শিরে সংক্রান্তি নেপালের! ৪ হিমবাহ হ্রদের জল কমানোর কাজ শুরু, বিপজ্জনক আরও ১৭
Subhodeep Mullick
শিরে সংক্রান্তি নেপালের! বিপর্যয় এড়াতে পাহাড়ের খাঁজে তৈরি চারটি হিমবাহ হ্রদের জল কমানোর কাজ শুরু করেছে দেশটি। তবে আরও ১৭টি হিমবাহ হ্রদ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসে নেপালে যে বিপর্যয় দেখা দিয়েছিল ভবিষ্যতে ওই হ্রদগুলির বাঁধ ভেঙে এর চেয়েও বড় দুর্যোগ ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একইসঙ্গে ভারতের একটি হিমবাহ হ্রদকেও সর্বোচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রাখা হয়েছে।
নেপালে হিমবাহ হ্রদের বিপর্যয় ঘটলে ভাসতে পারে ভারতের বিহার-সহ গৌড়বঙ্গ এবং মুর্শিদাবাদ। গবেষকদের একটি সূত্রের খবর, উঁচু পাহাড়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদগুলি নিয়ে ২০২০ সালে 'ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট' ও রাষ্ট্রসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির যৌথ প্রতিবেদনে হিমালয় অঞ্চলের ৪৭টি হ্রদকে বিপজ্জনক চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে নেপালের ২১টি, তিব্বতের ২৫টি এবং ভারতের একটি হ্রদ রয়েছে। ভারতের ঝুঁকিপূর্ণ হ্রদটি রয়েছে উত্তরাখণ্ডের কালী অথবা মহাকালী নদীর অববাহিকায়। এটিকে ‘র্যাঙ্ক-১’ অর্থাৎ সর্বোচ্চ ঝুঁকির হ্রদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
বিশেষজ্ঞদের মতে, হ্রদটির আয়তন দ্রুত বাড়তে পারে এবং এর বাঁধের বাইরের দিকে খাড়া ঢাল রয়েছে। জলের স্তর হ্রদ উপচে পড়লে বড় ধরনের ভূমিধস হতে পারে। এতে নদী উপত্যকায় ভয়ঙ্কর হড়পা বানের বিপর্যয় ঘটবে। কালী নদী উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় বন্যায় দুই রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ২০২০ সালে প্রতিবেদন প্রকাশের পর কোশী ও গণ্ডকী অববাহিকার চারটি হ্রদের জলস্তর কমানোর উদ্যোগ নেয় নেপাল সরকার। হ্রদগুলি হল - সোলুখুম্বুর লুমডিং শো, হোঙ্গু-২, সংখুয়াসাবার লোয়ার বরুণ এবং মানাংয়ের থুলাগি হ্রদ। প্রকল্পে প্রায় পাঁচ কোটি ডলার বরাদ্দ করা হয়। নেপাল সরকারের দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত ২৩ লক্ষ মানুষ উপকৃত হবে।
গবেষকরা অবশ্য জানিয়েছেন, নেপালে দু'হাজারের বেশি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। গত ২৬ আগস্ট ভোটেকোশি নদীতে যে বন্যা হয়েছিল তার নেপথ্যেও উঁচু পাহাড়ে বরফ গলে হিমবাহ ধসের ফলে তৈরি হওয়া অস্থায়ী হ্রদের বিপর্যয়কে দায়ী করা হয়। অথচ বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন থেকে নেপালে হিমবাহ হ্রদগুলির বিপর্যয়ের সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। এরপর কিছু হ্রদের জলস্তর কমানোর কাজ শুরু হলেও অর্থের অভাবে অনেক প্রকল্প এগোয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। যেসব হ্রদের জলস্তর ১০ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত কমানো প্রয়োজন, অনেক ক্ষেত্রে সেখানে মাত্র ৩ থেকে ৪ মিটার জল কমানো সম্ভব হয়েছে। ফলে সমস্যা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, জলস্তর যথেষ্ট পরিমাণে কমানো না হলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের হড়পা বান ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটতে পারে। অবশ্য ২৬ আগস্ট বিপর্যয়ের পর দু'টি বিপজ্জনক হ্রদের বাড়তি জল বের করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন নেপালের জ্বালানি, জলসম্পদ ও সেচমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ। পাশাপাশি, তিনি নিশ্চিত করেছেন, সরকার দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ হ্রদগুলির জলস্তর কমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। 'গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড'-এর অর্থ সাহায্যে ওই কাজ চলতি বছরেই নেপালের 'জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ'-এর সহযোগিতায় এগিয়ে নেওয়া হবে।
জানা গিয়েছে, নেপাল চারটি হিমবাহ হ্রদের জলস্তর কমানোর কাজ শুরু করলেও দেশটিতে আরও ১৭টি হিমবাহ হ্রদ রীতিমতো বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। ওই হ্রদগুলোর বাঁধ ভেঙে যে কোনও সময় হড়পা বান দেখা দিতে পারে বলে সতর্কতা বিশেষজ্ঞদের। সেটা হলে ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ বিপদে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিন্দুকুশ হিমালয়ের হিমবাহগুলো মোট আয়তনের প্রায় ১২ শতাংশ এবং আনুমানিক বরফের পরিমাণের ৯ শতাংশ হারিয়েছে। ফলে ১৯৭৫ সাল থেকে বরফের পরিমাণ ২৭ মিটার পর্যন্ত কমেছে। উষ্ণায়নের জেরে এই বিপদ বেড়েই চলেছে। এরই পরিণতিতে হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে, হিমবাহ হ্রদ বিপর্যয়ের ঘটনা পাঁচগুণ বেড়েছে। প্রতি দশকে গড়ে ৭টি থেকে বেড়ে ৩৮টিতে দাঁড়িয়েছে। এই সমীক্ষা এই অঞ্চলের প্রায় ৪০৭টি হিমবাহ হ্রদকে সম্ভাব্য বিপজ্জনক এবং ফেটে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা হিসাবেও চিহ্নিত করেছে।