চন্দ্রশেখর চট্টোপাধ্যায়, আসানসোল: বাংলা সিনেমা শত্রু দিয়ে শুরু। তারপর সিংহম থেকে দাবাং। সিনেমায় ব্যতিক্রমী খাঁকি উর্দির অফিসারেরা তাঁদের নিজনিজ কীর্তিতে হিরো হয়ে উঠেছেন। শুধু সিনেমা নয়, অপরাধ দমন করে বাস্তবেও কোনও কোনও পুলিশকর্তা জনপ্রিয় হয়েছেন। কেউ আবার বন্ধু পুলিশ হয়ে মানুষের মন জয় করেছেন। বদলির নির্দেশে পেয়েছেন কুলটি থানার চৌরঙ্গি ফাঁড়ির আইসি মইনুল হক। বিদায় বেলায় তাঁকে চোখের জলে আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করল গোটা গ্রাম।
[গরম করতেই পোড়া গন্ধ, এবার প্লাস্টিক দুধের আতঙ্ক বালুরঘাটে]
থানার সামনে গ্রামের বাসিন্দাদের ভিড়। বুকে বিদায়ী আইসি মইনুল হকের ছবি। হাতে প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা, “হৃদ মাঝারে রাখব ছেড়ে দেব না”।গ্রামবাসীর এত ভালবাসার কারণ কী ? স্থানীয়দের দাবি, নিম্নবিত্ত মেধাবীদের পড়াশোনার খরচ জোগানো। কারও মেয়ের বিয়ের খরচের টাকা, আবার কারও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দেওয়া। অপরাধ দমন তো বটেই গত আড়াই বছরে গরিবের ‘মসিহা’ হয়ে উঠেছিলেন এই মইনুল হক। কুলটি-সালানপুর সীমান্তের গ্রামগুলির বহু মানুষের কাছে তিনি ছিলেন বন্ধু-পুলিশ। তাই বিদায় সম্বর্ধনা জানাতে এসে কেঁদেই ফেললেন গ্রামের বাসিন্দারা। সাধারণত দেখা যায়, স্কুলের প্রিয় মাস্টারমশাইয়ের বদলিতে পড়ুয়ারা কান্নাকাটি করে। কিন্তু থানার বড়বাবুকে যেতে না দেওয়ার আকুল আবেদন নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রম। এই ব্যতিক্রমী দৃশ্যের সাক্ষী রইল কুলটির চৌরঙ্গি ফাঁড়ি।
জেলায় ৩০ পুলিশ অফিসারের রুটিন বদলির নির্দেশ এসেছে। আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের তরফে চলছে বদলির তদারকি। তালিকায় রয়েছে আইসি মইনুল হকের নাম। সোমবার এই খবর পেয়েই ফাঁড়ির সামনে ভিড় জমতে শুরু করে। প্রিয় স্যরকে আটকে দিতে নতুন পাড়া, মাজি বস্তি, কদভিটা, পূরণডিহি, লছমনপুর, চলবলপুর, সবনপুরের সহজসরল বাসিন্দারা এসেছিলেন। একটাই দাবি, তাঁকে যেতে দেবেন না। ঘটনায় বিব্রত বোধ করেন মইনুল হক। আড়ালে আবডালে প্রচার বিমুখ হয়ে এতদিন সমাজকর্মীর ভূমিকা পালন করেছেন। সেই কাজের ফল যে এত মহীরুহ আকার ধারণ করবে তা তিনি বুঝতেই পারেননি। বিশেষ করে চাকরি করতে এসে এত মানুষের ভালবাসা দেখে তিনিও আপ্লুত হয়ে যান। গ্রামবাসীকে বোঝান, তিনি পুলিশের চাকরি করেন। অপরাধ দমনের পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানোও তাঁর কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তিনি আলাদা করে কিছু করেননি, যা করেছেন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ মেনেই করেছেন। বদলির নির্দেশের বিরোধিতা করলে তাঁরই ক্ষতি হয়ে যাবে। ভুল বুঝতে পারেন গ্রামবাসী।মুহূর্তে ফুলের মালা পরিয়ে মিষ্টি মুখ করিয়ে বড়বাবুকে বিদায় সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। চিন্তামণি মিদ্দা, উমা রায়রা বলেন, বড়বাবুর কাছে বহু উপকার পেয়েছেন। তিনি গরিব মানুষদের বিভিন্ন প্রয়োজনে সাড়া দিয়েছেন। মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা, চিকিৎসার জন্য তদ্বির করে দেওয়া, পড়াশুনার খরচ জুগিয়ে দেওয়া। এসব ধারাবাহিকভাবেই করেছেন। তাঁদের আবদার, যে অফিসার এখানে দায়িত্ব নিয়ে আসবেন তিনিও যেন মইনুল স্যারের মত আগলে রাখেন। আকাশ রজক, জগন্নাথ বাউরিরা বলেন, গত কয়েক বছরে বহু সামাজিক অনুষ্ঠান হয়েছে। সেখানেই ফুটবল খেলার সরঞ্জাম, পুজোয় কাপড় বিলি, শীতে কম্বল দান এসব কর্মসূচিও অনেক বেশি হয়েছে। এতদিনে এলাকায় কোনও আইন শৃঙ্খলার অবনতি হয়নি। চুরি, ছিনতাই বা অন্য অপরাধের কোনও ঘটনা সেভাবে সামনে আসেনি।
[মায়ের কাপড় নিয়ে খেলতে খেলতে গলায় ফাঁস, মৃত্যু শিশুকন্যার]
গোটা ঘটনায় অভিভূত মইনুল হক। তিনি জানান, চাকরি করতে এসে যে এভাবে মানুষের ভালবাসা পাবেন ভাবতে পারেননি। খাঁকি উর্দি মানেই জনগণের একটা অংশ অহেতুক গালিগালাজ করেন। কিন্তু সেই মিথ তিনি ভাঙতে পেরেছেন, জনগণের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছেন। এটাই তাঁর কাছে বড় পাওয়া। সিনেমার হিরো, বড় খেলোয়াড়দের পোস্টার তৈরি হয়। এভাবে তাঁর পোস্টার বানিয়ে বাসিন্দারা ফাঁড়িতে আসবেন ভাবেননি।বদলি হয়ে রানিগঞ্জের পাঞ্জাবি মোড় ফাঁড়িতে চলে যাচ্ছেন। নতুন জায়গায় গিয়ে শুরু হবে নতুন কর্মযজ্ঞ। এখানে যাঁদের ছেড়ে যাচ্ছেন তাঁদেরও পাশে থাকার চেষ্টা করবেন।
The post ‘যাবেন না স্যর’, থানার বড়বাবুর পথ আটকে গোটা গ্রাম appeared first on Sangbad Pratidin.
