আশার ছলনে ভুলি

01:51 PM May 21, 2022 |
Advertisement

কথা-কে কাজে রূপান্তরিত করতে না পারায় কংগ্রেসের রেকর্ড রয়েছে। গত বছরের অক্টোবরে কংগ্রেস জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে পদযাত্রার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শেষমেশ, তাদের সমস্ত গলাবাজি সীমাবদ্ধ থেকে গেল টুইটারেই। ফলে, কংগ্রেসের ‘চিন্তন শিবির’ ও তার আলোচনা-পর্যালোচনার বহর নিয়ে সন্দেহ থাকাটা জায়েজ। লিখছেন রাজদীপ সরদেশাই

Advertisement

googletag.cmd.push(function() { googletag.display('div-gpt-ad-1652782001027-0'); });

‘প্রতিবার একই কাজ করে ভিন্ন ফলের আশা করা করাই পাগলামি।’ এই উক্তিটি আদৌ অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের কি না, জানা নেই। তবে কথাটি তাঁর নামেই প্রচলিত। তা সে যা-ই হোক, গত দশ বছর ধরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের হাল এই উদ্ধৃতি দিয়ে দারুণ ব্যাখ্যা করা যাবে। ঠিক যে-কারণে, দেশের এই ‘গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি’-কে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে তাদের আয়োজিত ‘চিন্তন শিবির’ ও তার আলোচনা-পর্যালোচনার বহর নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ তৈরি হয়েছে। আর, হবে নাই-বা কেন। যে-দল একের পর এক পরাজয়ে ভূলুণ্ঠিত, এবং সেসব পরাজয় থেকে কোনওরকম শিক্ষা নিতে যারা ব্যর্থ, এবং গত আট বছরে রাজনীতির খোলা ময়দান থেকে যারা বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারল না- সেই কংগ্রেস দল উদয়পুরের এক পাঁচতারা হোটেলে তিনদিন ধরে খাপছাড়া এককাট্টা হয়ে আলোচনায় কী এমন বদল আনতে পারবে বলে মনে হয়?

[আরও পড়ুন: জ্ঞানবাপীর ঘোলাটে ভাগ্যাকাশ, কোন দিকে মোড় নেবে ভবিষ্যত?]

মিটিংফিটিং সেরে, আমাকে এক যুব কংগ্রেস (Congress) নেতা বললেন, বিপ্লব এল বলে- এবার কিছু একটা হবেই! সত্যি বলতে, কংগ্রেসের ‘উদয়পুরি চেতাবনি’ শুনলে দেখা যাবে সেখানে আন্তরিক আহ্বান ও ঘোষণার ছড়াছড়ি, কিন্তু খেলা ঘোরানোর মতো কোনও পরিকল্পনার নামগন্ধ সেখানে নেই। এই যেমন, সেখানে, বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার মোকাবিলায় কংগ্রেস সমর্থক তথা কংগ্রেসিদের উদ্দেশে বলা হচ্ছে- ‘ভারতীয়তা’ ও ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর ধারণাবেত্তা আত্মস্থ করো। বোঝা গেল, কিন্তু তা দিয়ে ‘নতুন’ ভারতের কাছে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’-এর আবেদন বাড়ানো যাবে কী করে? দুর্ভাগ্যবশত, তার কোনও আলোকপাত নেই।

Advertising
Advertising

googletag.cmd.push(function() { googletag.display('div-gpt-ad-1652782050143-0'); });

আরও ধরা যাক, ‘একটি পরিবার, একটি টিকিট’-এর মতো ‘বৈপ্লবিক পদক্ষেপ’। প্রথমে মনে হবে, ওরেব্বাস- এরকম পরিবারতন্ত্রে বেড়ে ওঠা একটা দল, যেখানে দেশজুড়ে লতায়-পাতায় পরিবারতন্ত্রেরই উপস্থিতি- এই স্বজনপোষণের প্রবৃত্তি এবার কমবে নিশ্চিত। কিন্তু তারপরেই দেখা যাবে, একটি শর্ত সেখানে চোখ তুলে উঁকি দিচ্ছে- আরেকজন পারিবারিক সদস্যকে নির্বাচনী লড়াইতে নামতে গেলে, কমপক্ষে পাঁচ বছর ধরে ‘দৃষ্টান্তমূলকভাবে’ পার্টির হয়ে কাজ করতে হবে নির্বিকল্প চিত্তে। এই নিয়মের মধ্য দিয়েই তো প্রধান দায়িত্বে অধিষ্ঠিত গান্ধী-ত্রয়ীর দায়িত্বে থাকার রাস্তা খোলা হয়ে যায়। আর অন্যান্য পারিবারিক কংগ্রেসি তো রয়েছেই। পরিণতি? তথৈবচ!

