'তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে', সেই ছোটবেলা থেকে কবিতার এই লাইনটি সকলেরই জানা। কিন্তু বাঁকুড়ার সিমলাপাল ব্লকের লক্ষ্মীসাগরের শুষ্ক জঙ্গলে একেবারে ব্যতিক্রম। এখানে তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে নয়। একাধিক ডালপালায় ভরা। এই গাছটি বহুদিনের সঙ্গী। গ্রামের মানুষ কেউ তাকে বলে ‘রাবণ তাল’, কেউ আবার ‘শাখাওয়ালা তাল’। বর্ষায় কিংবা গ্রীষ্মে মাঠে যাওয়ার পথে বহু মানুষ ওই গাছের নিচে বিশ্রাম নিয়েছেন। কিন্তু সেই চেনা গাছই যে আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ গবেষণার বিষয় হয়ে উঠবে, তা ভাবেননি কেউ। খবর প্রকাশ্যে আসতেই এখন কৌতূহল ছড়িয়েছে গ্রামজুড়ে।
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়, এজেসি বোস ইন্ডিয়ান বোটানিক গার্ডেন এবং বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার গবেষকদের সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, লক্ষ্মীসাগর অঞ্চলের শুষ্ক পর্ণমোচী অরণ্যে থাকা ‘রাবণ তাল’ আসলে বিরল প্রজাতির Hyphaene dichotoma। এতদিন এই প্রজাতির উপস্থিতি নথিভুক্ত ছিল শুধু গুজরাত, গোয়া, মহারাষ্ট্র ও দিউ-তে। পূর্ব ভারতে এই প্রথম তার সন্ধান মিলল বাঁকুড়ায়। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক উদ্ভিদবিজ্ঞান পত্রিকা Rheedea-য়। গবেষক অমল কুমার মণ্ডল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের সমীক্ষা, পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের তথ্যের ভিত্তিতে জানা গিয়েছে, গাছগুলি শতাধিক বছর ধরে ওই এলাকায় রয়েছে। পূর্ণবয়স্ক গাছের পাশাপাশি চারাও মিলেছে। অর্থাৎ এই অঞ্চলের পরিবেশেই স্বাভাবিকভাবে বংশবিস্তার করছে বিরল প্রজাতিটি।
খবর জানার পর লক্ষ্মীসাগরের বাসিন্দা নিতাই মাহাতো বলেন, “ছোটবেলা থেকে এই গাছ দেখে বড় হয়েছি। আমরা শুধু রাবণ তাল বলেই চিনতাম। এখন শুনছি, এই গাছ নাকি গোটা পূর্ব ভারতে বিরল। ভাবতেই ভালো লাগছে।” গ্রামের গৃহবধূ মঞ্জু বাউরি বলেন, “অনেকেই গাছটার পাশে বসে বিশ্রাম নেন। আগে কখনও গুরুত্ব দিইনি। এখন মনে হচ্ছে, আমাদের গ্রামের এই সম্পদ সবাইকে মিলে রক্ষা করা উচিত।” স্থানীয় যুবক রবিন হাঁসদার কথায়, “বাঁকুড়ার নাম এবার গবেষণার জন্যও পরিচিত হল। প্রশাসন যদি জায়গাটা সংরক্ষণ করে, তাহলে বাইরে থেকেও অনেক মানুষ এই বিরল গাছ দেখতে আসবেন।”
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার শুধু একটি বিরল উদ্ভিদের নথিভুক্তি নয়, বাঁকুড়ার প্রাকৃতিক ঐতিহ্যেরও স্বীকৃতি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (IUCN)-এর তালিকায় Hyphaene dichotoma বিপদসীমার দোরগোড়ায় থাকা প্রজাতি। তাই এখনই সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এই প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চেনা ‘রাবণ তাল’-এর অচেনা পরিচয় সামনে আসতেই, লক্ষ্মীসাগরের মানুষও যেন নতুন করে নিজেদের জঙ্গলকে চিনতে শুরু করেছেন।
