দেবীপক্ষমহানগররাজ্যবিদেশখেলালাইফস্টাইল
Smallpox

লাল মৃত্যুর ছোবল! গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কারের নেপথ্যে আশ্চর্য এক গ্রাম

এই অসুখের মৃত্যুহার ছিল ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজন আক্রান্তের মধ্যে একজনের মৃত্যু ছিল অবধারিত।
Biswadip Dey
05:48 PM Oct 03, 2026 IST
এই অসুখের মৃত্যুহার ছিল ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজন আক্রান্তের মধ্যে একজনের মৃত্যু ছিল অবধারিত।
ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

এক-দুই বছর নয়। তিন হাজার বছর! পৃথিবীজুড়ে মানুষকে নীল আতঙ্কে দগ্ধ করেছে 'লাল প্লেগ'। যাকে আমরা আরও ভালো চিনি গুটিবসন্ত বা স্মলপক্স নামে। ভয়াল এই অসুখের মৃত্যুহার ছিল ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজন আক্রান্তের মধ্যে একজনের মৃত্যু ছিল অবধারিত। আর যারা প্রাণে বাঁচত তাদের অনেককেই অন্ধ হয়ে কাটাতে হয়েছে বাকি জীবন। গোটা শরীরের বিশ্রী কুৎসিত দাগ তো আছেই। ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই রোগটিকে পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল বলে ঘোষণা করেছে। আর এর নেপথ্যে রয়েছে ইংল্যান্ডের এক গ্রাম! এই অসুখের টিকা আবিষ্কার করেছিলেন এডওয়ার্ড জেনার। সেই কাহিনি সত্যিই আশ্চর্য।

কোথা থেকে এল এই বিশ্রী অসুখ? আজও এর উত্তর জানা যায় না। তবে মনে করা হয়, আজ থেকে দশহাজার বছর আগে মানুষ যখন প্রথম কৃষিজীবী হল, সেই সময় থেকেই এই ধরনের অসুখের প্রাদুর্ভাবের আশঙ্কা যেন চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল। বেশ কয়েক হাজার বছর ধরে গবাদি পশু প্রতিপালন চলতে চলতে আচমকাই গরু-ছাগলের দেহের ভাইরাস মানুষের শরীরেও ছড়াতে শুরু করে। আর সেই সময়ই কোনও ভাবে গুটিবসন্তের হামলা শুরু। তবে এমন মতামতও আছে, প্রথম এই ভাইরাস জন্ম নিয়েছিল ইঁদুরের দেহে। যদিও তা নিশ্চিত করে বলা যায়নি। কিন্তু এটা নিশ্চিত যে, এই অসুখ বহু আগে থেকেই পৃথিবীতে ছিল। এমনকী ভারতেও। 'শুশ্রুত সংহিতা'তেও উল্লেখ মেলে রোগটির। এবং আশ্চর্যের বিষয় হল ১৭৩৫ সালে জাপানের এক-তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা খতম করে দেওয়া এই অসুখের কোনও ওষুধ কিন্তু আজও নেই! কিন্তু ওষুধ ছাড়াই এর থেকে অব্যাহতি পেয়ে গিয়েছে মানুষ। আর সেই কারণেই জেনার সাহেবের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার কোনও শেষ নেই। সেই সঙ্গেই উল্লেখ করতে ইংল্যান্ডের এক গ্রামের কথাও, যার নাম গ্লস্টারশায়ার। তবে সেকথায় যাওয়ার আগে 'লাল মৃত্যুদূত' নিয়ে আরও কিছু কথা।

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

১৫০০ সাল নাগাদ যখন ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা মেক্সিকো ও আমেরিকাতে পৌঁছয়, সেখানকার ৯০ শতাংশ আদিবাসীর মৃত্যু হয় গুটিবসন্তে ভুগে। মনে করা হয়, প্রতি বছর পৃথিবীজুড়ে ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হত গুটিবসন্তে ভুগে, সেই পুরনো পৃথিবীতে। আসলে এই অসুখ ছিল সাংঘাতিক ছোঁয়াচে। সহজেই ছড়াত। কেউ হাঁচলে, কাশলে সেই ড্রপলেট থেকে ছড়িয়ে পড়ত। থুতুর স্যালাইভা থেকেও ছড়াত। গুটি থেকেও। আক্রান্তের পোশাকআশাক, বিছানার চাদর থেকেও ছড়াত। শুরুতে কেবল সর্দিকাশি। তারপর গুটি বেরনো শুরু হত। ক্রমে তা বড় বড় হয়ে উঠত। মাথাব্যথা, বমি, জ্বর, কোমরের যন্ত্রণা, ক্লান্তি। প্রচণ্ড কষ্টের মধ্যেই একসময় প্রাণটা বেরিয়ে যেত শরীর থেকে। করুণ, বিষাক্ত মৃত্যুর সেই ছবি সকলের মনের মধ্যে জাগিয়ে রাখত নির্নিমেষ আতঙ্কের জলছাপ। কত সাম্রাজ্য ধসে পড়েছিল এবং সম্পূর্ণ সভ্যতা লোপাট হয়ে গিয়েছিল স্রেফ ওই এক ভাইরাসের মরণকামড়ে।

১৫০০ সাল নাগাদ যখন ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদীরা মেক্সিকো ও আমেরিকাতে পৌঁছয়, সেখানকার ৯০ শতাংশ আদিবাসীর মৃত্যু হয় গুটিবসন্তে ভুগে। মনে করা হয়, প্রতি বছর পৃথিবীজুড়ে ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হত গুটিবসন্তে ভুগে, সেই পুরনো পৃথিবীতে।

