বিহারের কিছু অংশ এবং উত্তরবঙ্গকে নিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠন নয়। সুপরিকল্পিত উন্নয়নের পরিকাঠামো দিয়ে ‘চিকেনস নেক'-এর নিরাপত্তা আরও বাড়াতে শিলিগুড়িকে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন’ অর্থাৎ 'এনএসআর' হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবছে দিল্লি। অন্তত গোয়েন্দা সূত্রে এমনই আভাস মিলেছে। দিল্লিতে কূটনৈতিক স্তরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বলেও প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সুপরিকল্পিত উন্নয়ন হলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। বঞ্চনার অভিযোগ মিটবে। একই সঙ্গে দুর্বল হবে পৃথক রাজ্যের দাবি। চিকেনস নেকের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য যেটা জরুরি। এই বিশেষ অঞ্চলের জন্য সংবিধানে বা প্রশাসনিক স্তরে বিশেষ ক্ষমতার সংস্থান থাকবে। প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং পর্যটনের মতো বিষয়গুলিকে মাথায় রেখে এই অঞ্চলের জন্য আলাদা বাজেট এবং সেন্ট্রাল প্ল্যানিং বোর্ড গঠন করা হতে পারে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে যেখানে কেন্দ্রের সরাসরি নজরদারি এবং রাজ্যের সমান অংশীদারিত্ব থাকবে।
চলছে নজরদারি। ফাইল চিত্র
জানা গিয়েছে, এনসিআর-এর অধীন দিল্লি যেমন রাজধানী এবং সংলগ্ন এলাকার মধ্যে সুসংহত নগরোন্নয়ন, পরিকাঠামো এবং অর্থনীতির সেতুবন্ধন করেছে একইভাবে শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতলকে মিলিয়ে এই স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন গঠন করা হতে পারে। ইতিমধ্যে ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন প্ল্যানিং বোর্ড’ গঠন করার প্রস্তাব উঠেছে। ওই বোর্ডে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, সড়ক ও পরিবহণ এবং অর্থ মন্ত্রকের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি থাকবেন রাজ্য সরকারের শীর্ষ আমলা ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্তারা। এই যৌথ ব্যবস্থার সুবিধা হবে এটি রাজ্যের যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো অর্থাৎ রাজ্যের সীমানায় আঘাত করবে না। উল্টে উন্নয়ন ও সুরক্ষার প্রয়োজনে রাজ্য ও কেন্দ্রের মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজ করবে।
শুধু তাই নয়, শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতলকে মিলিয়ে স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন গঠন করা হলে এখানে বড় মাপের ‘ড্রাই পোর্ট’ তৈরি করা সম্ভব হবে। নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি হয়ে উঠবে প্রধান ক্লিয়ারিং এবং লজিস্টিক হাব। এর ফলে পরিবহণ, গুদামজাতকরণ, প্যাকেজিং এবং সাপ্লাই চেনের মতো ক্ষেত্রগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ের পরিকাঠামোকে বিশ্বমানের করে তোলার জন্য বিশেষ কেন্দ্রীয় তহবিল বরাদ্দ করা সম্ভব হবে।
শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতলকে মিলিয়ে স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন গঠন করা হলে এখানে বড় মাপের ‘ড্রাই পোর্ট’ তৈরি করা সম্ভব হবে। নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি হয়ে উঠবে প্রধান ক্লিয়ারিং এবং লজিস্টিক হাব।
পাহাড়ের বিপর্যস্ত ইকো সিস্টেম রক্ষা করে সেখানে আন্তর্জাতিক মানের হসপিটালিটি সেক্টর, ওয়েলনেস ট্যুরিজম এবং আইটি পার্ক গড়ে তোলা যেতে পারে। এনএসআর-এর তকমা থাকলে এই অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ টানাও সহজ হবে। কারণ লগ্নিকারীরা জানবেন এই অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দায়িত্ব ভারত সরকারের। এছাড়াও সামরিক এবং আধাসামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহের জন্য যে বিরাট বাজার রয়েছে স্থানীয় কৃষক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সরাসরি সাপ্লাই চেনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এর ফলে ডুয়ার্স এবং তরাইয়ের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটবে।
ফাইল ছবি।
স্পর্শকাতর চিকেনস নেক ঘিরে সেনা, বায়ুসেনা এবং আধাসামরিক বাহিনীর বিশাল উপস্থিতি রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা এজেন্সিগুলির মতে শুধু সামরিক ব্যবস্থার উন্নতি করে লাভ হবে না। পাশাপাশি যদি অসামরিক পরিকাঠামোর উন্নয়ন না হয়, তবে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে লজিস্টিক সাপোর্ট পওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এনএসআর গঠিত হলে বাগডোগরা বিমানবন্দর, নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন, এশিয়ান হাইওয়ে এবং পাহাড়ের বিকল্প সড়কগুলির আধুনিকীকরণ একটি ছাতার তলায় আসবে। শুধু সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নয়। ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’-র সফল রূপায়ণের জন্যও এই স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন গেম চেঞ্জার হতে পারে। কারণ, এই করিডর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে ভারতের স্থলপথের সিংহভাগ বাণিজ্য হয়ে থাকে। কিন্তু শিলিগুড়ি এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যানজট এবং শিল্প পরিকাঠামোর অভাব বিশ্বমানের বাণিজ্য বিকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকার মনে করছে, যদি এই এলাকাকে এনএসআর ঘোষণা করে স্পেশাল ইকনমিক জোন এবং লজিস্টিক হাব গড়ে তোলা হয় তবে এলাক্র চেহারা বদলে যাবে। দার্জিলিং পাহাড় এবং উত্তরের সমতলের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনুন্নয়ন নিয়ে ক্ষোভ, বঞ্চনার অভিযোগ, পৃথক রাজ্যের দাবিরও স্থায়ী সমাধানসূত্র হতে পারে স্ট্র্যাটেজিক রিজিওন।
