রোনাল্ডো, আপনি এখন ২০ মিনিটের প্লেয়ার! মেনে নিতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে

12:41 PM Dec 08, 2022 |
Advertisement

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক:
শ্রদ্ধাস্পদেষু
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো,
রোনাল্ডো, আপনি এখন ২০ মিনিটের প্লেয়ার! কাতার বিশ্বকাপের প্রি কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে আপনাকে যখন মাঠে পাঠানো হল, তখন ঘড়ি বলছে ম্যাচের বয়স ৭৪ মিনিট। গ্যালারিতে প্রবল হর্ষধ্বনি, করতালি, ভক্তদের কানফাটা চিৎকার। পর্তুগাল ততক্ষণে ৫-১ গোলে এগিয়ে। ম্যাচ পকেটে পুরে ফেলেছে। ওই পাঁচটি গোলের সময়েও এত হর্ষধ্বনি শোনা যায়নি গ্যালারি থেকে। গ্যালারির শব্দব্রহ্ম, আপনাকে সবুজ গালচেতে দেখার জন্য ভক্তদের আকুতিই বলে দিচ্ছিল, প্রথম একাদশে জায়গা না হলেও, ফের্নান্দো স্যান্টোসের আস্থা হারালেও, আপনি এখনও ভক্তদের ‘হৃদয়ের রাজা’। এখনও তাঁদের আরাধ্য দেবতা।

Advertisement

সুইসদের হাফ ডজন গোল দিয়ে পর্তুগাল (Portugal) কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটে ফেলেছে। অথচ গোলদাতাদের তালিকায় নেই আপনি! আপনার নাম তন্নতন্ন করে খুঁজছিলাম। নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পর্তুগাল ছ-ছ’টি গোল করল অথচ তাতে আপনার একটা গোলও নেই! স্মরণকালের মধ্যে এমন দৃশ্য তো দেখাই যায়নি। 

[আরও পড়ুন: আপনার ড্রয়িংরুমেও থাকতে পারে বিশ্বকাপ, প্রথমবার ট্রফির রেপ্লিকা বিক্রি করছে ফিফা]

 

ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldo), নিন্দুকরা কিন্তু বলতে শুরু করে দিয়েছেন, ”আপনি খুব ভাল। কিন্তু আপনাকে ছাড়া এই পর্তুগাল আরও ভাল।” বিশ্বাস করুন চ্যাম্পিয়ন মর্মে আঘাত লাগছে। আমার মতো আপনার ভক্তদের হৃদয় রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত। গতকালের রাতের পরে অনেকেই বলছেন, ”পর্তুগালের কি সত্যিই আপনাকে দরকার?” আপনি আসার আগে এবং পরে দলের খেলার মধ্যে জমিন-আসমান পার্থক্য দেখতে পেলাম যে! আপনাকে ছাড়া জোয়াও ফেলিক্স, র‍্যামোসরা খরস্রোতা নদী। ডানা মেলে খোলা আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখির দল। পর্তুগিজদের ফ্রি ফ্লোয়িং ফুটবল ভেসে গেল সুইজারল্যান্ড। অথচ আপনি আসার পরে সেই ফুটবল কোথায় যেন হারিয়ে গেল।

Advertising
Advertising

রোনাল্ডো, আপনি শুধু তারকা নন। আপনি মহাতারকা। বারংবার ব্যবহৃত হতে হতে মহাতারকা শব্দটাও হয়তো ক্লিশে হয়ে গিয়েছে। তার থেকেও বড় যদি কোনও বিশেষণ থাকে, তাহলে আপনি তাই। আপনি থাকলে সবাই কেমন যেন সিঁটিয়ে থাকেন। ডিফেন্স, মাঝমাঠ থেকে রোনাল্ডো নম্ঃ বলে বল ভাসিয়ে দেওয়া হয়। দল হিসেবে ধরা দেয় না পর্তুগাল। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো ভেবে দেখার সময় মনে হয় এখন এসে গিয়েছে। আপনি গ্রহান্তরের এক শিল্পী ফুটবলার। যে কোনও সময়ে ম্যাচের গতিপ্রকৃতি বদলে দিতে পারেন। সেই আপনিই রিজার্ভ বেঞ্চে! মানতে পারছি না। বড্ড কষ্ট হচ্ছে। বিশ্বমঞ্চে আপনি রিজার্ভ বেঞ্চে পাংশু মুখে বসে থাকবেন আর আপনার দল মাঠে ফুল ফোটাবে, এ তো দেখতে খারাপ লাগবেই। দেওয়াললিখন পড়ে ফেলেছেন নিশ্চয়। রাজ্যপাট হারাচ্ছেন সম্রাট। সামনে বসে দেখছেন নতুন এক তারার আবির্ভাব। আপনার পরিবর্তে নেমে র‍্যামোসই নায়ক বনে গেলেন। স্যান্টোসকে আশ্বস্ত করে দিয়ে গেলেন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, র‍্যামোসের প্রথম গোলটা দেখার পরে আপনার উদাস দৃষ্টি কিন্তু গোটা বিশ্ব দেখে ফেলেছে। প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, আপনি নাকি মেনে নিতে পারছিলেন না। সত্যি কি তাই? আপনি কি আত্মপ্রেমী? রোনাল্ডোকে ছাড়াও পর্তুগাল গোল করতে পারে, এই সত্য কি গিলতে কষ্ট হচ্ছিল? অথচ পেপের গোলের পরেই আপনি তো লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে উঠে পড়লেন বন্ধুর কাঁধে। আগের প্রজন্ম কখনওই স্বীকৃতি দেয় না পরের প্রজন্মকে। এটাই নিয়ম। হয়তো আপনিও মানতে পারছিলেন না। আপনিও তো রক্তমাংসেরই একজন মানুষ। খেলার শেষে গোটা দল যখন মাঠে ভিকট্রি ল্যাপ দিচ্ছে, তখন আপনি গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। মাঠ ছাড়ার আগে র‍্যামোসকে অভিনন্দন জানিয়ে গেলেন বটে। কিন্তু রোনাল্ডো, আপনার সেই অভিনন্দন কিন্তু বাকি পৃথিবীর কাছে অধরাই থেকে গেল। মাঠ ছেড়ে আপনি যখন টানেল দিয়ে অপসৃয়মান হচ্ছেন, তখন ভক্তের ঢল নেমেছে আপনাকে দেখার জন্য। রোনাল্ডো, এই জীবন তো সার্থক। ভক্তদের ভালবাসা আপনার জন্য রেড কার্পেট বিছিয়ে দিয়ে গেল। তা সে আপনি যতই রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকুন না কেন! র‍্যামোসের গোল এবং আপনাকে ছাড়া পর্তুগালের বড় জয়ের পরে মিক্সড জোনে সাংবাদিকরা আপনাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, ”আর ইউ হ্যাপি?” এক মুহূর্ত না ভেবে আপনি বলেছিলেন, ”ইয়েস, ইয়েস। পর্তুগাল জিতেছে তো।” বুঝিয়ে দিলেন আপনি প্রকৃত টিমম্যান।

রোনাল্ডো, আপনি একবার তাচ্ছিল্য করে বলেছিলেন, ”আমি রেকর্ডের পিছনে ছুটি না, রেকর্ড আমার পিছনে ছোটে।” আপনি ঠিকই বলেছেন। ফুটবলমাঠে আপনি একেকটা গগনচুম্বী অট্টালিকা তৈরি করেছেন। বাকি পৃথিবীর কাছে তা ধরাছোঁয়ার বাইরে। রোনাল্ডো আপনি কি জানেন ৬৭৪৭ দিন বাদে আপনাকে রিজার্ভ বেঞ্চে বসতে হল? ফিটনেসের শেষ কথা আপনি। আপনি পা দিয়ে কবিতা লেখেন, আপনাকে ছাড়া জাতীয় দল ভাবাই যায় না। সেই আপনি-ই কিনা সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে বাকিদের সঙ্গে রিজার্ভ বেঞ্চে বসে ম্যাচ দেখলেন! নামলেন ৭৪ মিনিটে। অতিরিক্ত সময় দেওয়া হল চার মিনিট। সেভাবে দেখলে মিনিট ২০ বা তার সামান্য কিছু বেশি বা কম আপনি মাঠে ছিলেন। অথচ ১৮ বছরের ইতিহাসে এমন ঘটনাও তো ঘটেনি! বড় কোনও টুর্নামেন্টে আপনাকে বেঞ্চে রেখে শুরুই করেনি পর্তুগাল। শেষবার ২০০৪ সালে ইউরো কাপে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে শেষবার রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। তখনও অবশ্য আপনি আজকের রোনাল্ডোর মতো ক্যারিশম্যাটিক হননি। তার পরে বড় কোনও টুর্নামেন্টে আপনাকে মাঠের বাইরে বসিয়ে রাখার সাহস কেউ দেখাননি। ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে আপনার যখন তীব্র সংঘাত চলছে, তখনও আপনি জাতীয় দলের প্রাণভোমরা। কাতার বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচটাই সব হিসেব উলটপালট করে দিল।

জানেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, কাল খুব চাইছিলাম আপনি মাঠে নেমে একটা কিছু করুন। একটা অন্তত গোল করুন। তার পরে সেই বিখ্যাত উদযাপন শুরু করুন। তার মধ্যে দিয়েই নিন্দুকদের, সমালোচকদের যা জবাব দেওয়ার দিয়ে দিন। আপনি নেমেই যখন ফ্রি কিকটা পেলেন তখন চোখে ভেসে উঠছিল চার বছর আগের সেই স্পেন ম্যাচ। আপনার নেওয়া নাকল শট! যা র‍্যামোসদের মানবপ্রাচীরকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে জালে জড়িয়ে গিয়েছিল। ভাবছিলাম সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধেও ওরকমই কিছু একটা করবেন আপনি। কিন্তু আপনার কামান দাগা শট সুইজারল্যান্ডের মানবপ্রাচীরে আঘাত লেগে প্রতিহত হল। আপনার হতাশ মুখটা দেখে বড্ড খারাপ লাগছিল। আপনি কেমন একটা যেন হাসি দিলেন। সেই হাসির অর্থ আপনিই কেবল বলতে পারবেন! তবে আপনার হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ফ্রি কিক যখন নিতে গিয়েছিলেন তখন আপনার গা গরমও হয়নি। ব্রাজিলের জিকোও তো নেমে পেনাল্টি নষ্ট করেছিলেন। তার ফল হয়েছিল মারাত্মক। কাল রাতে আপনি বড্ড বেশি করে কিছু একটা করতে চাইছিলেন। একটা বল আপনি বাঁ পায়ে মেরে সুইজারল্যান্ডের জালে জড়ালেন। কিন্তু সেই গোল বাতিল হয়ে গেল আপনি আফসাইডে ছিলেন বলে। আপনি তাকাচ্ছিলেন বলের গতিপথের দিকে। বলটা জালে জড়ানোর পরে মুখের অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করলেন। আপনার মন পড়তে পারছিলেন সবাই।

আপনার কোচ ফের্নান্দো স্যান্টোস বলছিলেন, ”এখনও কিছু বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাকি আছে। রোনাল্ডোর সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুবই ভালো, সব সময়ই ছিল। ১৯ বছর বয়স থেকে ওকে চিনি। রোনাল্ডো ও আমার মধ্যে কোনও ভুল বোঝাবুঝি নেই। রোনাল্ডোকে আমি এখনও দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার হিসেবেই বিবেচনা করি।” এতে কি বরফ গলার ইঙ্গিত পাওয়া গেল?

রোনাল্ডো, এই বিশ্বকাপে নামার আগে পিয়র্স মরগ্যান আপনাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ”ধরে নাও বিশ্বকাপ ফাইনালে মুখোমুখি তুমি আর মেসি। তুমি দুটো গোল করলে মেসি দুটো ফেরত দিল। শেষ মুহূর্তে তুমি গোল করে পর্তুগালকে বিশ্বকাপ এনে দিলে।” রোনাল্ডো, আপনি বলেছিলেন, ”এতো ভাল স্বপ্ন আমি আগে কখনও দেখেননি। আর এরকম হলে আমি সঙ্গে সঙ্গে খেলা ছেড়ে দেব। অবসর নিয়ে নেব।” 

[আরও পড়ুন: বাবাকে যথাযথ সম্মান জানাচ্ছে না আর্জেন্টিনা! মেসিদের উপর রেগে লাল মারাদোনার মেয়ে]

ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, বলতে খুব খারাপ লাগছে, আপনার চিরপ্রতিদ্ব্ন্দ্বী লিও মেসি কিন্তু ইতিমধ্যেই আপনাকে ছাপিয়ে চলে গিয়েছেন। তাঁকে রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে রাখার সাহসও দেখাবেন না স্কালোনি। তিনি মাঠে হাঁটছেন, হাঁটতে হাঁটতে প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করছেন। অনেকে আবার বলছেন, কোনও মেলায় যেন হেঁটে বেরাচ্ছেন মেসি! নিন্দুকরা তো কত কথাই না বলেন, তাই না! ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো কালকের রাতের দৃশ্য দেখার পরে আমার মতো অনেক ভক্তেরই তো আবেগ গলায় দলা পাকিয়ে আসছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে আপনাকে তুলে নেওয়ার পরে কেন আপনি কোচ ফের্নান্দো স্যান্টোসের সংঘাতে জ়ড়াতে গেলেন? কেন? কেন? তার আগে ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড কোচ এরিক টেন হ্যাগের সঙ্গেও আপনার ব্যক্তিত্বের সংঘাত লেগে গিয়েছিল। নিন্দুকরা বলছেন, কোচকে সম্মান জানানো উচিত রোনাল্ডোর। আপনি কাঁটার রাস্তা অতিক্রম করে আজকে এই জায়গায় পৌঁছেছেন। রেকর্ডের ওই প্রাসাদোপম অট্টালিকা তৈরি করতে অনেক ঘাম ঝরাতে হয়েছে আপনাকে। আপনি বিলক্ষণ জানেন কাকে শ্রদ্ধা করতে হয়!

রোনাল্ডো, আপনি এখন আর মধ্যগগনের সেই সূর্য নন। সূর্যের সেই তেজ আর নেই। আপনি এখন কেরিয়ারের পড়ন্ত বেলার সূর্য। অনেক মোলায়েম। আপনি নিশ্চয় জানেন, দেহ পট সনে নট, সকলি হারায়। আপনি ফুরিয়ে এসেছেন, এ কথা মানবে না কেউ। এখনও অগুনতি ভক্ত স্বপ্ন দেখেন, ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আপনি আবার ফিরবেন ফিনিক্স পাখি হয়ে। সেই অসম্ভবের মহাকাব্য কি লিখবেন আপনি?

ইতি
আপনার এক অনুরাগী
কৃশানু মজুমদার

[আরও পড়ুন: ‘রোনাল্ডোই রোল মডেল’, হ্যাটট্রিকের নজির গড়ে বললেন পর্তুগালের নয়া তারকা র‌্যামোস]

Advertisement
Next