অথচ এই রোগমুক্তির একটা সম্ভাবনা কিন্তু গোড়া থেকেই ছিল। কিন্তু মানুষ তার সন্ধান পায়নি শতকের পর শতক। মনে রাখতে হবে, 'লাল প্লেগে'র নেপথ্যে ছিল ভ্যারিওলা ভাইরাস। এগুলো একধরনের অর্থোপক্স ভাইরাস। এই ভাইরাসই মাঙ্কি পক্স, গরুর পক্সের নেপথ্যে। ১৭৯৫ সালে এডওয়ার্ড জেনার দেখতে পান, ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ার গ্রামে কখনও কারও স্মলপক্স হয় না! গোটা পৃথিবীর মধ্যে কেন ওই এক গ্রামে এমনটা ঘটে? জেনার সাহেব বুঝতে পারছিলেন না। ক্রমে তাঁর মাথায় খেলে যায় একটা বিষয়। তিনি জানতে পারেন ওই গ্রামের অনেকেরই শরীরে কাউপক্স হয়েছে। এও অর্থোপক্স ভাইরাসেরই সংক্রমণ! কিন্তু তত ভয়ংকর নয়। ফলে অল্প কিছুদিন ভোগার পর সেরেও উঠতেন তাঁরা। এবং সেই সময়ই তাঁদের শরীরে তৈরি হয়ে যেত অনাক্রম্যতা বা ইমিউনিটি। আর এই ধারণা থেকেই তিনি আন্দাজ করলেন, আক্রান্তদের ফোস্কার পুঁজ তাঁদের গুটিবসন্তের হাত থেকে বাঁচায়। আর সেইমতো, ১৭৯৬ সালে আট বছরের ছোট্ট ছেলে জেমস ফিপসের শরীরে টিকা দিলেন তিনি। সারা নেলমস নামে জনৈক গোয়ালিনীর হাত থেকে গুটিবসন্তের ফোসকার পুঁজ সংগ্রহ করে টিকা প্রস্তুত করেছিলেন তিনি। এই টিকাদানের পর ফের ওই বালকের শরীরে আর 'কামড়' বসাতে পারেনি ভাইরাস। 

এখানে একটা কথা বলা দরকার। এদেশেও অতীতে একটা পেশা ছিল। যাদের বলা হত টিকাদার। বাকি বিশ্বেও ছিল। তাদের কাজ ছিল, আক্রান্তের ফোসকার পুঁজ নিয়ে গিয়ে সুস্থ লোকের শরীরে তা স্পর্শ করানো। এতে তিনি আক্রান্ত হলেও সেরে উঠলেই সারা জীবনের মতো অনাক্রম্যতা তৈরি হয়ে যেত তাঁর শরীরে। আসলে এটা মোটামুটি লক্ষণীয় বিষয় ছিল, একবার স্মলপক্স হলে দ্বিতীয়বার আর তা হয় না। সেখান থেকেই এই পদ্ধতি অবলম্বন করা শুরু হয়। একে বলা হয় ইনঅকুলেশন। কিন্তু এতে সমস্যাও ছিল। এবং তা গুরুতর। অনেক সময়ই আক্রান্ত ব্যক্তি আর সেরে উঠতেন না। মারা যেতেন। কিন্তু জেনার সাহেবের টিকা, যাকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম ভ্যাকসিন, সেখানে আর মরার ভয়টা থাকত না। যদিও এরপরও বহুদিন ধরে সারা পৃথিবীতে থেকে গিয়েছিল স্মলপক্স। কিন্তু ১৯৮০ সালে শেষপর্যন্ত মানুষ সফল হয় ওই 'অদৃশ্য ঘাতক'কে বশ করতে। নেপথ্যে থেকে যায় প্রায় দুশো বছর আগের জেনার সাহেব ও গ্লস্টারশায়ার গ্রামের অবদান। তবে শেষের আগে একটা অদ্ভুত ঘটনা বলা দরকার। মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, টিকা আবিষ্কারের পরও কেন এতদিন লাগল ওই ভাইরাসকে পরাস্ত করতে? 

এই অসুখের মৃত্যুহার ছিল ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি তিনজন আক্রান্তের মধ্যে একজনের মৃত্যু ছিল অবধারিত। আর যারা প্রাণে বাঁচত তাদের অনেককেই অন্ধ হয়ে কাটাতে হয়েছে বাকি জীবন। গোটা শরীরের বিশ্রী কুৎসিত দাগ তো আছেই।

আসলে মানুষকে বিশ্বাস করানোই যে ছিল অত্যন্ত কঠিন যে, টিকায় কোনও ভয় নেই। যেমন, ইংল্যান্ডে সবাই ভাবতে শুরু করে, ওই টিকা নিলে কান দুটো গরুর মতো হয়ে যাবে! এমনকী ল্যাজও গজাবে। মুখটা হয়ে যাবে গরুর মতোই! কেননা মানুষ জেনেছিল গরুর রসসঞ্জাত উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে টিকায়। ফলে টিকার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে পড়ল বহু মানুষ। শেষে কঠোর আইন করে তবে টিকা দেওয়া সম্ভব হয়। এহেন 'বিদঘুটে' বিরোধের পাল্লায় পড়েই সময় লেগেছিল সব মানুষকে টিকা দিতে। 

Advertisement
দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Tags :
PoxScars
Advertisement
Tags :
PoxScars

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন