'চিকেনস নেক' (Chicken's Neck) অর্থাৎ 'শিলিগুড়ি করিডর' ঘিরে বাড়ছে কৌশলগত সতর্কতা। বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে এবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি বর্তমানে পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ অথবা বিমানঘাঁটিগুলো চালু করতে তৎপর হয়েছে ভারত। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতীয় বিমান বাহিনীর জরুরি অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে ওই উদ্যোগ। উত্তরবঙ্গ, অসম ও ত্রিপুরা রাজ্যে রয়েছে সাতটি পুরনো বিমানঘাঁটি। তার মধ্যে উত্তরবঙ্গে রয়েছে পাঁচটি। মোট সাতটি বিমানঘাঁটির মধ্যে কোচবিহার এবং আসামের রূপসী বিমানবন্দর ইতিমধ্যে সচল করা হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, ইতিমধ্যে 'চিকেনস নেক' (Chicken's Neck) অর্থাৎ 'শিলিগুড়ি করিডর'-এ নয়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। নতুন ডিজাইনের বেড়ায় ঢেকেছে ৭৫ শতাংশ ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকা। আধুনিক বেড়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শক্তিশালী নজরদারি ক্যামেরা এবং উন্নত এরিয়া ডমিনেশন ব্যবস্থা। সীমান্তের পাতা পড়লেও এখন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) নজরে আসবে। সেই সঙ্গে আত্মরক্ষার জন্য ঢাল করা হয়েছে এস-৪০০ ডিফেন্স সিস্টেম। রাশিয়ার কাছ থেকে কেনা সারফেস টু এয়ার মিসাইলও প্রস্তুত রাখা হয়েছে সীমান্তে। এছাড়াও ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত 'চিকেনস নেক' রক্ষায় বাংলাদেশ সীমান্তের পাশে অসমের ধুবড়ি সংলগ্ন বামুনি, বিহারের কিশনগঞ্জ এবং উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া এলাকায় তিনটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করা হয়েছে।
চিকেনস নেক ঘিরে রয়েছে নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ ও চিন। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এলাকাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভারতকে দুর্বল করতে শিলিগুড়ি করিডরকেই পাখির চোখ করেছে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন। তিনটি দেশের সীমান্ত এক জায়গায় মেশায় এই পথে অস্ত্রশস্ত্র, মাদক ও জাল নোট ভারতে পাচার করার ছক কষেছে জঙ্গিরা। পাশাপাশি সীমান্তের ছিদ্রপথে সন্ত্রাসবাদীদের এদেশে প্রবেশের রাস্তা তৈরি করারও পরিকল্পনা রয়েছে। এই চিকেন নেক টার্গেট পাকিস্তানেরও। এই অঞ্চলকে ভারতের থেকে আলাদা করে দিতে চায় চিনও। ওই কারণে এবার ভারতীয় বিমান বাহিনীর জরুরি অপারেশনাল সুবিধা বাড়াতে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের পাঁচটি পরিত্যক্ত এয়ারস্ট্রিপ অথবা বিমানঘাঁটি চালু করার পরিকল্পনা নিয়েছে নয়াদিল্লি।
এই সিদ্ধান্তের অন্যতম বড় কারণ, বাংলাদেশের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ। সীমান্তের খুব কাছাকাছি এই বিমানঘাঁটি শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতীয় সামরিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তাই নয়াদিল্লি ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি ঢেলে সাজানো হচ্ছে। পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি চালুর উদ্যোগ এই বৃহত্তর প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। যেসব বিমানঘাঁটি বা এয়ারস্ট্রিপ সংস্কার করা হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার আমবাড়ি ও পাঙ্গা, দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট, মালদহের ঝালঝালিয়া এবং আসামের ধুবড়ি। এর আগে কোচবিহার এবং আসামের রূপসী বিমানবন্দর চালু হয়েছে।
জানা গিয়েছে, বিমানবন্দরের রানওয়েগুলোকে এমনভাবে প্রস্তুত রাখা হবে যেন জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা মোতায়েন, রসদ সরবরাহ এবং উদ্ধার অভিযানে ব্যবহার করা যায়। তবে ওই কাজ মোটেই সহজ নয় বলেই মনে করছেন অভিজ্ঞ মহল। কারণ, কয়েক দশক অব্যবহৃত থাকার ফলে কিছু রানওয়ে ঘন জঙ্গলে ঢাকা পড়েছে। কোথাও ভেঙে পড়েছে পরিকাঠামো। কিছু জায়গায় রানওয়ের আশপাশে গড়ে উঠেছে জনবসতি। ওই কারণে বড় যুদ্ধবিমান ওঠানামায় ঘাঁটিগুলো মোটেও উপযুক্ত নয়। যদিও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, ন্যূনতম সংস্কারের মাধ্যমে এগুলোকে হেলিকপ্টার, পরিবহন বিমান ও ছোট সামরিক বিমানের জন্য উপযোগী করে তোলা হবে।
