বাংলাদেশের রাজনীতি, সুশীল সমাজ ও শিক্ষাঙ্গণে ইসলামবাদের যে দীর্ঘ ছায়া পড়েছে, তা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকেও ছাড় দেয়নি। গত মাসে বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমির এক অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান সামরিক জীবনে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিক আদর্শ মেনে চলার উপর জোর দিয়েছেন। কট্টরপন্থা যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে তার আরও এক উদাহরণ হল, সেনা ব্যাটেলিয়নের ৪টি কোম্পানির নাম রাখা হয়েছে ইসলামের প্রথম ৪ খলিফার নামে। যাকে একত্রে বলা হয় 'খোলাফায়ে রাশেদিন'। পাকসঙ্গ, মৌলবাদের আস্ফালন বাংলাদেশকে যে গিলে খাবে সে ইঙ্গিত অবশ্য আগেই দিয়েছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো।
গত ১৮ জুন চট্টগ্রামের ভাটিয়ারিতে বাংলাদেশ মিলিটারির দ্বিতীয় ব্যাটেলিয়ানের সূচনা করেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। এই ব্যাটেলিয়ানের ৪টি কোম্পানির যথাক্রমে নাম রাখা হয়, আবু বকর কোম্পানি, উমর কোম্পানি, উসমান কোম্পানি ও আলি কোম্পানি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক প্রথম ব্যাটেলিয়নের নামে অবশ্য কোনও বদল করা হয়নি। তবে সেনাবাহিনীর এহেন ইসলামীকরণ মোটেই ভালো চোখে দেখছে না সুশীল সমাজ। তাঁদের মতে, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে যে পরিবর্তন এসেছে, তারই প্রতিফলন সেনাবাহিনীতেও দেখা যাচ্ছে। যদিও সেনার একাংশের দাবি, শুধুমাত্র ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের স্মরণে এই পদক্ষেপ। শুধু তাই নয়, একটা সময় যে ওয়াকার উজ জামান 'ক্লিন সেভড' ছিলেন, নতুন বাংলাদেশে তাঁকে দেখা যাচ্ছে দাঁড়ি রাখতে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশে যে পরিবর্তন এসেছে, তারই প্রতিফলন সেনাবাহিনীতেও দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ক্রমবর্ধমান ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ভারতীয় সেনার প্রাক্তন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম কে দাস। ‘অর্গানাইজার’ - এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লিখেছেন যে, বাংলাদেশের সেনার ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ার নেপথ্যে পাকিস্তানের বড় হাত রয়েছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সেনার এই বন্ধুত্ব যথেষ্ট উদ্বেগের। একটা সময় যে বাংলাদেশ সেনা 'জয় বাংলা' স্লোগান দিত, সেটাই বদলে গিয়ে ইসলামিক 'আল্লাহু আকবার’ হয়েছে। যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করে স্বাধীনতা পেয়েছিল বাংলাদেশ, সেই শত্রুর সঙ্গে ঢাকার বন্ধুত্বের প্রভাব এখন দেশটির সর্বত্র ফুটে উঠতে শুরু করেছে।
অবশ্য অতীতেও বিএনপির জমানায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে উগ্রপন্থা ও ইসলামের উঁকিঝুঁকি দেখা গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই উগ্রপন্থাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করেন। ২০২৪ সালে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতি বাংলাদেশ সেনাকে আবার সেই পথে নিয়ে গিয়েছে বলে মনে করছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল এম কে দাস। এবং এই নতুন বাংলাদেশের ইসলামের দাপাদাপির নেপথ্যে বড় হাত রয়েছেন পাকিস্তান ও আইএসআই-এর। এমনটা যে হতে পারে, সে বিষয়ে বহু আগেই বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সতর্ক করেছিলেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের পর তাঁকে প্রশংসার পাশাপাশি বলেছিলেন, অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানের হাত ধরে বাংলাদেশ ইসলামীকরণের পথে হাঁটতে পারে। ফলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সতর্ক অবশ্য ছিলেন মুজিবর। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের অর্ধশতাব্দী পর সবকিছু যে এভাবে বদলে যাবে, এবং বাংলাদেশ থেকে তাঁর অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার জোগাড় হবে, তা হয়ত সেই সময় স্বপ্নেও ভাবেননি বঙ্গবন্ধু।
