সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা মালদহে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় 'অমীমাংসিত' পরিসংখ্যানের বহর দেখে বিস্মিত সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক মহলও। এক-দুই লক্ষ নয়, মালদহে ঝুলে রইলেন আট লক্ষেরও বেশি ভোটার! এই ঢালাও অমীমাংসিত পরিসংখ্যান দেখে উদ্বিগ্ন বিভিন্ন মহলও। প্রশ্ন উঠেছে, মুসলিম অধ্যুষিত জেলা বলেই কি এই চিত্র? বিষয়টি ফের নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে সোচ্চার মালদহ জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। জেলা তৃণমূলের প্রশ্ন, মুসলিম অধ্যুষিত জেলা বলেই কি মালদহে এত লক্ষ ভোটারের ক্ষেত্রে 'বিচারাধীন' তকমা লাগিয়েছে নির্বাচন কমিশন? নেপথ্যে বিজেপির হাত দেখছে তৃণমূল।
যদিও বিজেপি পালটা তোপ দেগেছে তৃণমূলকেই। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে মালদহ জেলাতেও চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, জেলার ১২টি বিধানসভা এলাকায় বাদ পড়েছেন ১৮,২৮২ জন ভোটার। চূড়ান্ত তালিকায় তাঁদের নামে 'ডিলিটেড' লেখা। তাঁরা মৃত অথবা অন্যত্র চলে গিয়েছেন কিংবা অন্য কোনও কারণে চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন বলে দাবি প্রশাসনের। নতুন সংযোজন হয়েছেন ৬,৮২৫ জন। মালতীপুর, রতুয়া ও হরিশ্চন্দ্রপুরে নতুন ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার সংখ্যা বেশি। তবে মালদহে বিচারাধীনের সংখ্যাটা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। জেলায় ৮ লক্ষ ২৮ হাজার ০৮০ জনের নাম 'অ্যাজুডিকেশন' অর্থাৎ বিচারাধীন হিসাবে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
এই সংখ্যা দেখেই চক্ষু চড়কগাছ তৃণমূলের জেলার নেতাদের। যাঁরা শুনানির নোটিশ পেয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে আশি শতাংশের বেশি ভোটার চূড়ান্ত তালিকায় বিচারাধীন বলে জানা গিয়েছে। মালদহ জেলা তৃণমূলের মুখপাত্র আশিস কুণ্ডু বলেন, "এই মালদহ জেলায় মুসলিম ধর্মাবলম্বী মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা। আর এই জেলাতেই আট লক্ষের বেশি ভোটারের শুনানি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এটা সংখ্যালঘু জেলা বলেই কি? এর উত্তর দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। বিজেপির কথা শুনে কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। মালদহের এই ঝুলে থাকা পরিসংখ্যানই সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।" অন্যদিকে, বিজেপির মালদহ দক্ষিণের জেলা সভাপতি অজয় গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, "তৃণমূল অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নাম ভোটার তালিকায় রাখার জন্য আগাগোড়াই লড়াই করছে। এখনও লড়াই ছাড়ছে না। ছাব্বিশের ভোটের পর তৃণমূলকে বাংলা থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নিতে হবে।" প্রশাসন সূত্রে খবর, অমীমাংসিতদের তথ্য যাচাই শুরু করেছেন জেলার বিচারকরা।
সংখ্যালঘু ভোটার অধ্যুষিত মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ১১ লক্ষ ভোটার ভোট দিতে পারবেন কিনা তা এখনও অনিশ্চিত হয়ে রইল। শনিবার নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে যে ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ১১ লক্ষ ২১ হাজার ভোটারের তথ্য এখনও বিচারাধীন রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। মুর্শিদাবাদ জেলায় ইতিমধ্যেই প্রায় ৫৪ লক্ষ ৭৫ হাজার ভোটারের নাম চূড়ান্ত তালিকায় উঠে গিয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনে ২২ আসন বিশিষ্ট মুর্শিদাবাদ জেলায় তৃণমূল কংগ্রেস ২০টি আসনে জয়ী হয়। দু'টি আসন থেকে জয়লাভ করে বিজেপি প্রার্থীরা। তৃণমূল কংগ্রেসের এই জয়ে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক বড় ভূমিকা নিয়েছিল বলে তথ্যভিজ্ঞ মহলের ধারণা। এবারের ভোটার তালিকায় বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম পড়ার সম্ভবনা তৈরি হয়েছে, যাদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে গত ১৬ ডিসেম্বর যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল তাতে মুর্শিদাবাদ জেলায় মোট ৫৪ লক্ষ ৮৫ হাজার ২৪৮ জনের নাম ছিল। শনিবার যে ভোটার তালিকা প্রকাশ হয়েছে তাতে ৫৪ লক্ষ ৭৫ হাজার ৪৭০ জনের নাম রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে এখনও ১১ লক্ষ ২১ হাজার ২০৫ জন ভোটারের নথি যাচাই করার প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মুর্শিদাবাদ জেলার ২২ টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে শনিবারের প্রকাশিত ভোটার তালিকায় ছ'টি বিধানসভা কেন্দ্রে খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ভোটার সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাকি ১৬ টি বিধানসভা কেন্দ্রেই খসড়া ভোটার তালিকা থেকে শনিবারে প্রকাশিত ভোটার তালিকায় ভোটার সংখ্যা কিছুটা কমেছে।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী খসড়া ভোটার তালিকা থেকে শনিবারের প্রকাশিত ভোটার তালিকায় সবথেকে বেশি ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে মুর্শিদাবাদের ডোমকল বিধানসভা কেন্দ্রে। সেখানে মোট ১,৯২১ জন ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে। সব থেকে কম ভোটার বেড়েছে রানিনগর বিধানসভা কেন্দ্রে। সংখ্যাটা মাত্র ১৭১।অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের বাকি ১৬ টি বিধানসভা কেন্দ্রে খসড়া তালিকার থেকে শনিবারে প্রকাশিত তালিকায় ভোটার সংখ্যা কিছুটা কমেছে। সবথেকে বেশি ভোটার কমেছে মুর্শিদাবাদ বিধানসভা কেন্দ্রে। সেখানে ৪০৭৫ জন ভোটার খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। শনিবারের প্রকাশিত তালিকায় সামশেরগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে খসড়া তালিকা থেকে মাত্র ৯৬ জন ভোটারের নাম কম রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মুর্শিদাবাদ জেলায় যে ১১ লক্ষ ২১ হাজার ২০৫ জন ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ বাকি রয়েছে সেই তালিকার শীর্ষ রয়েছে সামশেরগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্র। সেখানে ১ লক্ষ ১৯ হাজার ৯০১ জন ভোটারের তথ্য এখনও যাচাই করা হয়নি বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানানো হয়েছে। বহরমপুর বিধানসভা কেন্দ্রে ১২,৭৫৪ জন ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ এখনও বাকি রয়েছে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর। এই সংখ্যা মুর্শিদাবাদ জেলার বাকি সমস্ত বিধানসভা কেন্দ্রগুলোর তুলনায় সব থেকে কম। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী লক্ষাধিক ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ বাকি রয়েছে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জ, সুতি, রানিনগর এবং রঘুনাথগঞ্জ বিধানসভা এলাকায়। ৭৫ হাজারের বেশি ভোটারের তথ্য যাচাইয়ের কাজ বাকি ফরাক্কা, জঙ্গিপুর, লালগোলা, ভগবানগোলা বিধানসভা কেন্দ্রে।
