বিপ্লব দত্ত: প্রথমে পরকীয়া। তারপর পথের কাঁটা সরাতে স্বামীকে খুন। অতঃপর ডাকাতির গল্প ফেঁদে পুলিশকে বিভ্রান্ত করা। গুণে ঘাট ছিল না। চেষ্টারও কসুর ছিল না। কিন্তু শেষমেশ শেষরক্ষা হল না। পুলিশ সত্যি আবিষ্কার করে। নবদ্বীপ আদালত মঙ্গলবার দোষীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়।
[ মাছ ধরার নামে বালিকার যৌন নির্যাতন, অভিযুক্ত প্রতিবেশী গ্রেপ্তার ]
নিজের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কে ‘পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল স্বামী। আর তাই, সেই কাঁটা উপড়ে ফেলতে প্রেমিকের সঙ্গে পরিকল্পনা করে স্বামীকে খুনের ছক কষে ফেলেছিলেন স্ত্রী। শেষপর্যন্ত সফলও হন। স্বামীকে খুনের পর নিজেদের বাঁচাতে প্রেমিকের সঙ্গে পরামর্শ করেই সুন্দর গল্প সাজিয়েছিলেন স্ত্রী। পুলিশকে কেঁদেকেটে জানিয়েছিলেন, ডাকাতরা ডাকাতি করতে এসে বাধা পেয়ে তার স্বামীকে গলা কেটে খুন করে দিয়ে গিয়েছে। তাকেও মারধর করে লুটপাট চালিয়েছে। নদিয়ার নবদ্বীপ পুরসভার প্রাক্তন কর্মী অরুণ নন্দী খুন হাওয়ার পর, তাঁর স্ত্রীর ডাকাতির গল্পকে প্রথমে কেউই সাজানো নাটক বলে ভেবেই উঠতে পারেননি। যদিও সত্য যে কখনওই চাপা থাকে না, তার প্রমাণ পরে মেলে। অরুণ নন্দী হত্যা মামলায় আদালতের বিচারেও সেই সত্যেরই স্বীকৃতি মিলল। মঙ্গলবার নবদ্বীপ আদালত অরুণ নন্দীর স্ত্রী ও তার প্রেমিককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দিল।
[ দিঘায় পর্যটকের রহস্যমৃত্যু, বাথরুমে উদ্ধার ঝুলন্ত দেহ ]
আদালত সুত্রে জানা গিয়েছে, খুনের ঘটনাটি ঘটে নবদ্বীপের ওলাদেবী তলায়, ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ রাতে। গলার নলি কেটে খুন করা হয় অরুণ নন্দীকে (৫৭)। খুনের পর ডাকাতির সাজানো নাটকের রূপ দিতে অরুণবাবুর ঘরে আলমারি-সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র অগোছালো করে রাখা হয়েছিল। যা দেখে পুলিশের কাছে ডাকাতির গল্পই প্রথমে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। সেইসঙ্গে উৎপলা নন্দীর কথা ও সদ্য স্বামীকে হারানোর কান্না অবিশ্বাসের ভাবনা আসতেই দেয়নি। অবশ্য আদালত অরুণ নন্দীর মা ছবিরানি দেবী-সহ ২২ জন স্বাক্ষীর স্বাক্ষ্য গ্রহণের পর অভিযুক্ত উৎপলা নন্দী ও তার প্রেমিক নবকুমার দত্তকে দোষী সাব্যস্ত করে সোমবার। মঙ্গলবার সাজা ঘোষণা করেন ওই আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা বিচারক শুভার্থী সরকার। আদালত সুত্রে খবর, সাজাপ্রাপ্তরা হল অরুণ নন্দীর স্ত্রী উৎপলা নন্দী ও তার প্রেমিক নবকুমার দত্ত। মৃত অরুণ নন্দী তৎকালীন নবদ্বীপ পুরসভার কর্মী ছিলেন। পাশাপাশি সিপিএমের স্থানীয় ১ নং শাখা কমিটির সম্পাদকও ছিলেন। অনেক মানুষের সঙ্গে ছিল তাঁর পরিচিতি। তাঁর খুনের জেরে নবদ্বীপে ব্যাপক চাঞ্চল্য দেখা দেয়। অরুণবাবুর স্ত্রী তখন নবদ্বীপ হাসপাতালের নার্স। স্বভাবতই, ডাকাতিতে বাধা পেয়ে ডাকাতরা তার স্বামীকে খুন করেছে, পুলিশের কাছে দেওয়া উৎপলা নন্দীর বলা কথা প্রায় সবাই-ই মেনে নিয়েছিলেন।
[ উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতের ‘বাসা’, আতঙ্কের ছবি ভাইরাল ]
যদিও আসল সত্যিটা সামনে আসে বেশ কিছুদিন পরে। অরুণবাবুর বৃদ্ধা মা ছবিরানি নন্দী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলের খুনের পিছনে হাত রয়েছে তাঁরই পুত্রবধূর। উৎপলা নন্দীর সঙ্গে নবদ্বীপের পোড়ঘাট এলাকার বাসিন্দা পেশায় রেডিমেড কাপড় ব্যবসায়ী নবকুমার দত্ত নামে একজনের বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্কের কথা জেনে ফেলেছিল তাঁর ছেলে। সেই কারণেই তাঁর পুত্রবধূই তাঁর প্রেমিককে সঙ্গে নিয়ে অরুণকে খুন করেছে। সেই অভিযোগ পেয়ে ফের তদন্তে নামে নবদ্বীপ থানার পুলিশ। এরপর ২০১৬ সালে গ্রেপ্তার হন উৎপলা নন্দী ও নবকুমার দত্ত। যদিও অভিযুক্তরা উচ্চ আদালতে আবেদন করে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পায়। গত ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তারা জামিনেই ছিল। সোমবার তাদের নবদ্বীপ আদালতে হাজিরা দিতে হয়। বিচারক সোমবারই তাদের দোষী সাব্যস্ত করে হেফাজতে রাখতে নির্দেশ দেন। মঙ্গলবার সাজা ঘোষণা হয়। ওই মামলার সরকারি আইনজীবী দেবাশীষ রায় জানিয়েছেন, ‘ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় বিচারক এই সাজা দিয়েছেন। ৩০২ ধারায় খুনের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সঙ্গে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে ৬ মাস অতিরিক্ত সাজাভোগ। ২০১ ধারায় তথ্যপ্রমাণ লোপাটের জন্য তিন বছরের কারাদণ্ড, এক হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এক মাসের সাজা দিয়েছেন।’ দুটি ধারার সাজাই চলবে একইসঙ্গে। যদিও সাজা শুনেই কান্নায় ভেঙে পড়ে দু’জনে। ছেলেদের কথা উত্থাপন করে সাজা কমানোর আরজি জানালেও বিচারক তা খারিজ করে দিয়েছেন।
ছবি: সঞ্জিৎ ঘোষ
The post পথের কাঁটা সরাতে স্বামীকে খুন স্ত্রীর, দোসর প্রেমিক appeared first on Sangbad Pratidin.
