পঁচিশ সালে ফেডারেশনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পরই টলিউডের তেরো পরিচালকের বিরুদ্ধে অলিখিতভাবে নেমে এসেছিল 'নিষিদ্ধ খাঁড়া'। বিগত একবছরে প্রাক্তন ফেডারেশন সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের অঙ্গুলি হেলনে ইন্ডাস্ট্রিতে কার্যত কোণঠাসা হতে হয়েছিল সেসব পরিচালকদের। তবে রুজিরুটি অনিশ্চিৎ হলেও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি মামলা দায়েরকারী দশ পরিচালক। বলা ভালো, ইস্পাতসম শিরদাঁড়া নিয়েই স্বরূপ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই জারি রেখেছিলেন তাঁরা। এবার টলিউডের সেই 'ত্রাস' গ্রেপ্তার হতেই 'হারাধনের ওই দশ ছেলে'কে স্যালুট সুদীপ্তা চক্রবর্তীর (Sudipta Chakraborty)।
"ফেডারেশন সভাপতির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা প্রায় শ'দেড়েক-দুয়েক বিপ্লবী পরিচালকদের সাহসের বেলুন যখন একে-একে ফুসসসস্ হয়ে যাচ্ছে, কাউকে দিদিমণি বকে দিচ্ছেন, তো কাউকে দাদামণি...।"
অভিনেত্রী বরাবরই স্পষ্টবাদী। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির যে কোনও ইস্যুতে প্রতিবাদী কণ্ঠ ছাড়েন। এবার স্বরূপের গ্রেপ্তারির পর ইন্ডাস্ট্রির দুর্নীতি এবং লড়াকু সেই পরিচালকদের কুর্নিশ জানালেন তিনি। সুদীপ্তার মন্তব্য, "বছর দেড়েক আগে টালিগঞ্জ ফিল্ম কিংবা টিভি ইন্ডাস্ট্রির যখন 'দুলিতেছে তরী ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ' অবস্থা, ফেডারেশন সভাপতির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা প্রায় শ'দেড়েক-দুয়েক বিপ্লবী পরিচালকদের সাহসের বেলুন যখন একে-একে ফুসসসস্ হয়ে যাচ্ছে, কাউকে দিদিমণি বকে দিচ্ছেন, তো কাউকে দাদামণি বা কারোর চলতি সিরিয়ালের শিল্পী, কলাকুশলীদের বাড়ির ভাতের হাঁড়ি স্বপ্নে দেখা দিচ্ছে, তো কারো দামি ফ্ল্যাটের ইএমআই 'আয় আয়' বলে ডাকছে বা কারো সিনেমার শুটিং বন্ধ হয়ে যাবে ভেবে ছোটবেলায় পড়া 'শো মাস্ট গো অন'-এর নামতা মনে পড়ছে, তো কারো সদ্যজাত সন্তানের মুখ সামনে ভেসে উঠছে, যখন রোজ একটা করে মুখস্থ করা স্ক্রিপ্টের ভিডিও আসছে দিকপাল পরিচালকদের কাছ থেকে, যখন রোজ খবরে দেখাচ্ছে 'চানাচুর মুড়ি আর চা' সহযোগে 'আড্ডা' দিয়েই টালিগঞ্জের 'একটাই পরিবারের' সদস্যরা 'সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে' ফেলে যে যার নিজের শুটিংয়ে ফিরে যাচ্ছেন, তখন চুপ করে এই 'একে একে নিভিছে দেউটি' সিনেমাটা বসে বসে দেখে গিয়েছেন হারাধনের দশটি ছেলে- দশজন পরিচালক।"
ইন্ডাস্ট্রির ব্যান কালচার নিয়ে সুদীপ্তা।
