঝা যায়নি। ২০২২ সালের একেবারে গোড়া থেকে জঙ্গলে গবাদি পশুর মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার পর ফেব্রুয়ারিতে ক্যামেরা ট্র্যাপে চিতাবাঘের ছবি ধরা পড়ে। তারপর থেকে তাদের বিচরণ চলছেই।
পুরুলিয়া বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া ওই বনাঞ্চলে আনুমানিক পূর্ণবয়স্ক ৬ টি চিতাবাঘ ও তিনটি শাবক রয়েছে। এছাড়া ভাল্লুকের (স্লথ বিয়ার)সংখ্যা কমবেশি ১০টি। পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী প্রাণী বিরল হানি ব্যাজার রয়েছে প্রায় ৫০ টি। সেইসঙ্গে মরীচিকা বিড়ালের ১০টি আবাসস্থল চিহ্নিত করা গিয়েছে। তারা একসঙ্গে থাকতে ভালোবাসে। এছাড়া প্যাঙ্গোলিন, হায়না, বার্কিং ডিয়ার, সজারু, বন্য শূকর তো রয়েইছে। সেই সঙ্গে ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ওই বনাঞ্চল রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের 'সাইলেন্ট করিডর' বা নিঃশব্দ বিচরণ ক্ষেত্র। পায়ের ছাপ থেকে মূত্র, গাছে নখের আঁচড়ের একাধিক প্রমাণ পেয়েছে পুরুলিয়া বন বিভাগ।
এছাড়া ঝালদা বনাঞ্চলের কলমা বিট এলাকায় ১৮৮.২৭ হেক্টর জুড়ে ঔষধি গাছ রয়েছে, যা অভয়ারণ্যের প্রকল্পে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই অভয়ারণ্যের মধ্যে থাকবে নেচার বার্ড ট্রেইল, ট্রেকিং রুট, জলাধার, টাওয়ার, ইকো গাইড, রক ক্লাইম্বিং, ক্যাম্পিং, প্রকৃতি পাঠশালা। জিপসি সাফারিতে পর্যটক ভ্রমণ ও সেইসঙ্গে বিদেশি পর্যটকদের টেনে আনতে প্রজাপতি বাগানের প্রস্তাবও রয়েছে। অভয়ারণ্যের প্রস্তাবিত এলাকা সমন্বিত সংরক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় এনে আবাসস্থল সুরক্ষা, প্রবেশ ও দাবানল নিয়ন্ত্রণ, জল- মাটি সংরক্ষণ ও নিয়মিত বন্যপ্রাণ পর্যবেক্ষণ থাকবে।
এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে ১৫ টি যৌথ বন পরিচালন কমিটি। এছাড়া একটি নির্দিষ্ট গবেষণা এবং নজরদারি অঞ্চল তৈরি করা হবে। যেখানে স্থায়ী ভেজিটেশন প্লট, ক্যামেরা ট্র্যাপ ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণ চলবে। সেওতি জলপ্রপাত-সহ সেখানে যে শিব মন্দির রয়েছে, তাকে ঘিরে যে ইকো ট্যুরিজম হবে তা স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্মতি ও সুরক্ষা নিশ্চিত করেই। সিমনি এলাকার বাসিন্দা অজিত কিসকু, দামোদর কিসকুরা বলেন, ‘‘অভয়ারণ্য হলে সত্যি আমাদের তা পুরস্কার বা উপহার হবে। এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতিও বদলে যাবে।"