আকাশ মিশ্র: অভিনেত্রী অনসূয়া সেনগুপ্তর কান জয়ের পর থেকেই ফের যেন নাড়া চাড়া দিয়ে উঠেছে পুরনো এক বিতর্ক। যে বিতর্কের মধ্যমণি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি এবং তাঁর একচোখামো। যেখানে প্রতিভার থেকেও দাম পায় লুক এবং স্টাইল। বেশ কয়েকজন উঠতি অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের অভিযোগ, প্রযোজক, পরিচালকরা নাকি শুধুমাত্র সোশাল মিডিয়ার ফলোয়ার্স সংখ্যা দেখেই সুযোগ দেন সিরিজ বা সিনেমায়। আর তার ফলাফল, অনসূয়ার মতো ট্যালেন্টেড শিল্পীরা চলে যান পিছনের সারিতে। আরও কঠিন হয়ে ওঠে তাঁদের ইন্ডাস্ট্রিতে টিকে থাকার লড়াই। তার পর একদিন আন্তর্জাতিক মঞ্চে পুরস্কার পেয়ে, সবার মধ্যমণি হয় এরাই! সত্যিই কী এমন পরিস্থিতি? অনসূয়ার মতো শিল্পীরা সত্যিই কি ব্রাত্য টলিউডে? সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালের কাছে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরমহলের কথা ফাঁস করলেন জনপ্রিয় কাস্টিং ডিরেক্টর অনিমেষ বাপুলি।
অনিমেষ জানালেন, ''টলিউডে কাস্টিংয়ের ক্ষেত্রে অনসূয়ার মতো একটা কেন, একশোটা মেয়ে থাকলেও, এখানকার পরিচালকরা পাঁচ, ছয় বছরেও বাড়ির পরিচারিকার চরিত্রে কাস্ট করবে। ইনফ্যাক্ট তাও করবে কিনা সন্দেহ। সিনেমা, সিরিজ কিংবা সিরিজ যাই বলুন, টলিউড ইন্ডাস্ট্রি খুবই একচোখা। একটু শ্যামবর্ণ, মেদযুক্ত শরীরের কেউ হলেই, সে যতই ভালো অভিনয় করুক না কেন, তাঁকে অভিনেতাই ধরা হয় না। ইন্ডাস্ট্রির বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, অভিনেতা হবে একেবারে ঝাঁ চকচকে।''
[আরও পড়ুন: মাত্র ৯৯ টাকায় রাজকুমার-জাহ্নবীর ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস মাহি’র টিকিট! কীভাবে?]
অনিমেষের কথায়, ''অভিনেতাদের বাছার ব্যাপারে আবার প্রযোজনা সংস্থার রকমভেদ রয়েছে এবং তাঁদের নিয়মও আলাদা। এই যেমন প্রিমিয়াম সংস্থাগুলো একেবারে ক্রিম অভিনেতাদের নিয়ে নেয়। আর এর পরে যে হাউসগুলো রয়েছে, তাঁরা অভিনেতাদের সোশাল মিডিয়ার ফলোয়ার্স সংখ্যা ও রিচ দেখে। কেননা, এই সংস্থাগুলোর তো আর নিজস্ব তেমন কোনও জনপ্রিয়তা নেই। তাই কলাকুশলীদের জনপ্রিয়তার উপর ভর করেই তাঁরা জনপ্রিয় হচ্ছে। ধরা যাক তিনজন ইনফ্লুয়েন্সারকে কাস্ট করেছে কোনও প্রযোজনা সংস্থা। যাঁদের এক লাখ, সত্তর হাজার, পঞ্চাশ হাজার ফলোয়ার রয়েছে। এই ফলোয়ার সংখ্যা নিয়েই মার্কেটিংটা ভালো করতে চায় প্রযোজনা সংস্থা। আর অভিনয়ের বিষয়টা? বেশিরভাগ প্রযোজনা সংস্থাই মনে করে, এই সব ইনফ্লুয়েন্সারদের নিয়ে ওয়ার্কশপ করিয়ে কাজটা উদ্ধার হয়ে যাবে। এর ফলে কিন্তু প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন একেবারেই হয় না। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এখনও অনেক ছেলে, মেয়ে রয়েছে যাঁরা ঠিক এই কারণেই পড়ে পড়ে মার খাচ্ছেন। বাইরে যাওয়ারও অপশন কম। তাই শুধুমাত্র এখানে টিকে থাকার লড়াই করে চলেছেন। এই তালিকায় কিন্তু ন্যাশনাল স্কুল অফ ড্রামা, এফটিআইআই থেকে আসা অভিনেতারাও রয়েছেন। যাঁরা কিন্তু শুধুই 'সো কল্ড' ঝকঝকে লুক না থাকার কারণে ইন্ডাস্ট্রিতে জমি খুঁজে পাচ্ছেন না।''
প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অনিমেষ বাপুলি।
অনিমেষ জানান, ''খুব কম সংখ্যক পরিচালক রয়েছেন, যাঁরা স্পষ্ট বলেন, এরকম চরিত্রের জন্য, সেরকম অভিনেতা লাগবে। তবে বেশিরভাগ পরিচালক বা প্রযোজক রীতিমতো তালিকা ধরিয়ে দেন। যেখানে লুকটাই বেশি গুরুত্ব পায়। তখন পরিচালক বা প্রযোজকের দেওয়া ঘরানা ধরেই অভিনেতা খুঁজতে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের হাত-পা বাঁধা থাকে।''
অনিমেষের কথায়, ''সোশাল মিডিয়ার ফলোয়ার্স সংখ্যা বা রিচ ব্যাপারটা বেশিমাত্রায় দেখতে চায় সিরিয়াল ও বিজ্ঞাপন সংস্থারা। তবে সিনেমার ক্ষেত্রে এখনও এই বিষয়টা নজরে আসেনি।''
বলিউডেও কি একই অবস্থা? অনিমেষের স্পষ্ট উত্তর, ''নাহ, বলিউড কিন্তু এ ব্যাপারে ভীষণ স্পষ্ট। তাঁদের ঠিক যেমন অভিনেতা প্রয়োজন, তেমনই নেবে। সে যদি একেবারেই নতুন হয়, তাহলেও চলবে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। লাল সিং চাড্ডার সময়ে একটি চরিত্রে জন্য কলকাতা থেকে বহু অভিনেতা অডিশন দিয়েছিলেন। তবে সুযোগ পেলেন থিয়েটারে বহুদিন ধরে কাজ করা অভিনেতা দেবদাস। বলিউডে কিন্তু ফলোয়ার্সদের মাপজোক ব্যাপারটা আমার নজরে এখনও পড়েনি।'' সম্প্রতি আমাজন প্রাইমের করণ জোহরের প্রযোজনা সংস্থার তৈরি 'লাভস্টোরিয়া' সিরিজে জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার ঝিলম কাস্ট হয়েছিল অনিমেশ বাপুলির হাত ধরেই।
[আরও পড়ুন: বাংলায় ‘স্বামী’ গানের নয়া ভার্সান, নাচের নতুন কায়দা শেখাল পুষ্পা-শ্রীভল্লি]
