৫ মে, ২০২৬ 'সোনার বাংলায় নতুন ভোর।' একুশে মাটি কামড়ে পড়ে থাকলেও তৃণমূল সরকারকে উৎখাতে ব্যর্থ হয়েছিল মোদি সরকার। ছাব্বিশের নির্বাচনে বাংলায় সরকার গঠনের সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হল। গেরুয়া ঝড়ে খড়কুটোর মতো উড়ে গেল তৃণমূল। পদ্মশিবিরের জয়ের হুঙ্কারে ম্লান হয়ে গেল জোড়াফুলের দাপট। শ্যামাপ্রসাদের মাটিতে প্রথমবার পদ্ম ফোটানোর এই মহোৎসবকে দীর্ঘ সংগ্রামের ফল বললে অত্যুক্তি হবে না। তৃণমূল দীর্ঘ ১৫ বছরের রাজপাট গুটিয়ে নিতেই টলিপাড়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ সোশাল মিডিয়া মারফৎ মোদি সরকারকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন তো কেউ আবার মমতা গদিচ্যুত হতেই ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে শঙ্কিত। শিল্পসংস্কৃতির বাংলাকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবে নতুন সরকার তা নিয়ে চিন্তিত শিল্পীমহল।
বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অনেকেই উগরে দিয়েছেন বহুদিনের জমানো ক্ষোভ। বিজেপি সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক হাসির নজিরও রয়েছে সমাজমাধ্যমের পাতায়। এখানেই শেষ নয়, টলিগঞ্জের প্রার্থী অরূপ বিশ্বাসের পরাজয়ে প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছেন শিল্পীমহলের একাংশ। মজার বিষয়, একসময় যাঁরা তৃণমূলের প্রচারের আলোয় থেকেছেন বাংলায় পদ্ম ফুটতেই পালা বদল! অভিনেত্রী-তৃণমূলের সদস্য রূপাঞ্জনা মিত্রের পোস্টে শোরগোল নেটভুবনে। বারাকপুরে রাজের গায়ে কাদা ছুড়তেই মেসি কাণ্ড উসকে দিয়ে 'লেডি সুপারস্টার'কে খোঁচা অভিনেত্রীর।
আসলে রাজনীতির নাগপাশ থেকে ইন্ডাস্ট্রিকে মুক্ত করার রব উঠেছে বহুবার। কখনও বিরোধী শিবির সমর্থক হওয়ায় ইন্ডাস্ট্রিতে শিল্পীদের কোণঠাসা হওয়ার খবর ছড়িয়েছে, তো কখনও বা আবার ক্ষমতার আস্ফালনের অভিযোগ উঠেছে। তবে সোমবার গৈরিক আভায় নতুন সূর্যোদয় দেখার পরও টলিউডের একাংশ কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির হাল ফেরা নিয়ে সন্দিহান।
পদ্মাসনে পশ্চিমবঙ্গ, এরপরই অভিনেত্রী মৈত্রয়ী মিত্র প্রতিক্রিয়া, 'যেই যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। না এমনি মনে পড়ে গেল প্রবাদটা। জনগণ ঘর পোড়া গরু কিনা সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়।' অন্যদিকে বিজেপির জয়ে উচ্ছ্বসিত টলিউডের 'বস' জিৎ। বাংলার মাটিতে পদ্ম ফুটতেই জয়ের উল্লাসে সামিল অভিনেতা।
বিধানসভা নির্বাচনে পদ্মশিবিরের জয়ে বিজেপিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন অভিনেত্রী ও তৃণমূল কাউন্সিলার অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, ভয়মুক্ত ও হিংসা মুক্ত বাংলা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও কেন তাঁর ওয়ার্ডের তৃণমূল পার্টি অফিস গুলো ব্যপক ভাঙচুর হল? বিজেপি নেতৃত্বদের কাছে অনন্যার অনুরোধ, তাঁরা যেন দলের কর্মীদের সংযত থাকার বার্তা দেন।
তাঁর কথায়, 'বিপুল জনাদেশ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা পূরণেই বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। আমি অন্য একটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ সদস্য হলেও বাংলার উন্নয়নই আমার রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য এবং প্রাথমিকতা ।বাংলার দশ কোটি মানুষের মত আমিও বাংলার প্রগতি চাই ।দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে আসুন ভয় ও হিংসার পথ ত্যাগ করে বাংলাকে সমৃদ্ধ করার শপথ নিই।'
'সোনার বাংলায় নতুন ভোর' থেকে প্রতিটি সকাল যেন শান্তিপূর্ণ থাকে সেই আর্জি অভিনেত্রী- সঞ্চালিকা সুদীপা চট্টোপাধ্যায়ের। এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে কোনওরকম প্ররোচনায় পা না দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। অভিনেতা-সঙ্গীতশিল্পী সাহেব চট্টোপাধ্যায় অতীতের ভয়ংকর স্মৃতিচারণ করে তৃণমূলের উপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। ৪ মে নির্বাচনের ফল ঘোষণার সময় চোখের সামনে ফুটে উঠেছিল ২০১১ সালে মে মাসে যখন বাম সরকারের পতনের মুহূর্ত। নেপথ্য কারণ ব্যখ্যা করে সাহেবের প্রার্থনা, 'গদিতে যাঁরাই আসুন, বাংলার যেন ভালো হয়।'
বাংলায় পদ্ম ফুটতেই সবমহলের আলোচিত বিষয়, এবার তো অনেকেই ডিগবাজি খাবে! সেই বিষয়টিকে সামনে রেখে অভিনেতা অনিন্দ্যর বক্তব্য, 'গত ১৫ বছরের অভিনয় জীবনে শাসক দলের হয়ে স্টেজে ওঠার উত্তেজনা সম্বরণ করেছি। ওই লবিতে থাকলে হয়ত জীবনটা আরও একটু সিকিওর হত। কাজের পরিধি বাড়তে পারত। ব্যাঙ্ক ব্যালেন্সের কথা না ভেবে স্ট্রাগল বেছে নেওয়া আমার মতন কিছু মুষ্টিমেয় অভিনেতারা যাতে শুধু নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস রেখে মাথা উঁচু করে ভবিষ্যতেও কাজ করতে পারি এটুকুই আশা রাখব।'
অনিন্দ্যর কাছের বান্ধবী বাংলা ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় অভিনেত্রী মিমি চক্রবর্তী। একসময় তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন। পানিহাটি থেকে বিজেপির টিকিটে আরজি করের নির্যাতিতার মা রত্না দেবনাথ জিততেই তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। একইসঙ্গে বলেছেন, কোনও জয়ই সন্তান হারানোর যন্ত্রণায় প্রলেপ দিতে পারবে না।
অভিনেতা সুজয় প্রসাদ সমাজমাধ্যমে সরাসরি আক্রণ করেছেন অরূপ বিশ্বাসকে। ২০ বছর পর অরূপের দুর্গে নয়া রং! টলিগঞ্জে পালাবদল হতেই সুজয়ের সংযোজন, 'আমি ভীষণ খুশি হয়েছি অরূপ বিশ্বাস হেরেছেন। ওঁর মতো খারাপ মানুষ আজ পর্যন্ত দেখিনি। এটা আমার খুব ব্যক্তিগত জীয়গা থেকে উপলব্ধি করেছি। আর মনের কথা বলতে বিন্দুমাত্র লজ্জিত নই।'