বলা হয়েছে, পার্টির ৫০ শতাংশ পদ, সর্বক্ষেত্রে ৫০ বছর বয়সের কম পার্টি সদস্যদের জন্য বরাদ্দ হবে, এমনকী, ‘কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি’-র মধ্যেও। এবং সমস্তরকম পদের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের সীমা ধার্য। দলের যুব কমিটি এমনকী, সমস্ত নির্বাচিত পদের জন্য, ‘অবসরের বয়স’ নির্ধারণেরও প্রস্তাব রেখেছে। ঠিক যেমনটা বিজেপির সফল ‘মার্গ-দর্শকমণ্ডল’ প্রকল্প। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তসূচিতে কোনওরকম বয়সসীমা উল্লিখিত হয়নি। এবং, যে যে সদস্য বহু বছর ধরে রাজ্যসভার সদস্যের অবস্থানে রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা কীভাবে নির্ধারিত হবে, কিংবা সীমা বিবর্ধিত হবে কি না, তা অনালোচিত। এই অস্পষ্টতা থেকে বুঝতে পারা যায়, এখন কংগ্রেস খানিক গা বাঁচিয়েই ঘুঁটি সাজাতে চাইছে।

মনে করে দেখুন, কংগ্রেস একটা প্রবৃদ্ধ দল হিসাবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। ১৯৯৮ সাল থেকে এর ওয়ার্কিং কমিটি-তে কোনও নির্বাচন হয়নি। সেখানের সংসদীয় বোর্ড নিষ্ক্রিয়। সেখানে সাংগঠনিক নির্বাচন বারবার মুলতবি রাখা হয়েছে। সেখানে বছরের পর বছর বারবার ব্যর্থতার পরও অনেকেই এক পদেই গেড়ে বসে আছেন। এবং সোনিয়া গান্ধী পার্টির হর্তাকর্তা প্রধান হয়ে আছেন প্রায় ২৫ বছর হয়ে গেল। মোদ্দাকথা, এই পার্টির অবস্থা বোঝাতে একটি ফ্রেঞ্চ উদ্ধৃতি বেজায় মনে পড়ছে- প্লু সা সঁজ, প্লু সে লা মেম সুজ- অর্থাৎ, পরিস্থিতি যত বেশি বদলায়, এরা ততই একরোখা ও এক থাকার চেষ্টায় মত্ত হয়ে থাকে।

পার্টি যেখানে বিলুপ্তপ্রায় অবস্থায় দাঁড়িয়ে, সেখানে এরকম গড়িমসি পরিবর্তনের পন্থায় কোনও লাভ আছে? সম্ভবত, কংগ্রেসের উভয়সংকট অবস্থার সবচেয়ে আচমকা স্বীকারোক্তি এসেছিল রাহুল গান্ধীর থেকে। পার্টির ভিতরে তিনি চোখ রেখে বুঝতে পেরেছিলেন এবং স্বীকার করেছিলেন যে, মানুষজনের সঙ্গে পার্টির যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। যে কারণে, কংগ্রেসের ভোট-ভাগ গত দশ বছর ধরে একইরকম থেকে গিয়েছে।

এখন মূল প্রশ্ন: এই গণসংযোগ ফিরিয়ে আনা যাবে কী করে? চিন্তন শিবিরে কংগ্রেস ঘোষণা করল, মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন, ২ অক্টোবর থেকে, ‘কন্যাকুমারী টু কাশ্মীর ভারত জোড়ো’ যাত্রা শুরু হবে। একথা মানতেই হবে, গণসংযোগ বা কথোপকথনে যাওয়ার উপায় রূপে পদযাত্রা অতুলন। আর তার মধ্য দিয়ে হতাশ সদস্যদের উৎসাহিত করাও যাবে।

যদিও, একটা পিছিয়ে পড়া রাজনৈতিক দলকে ফের স্টেজের মাঝে টেনে আনতে গেলে শুধুমাত্র মহাত্মা গান্ধীকে প্রতীকায়িত করে দেশজোড়া যাত্রার আয়োজন করলেই তো হল না। ১৯৯০ সালে লালকৃষ্ণ আদবানির রাম জন্মভূমি যাত্রা কার্যকর হয়েছিল কারণ, এর বার্তা ছিল পরিষ্কার- নিখাদ হিন্দু জাগরণ। এই ‘নতুন’ ভারতে, মূলগত ভাবধারা কীভাবে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে, সেই নিয়ে একচ্ছত্র অঙ্গীকার বার্তা না থাকলে, কেবলমাত্র মহাত্মা গান্ধীর শান্তি ও ঐক্যের বাণী দিয়ে কংগ্রেস কোনও রাস্তা তৈরি করতে পারবে না। সফল পুনরুত্থানের জন্য চোখ-ধাঁধানো আখ্যান চাই। চাই বিশাল সংখ্যক সমর্থকের সংহতি। আর দরকার এক অনন্যসাধারণ নেতৃত্বর, যিনি কিনা পরিচিত কোলাহল-নিন্দার প্রতিধ্বনি পেরিয়ে মানুষকে এককাট্টা করবেন। এই মুহূর্তে, সর্বক্ষেত্রে কংগ্রেসের মধ্যে এগুলির অভাব রয়েছে। তার উপর রয়েছে আদর্শগত দ্বিধা, হতাশাগ্রস্ত সমর্থক, এবং অনুপ্রেরণায় ব্যর্থ নেতৃত্ব। যার ফলে, কথা-কে কাজে রূপান্তরিত করতে কংগ্রেস রীতিমতো হাবুডুবু খাচ্ছে। মনে করে দেখুন, গত বছরের অক্টোবর মাসে কংগ্রেস দাবি করেছিল- জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তারা একটানা প্রতিবাদে নামছে। এমনকী, এই তরজায় পদযাত্রার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। কিন্তু শেষমেশ, রাস্তায় নামা তো দূর, তাদের সমস্ত গলাবাজি টুইটারেই সীমাবদ্ধ থেকে গেল।