এরপরই অভিনেত্রীর সংযোজন, "নিজেদের তৈরি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে একজন একজন করে যখন 'লিভ' করছেন সবাই, কেউ কারণ জানিয়ে, কেউ বা না জানিয়ে, কেউ ক্ষমা চেয়ে নিয়ে, কেউ বা সেসবের তোয়াক্কা না করেই, তখনও হারাধনের এই দশটি ছেলে হার মানেননি। রাগে-দুঃখে, অপমানে অমানুষিক কষ্ট পেয়ে কেউ স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছেন, তো কেউ আড়ালে চোখের জল ফেলেছেন, কেউ নিজেদের মধ্যেই বা কখনও সমাজ মাধ্যমে রাত আটটার পর হতাশা ব্যক্ত করতে থেকেছেন, তো কেউ একদম চুপ করে গিয়েছেন, কেউ এদিক-ওদিক দৌঁড়েছেন অন্য কোনও কাজের খোঁজে, কেউ বা নিজের দমে গান বেঁধে ভিতরের 'শিল্পী'টাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু মাথা নোয়াননি কেউই।" একদিকে যখন কাজ নেই, তখন কীভাবে মুখ বুজে আইনি লড়াই লড়ে যাচ্ছিলেন টলিউডে নিষিদ্ধ হওয়া ওই দশ পরিচালক? স্বরূপের গ্রেপ্তারির পর সেই খতিয়ানই তুলে ধরলেন সুদীপ্তা চক্রবর্তী।
"হিম্মত যদি কারো থেকে থাকে, তো এঁদেরই ছিল। আজও আছে। বাকি সব আব্বুলিশ। আব্বুলিশরা পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দেখা হলে। তাঁদেরই বোধহয় হিম্মতে টান পড়েছিল, এঁদের কিন্তু পড়েনি।..."
'হারাধনের লড়াকু সেই দশ ছেলে' অনির্বাণ ভট্টাচার্য, আশিস সেন চৌধুরী, অভিষেক সাহা, বিদুলা ভট্টাচার্য, দেবাশিস চক্রবর্তী, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, কিংশুক দে, সুব্রত সেন, সুদেষ্ণা রায়, সুমিত দামদের নামোল্লেখ করে অভিনেত্রীর মন্তব্য, "বেশি সংখ্যক সিনেমা যাতে তৈরি হয় তার জন্য প্রস্তাবিত সমাধানের লিস্ট নিয়ে ফেডারেশনের কড়া নেড়েছেন ওঁরা বহুবার। ব্যর্থ মনোরথ হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। কেউ বরের থেকে তো কেউ বউয়ের থেকে টাকা নিয়ে উকিলের পারিশ্রমিক দিয়ে গিয়েছেন দিনের পর দিন। তারিখ পে তারিখ গেছে। কোর্টের চক্কর কেটেছেন ওই ক'জন মিলেই। আর টেকনিশিয়ানদের বোঝানো হয়েছে এঁরা দূরাত্মা, এঁরা টেকনিশিয়ান বিরোধী, এঁরা অন্যায় করছেন, তাই এঁরা 'ব্যানড'। অপমানে কাঁধ ঝুঁকেছে, কিন্তু শিরদাঁড়া বাঁকানো যায়নি এঁদের। সেদিন থেকে আজ অবধি নিজেরাই হয়ত নিজেদের বুঝিয়েছেন 'ছিঁড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মত?' হিম্মত যদি কারো থেকে থাকে, তো এঁদেরই ছিল। আজও আছে। বাকি সব আব্বুলিশ। আব্বুলিশরা পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন দেখা হলে। তাঁদেরই বোধহয় হিম্মতে টান পড়েছিল, এঁদের কিন্তু পড়েনি। ফেডারেশন সভাপতির গ্রেপ্তারির খবর পেয়ে লকারে রাখা বিবেক আর শিরদাঁড়া আবার বের করছেন সব ধীরে ধীরে। কিন্তু তফাতটা যে রয়েই গেল, ওই যাকে বলে 'শিরদাঁড়া'য়।"উল্লেখ্য, সেসময়ে ফেডারেশনের 'ধমকি-চমকি'তে সিনেপাড়ার তাবড় মুখরা পর্যন্ত ভিডিও বার্তা পোস্ট করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়েছিলেন। সেই তালিকায় সৃজিত মুখোপাধ্যায়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়-সহ আরও অনেকে রয়েছেন। সুদীপ্তা কি তাঁদেরই 'বিপ্লবী' বলে বিঁধলেন?