যা আমাদের ওই একটি কথায় ফিরিয়ে আনে- নেতৃত্বের অভাব। চিন্তন শিবিরে, এটাই অবশ্যম্ভাবী ছিল যে, রাহুল গান্ধীই পার্টির একমাত্র নেতা। তা, এই ‘গান্ধী’ কুলতিলক থেকে বোঝাই যায়, পার্টি তাঁর পরিবার। একইসঙ্গে, তিনি আরএসএস-বিজেপির আদর্শের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বটে, কিন্তু তাঁর সংস্কারমূলক ভাবধারা নিয়ে তিনি পার্টির দীর্ঘকালীন গেড়ে বসে থাকা ভাবনাচিন্তা ও লোকজনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবেন কি না, সেই নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। ক্ষমতার খিদে কংগ্রেসের ভালই। কিন্তু উলটোদিকে ক্ষমতার রাজনীতি প্রয়োগে রাহুল গান্ধীর মধ্যে রয়েছে প্রত্যয়ের অভাব। ফলে, কংগ্রেস একটা টানাপোড়েনের মধ্যে আটকে থাকছে সেই। এবং কবে নির্বাচনী-ভাগ্যে একটা জাদুকরি কিছু ঘটে যাবে, সেই অপেক্ষায় দিন গুনছে।

একইরকম অনিশ্চয়তা ভবিষ্যতের ক্ষমতার রাজনীতিতে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ওয়াধেরার অংশগ্রহণ প্রক্রিয়াতেও। উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে তাঁর জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাজেভাবে খোলসা হয়ে গিয়েছিল বটে, কিন্তু সিদ্ধান্ত-নিরূপণে তিনি এখনও বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সম্মুখসমরে দায়িত্ব নেবেন, না কি তাঁর ভাইকেই সমস্ত গুরুদায়িত্ব সঁপে দেবেন প্রিয়াঙ্কা? আর সোনিয়া গান্ধীর প্রসঙ্গে যে কথাটি আসে- তিনি কি আধা-অবসরপ্রাপ্ত হয়ে একেবারে বিলীন হয়ে যাবেন, না কি বৈরিতায় ভরপুর একটা দলকে আপাতত সংঘবদ্ধ রাখার সৌভাগ্য-প্রতীক হয়ে থেকে যাবেন?

সত্যি বলতে, বিজেপি যদি ‘চিরকালীন মেরুকরণ’-এর দায়ে সাব্যস্ত হয়, তাহলে কংগ্রেস দলটাকে পুরোপুরি জড়ভরত করে দেওয়া ও পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দেওয়ার দায় বর্তায় কংগ্রেসের বিশেষ নেতৃত্বর উপর। উদয়পুরের চেতাবনি থেকে অন্ততপক্ষে কংগ্রেসে সর্বস্তরে পুনর্জাগরণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হল। কিন্তু রাতারাতি একটা ঘ্যাড়ঘেড়ে জগদ্দল অ্যাম্বাসাডর কোনওরকম কঠিন কসরত ছাড়াই কি ছিপছিপে ‘বিএমডব্লিউ’ হয়ে যেতে পারে? যে-কারণে, কোনওরকম পদযাত্রার ডাক দেওয়ার আগে, কংগ্রেসের সেই চিরাচরিত আত্মভ্রমাত্মক রূপকথা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে যে, একটি পরিবারই পারে ভারতকে ‘উদ্ধার’ করতে! ‘নতুন’ ভারত ‘প্রাচীন’ কংগ্রেসের এই অঙ্গীভূত পরিবারতন্ত্রের রাজনীতিকে অস্বীকার করেছে। ভারতকে ‘উদ্ধার’ করার কথা ভুলে যাও, হে কংগ্রেস, আগে এই জরদ্‌গব স্থিতাবস্থার শেষ লেখো।

পুনশ্চ, গত আট বছরে কংগ্রেসের নামে অগণিত অবিচুয়ারি লেখা হয়েছে। ‘আমরা যদি মরে গিয়েই থাকি, তাহলে মিডিয়া কেন এখনও আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পড়ে আছে ভাই?’ এক বরিষ্ঠ কংগ্রেসি তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুড়লেন। আমার তৎক্ষণাৎ উত্তর ছিল: কারণ ভারতের গণতন্ত্র একটি শক্তসমর্থ বিরোধী শক্তি চায়। আর সেক্ষেত্রে ভারতব্যাপী পরিচিত রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে কংগ্রেসের যথেষ্ট দায়িত্ব রয়েছে।

[আরও পড়ুন: আবার একটা ‘চিন্তন শিবির’, তবুও কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কি ধূসর?]

Advertisement
Next