বাংলার ম্যাটিনিতে উত্তম কুমার একাই একশো। বেঁচে থাকলে এবছর একশোয় পা দিতেন ঠিকই, তবে প্রয়াণের সাড়ে চার দশক পেরলেও বাঙালির কাছে তাঁর বিকল্প এখনও ধরা দেয়নি। আজও মহানায়ক বাঙালির 'একমেবাদ্বিতীয়ম' ম্যাটিনি আইডল। উত্তম স্মরণে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।
উত্তম কুমার নামের এক অভিনেতা ছিলেন, এক সময়ে, কোনওদিন কোনও বাঙালিকে এমনটা বলতে শুনেছেন? শুনবেনও না। কারণ উত্তম কুমার বাঙালির কাছে কোনওদিনই 'অতীত' হয়ে যাননি। তিনি আমাদের বরাবরের বর্তমান। তাঁর স্মৃতি, তাঁর হাসি, তাঁর তাকানো, তাঁর হাঁটা-চলা, তাঁর কথা বলা- এই সবটা যেন কখন আমাদের জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে গিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি পরিবারে তিনি এক অলিখিত সদস্য।
কারও কাছে বাবা-মায়ের দেখা সিনেমার নায়ক, কারও কাছে শৈশবের রবিবারের দুপুর, কারও কাছে প্রথম প্রেমের মুখ, আবার কারও কাছে অভিনয়ের এক অসাধারণ পাঠ। প্রত্যেক প্রজন্ম তাঁকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করেছে।
উত্তম কুমারের জন্ম শতবর্ষ
'বাঙালি' বললেই পৃথিবী জুড়ে মানুষের মনে যে ক'টি ছবি ভেসে ওঠে, উত্তম কুমার তার মধ্যে অন্যতম, শুধু একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, বাঙালিয়ানার প্রতীক হিসেবেও। তাঁর সঙ্গে বাঙালির সম্পর্কটা একটু অদ্ভুত। তিনি তো সকলের আত্মীয় নন, তবু কোথাও গিয়ে যেন নিজেরই মানুষ। কারও কাছে বাবা-মায়ের দেখা সিনেমার নায়ক, কারও কাছে শৈশবের রবিবারের দুপুর, কারও কাছে প্রথম প্রেমের মুখ, আবার কারও কাছে অভিনয়ের এক অসাধারণ পাঠ। প্রত্যেক প্রজন্ম তাঁকে নিজের মতো করে আবিষ্কার করেছে। তবে শুধু নস্টালজিয়া দিয়ে তো আর একজন শিল্পীকে এতকাল বাঁচিয়ে রাখা যায় না। আর এখানেই আসে তাঁর অভিনয়ের বহুমুখিতার প্রসঙ্গ। একই মানুষ কখনও নিখাদ প্রেমিক, কখনও সাধারণ মধ্যবিত্ত, কখনও অহংকারী তারকা, কখনও ক্লান্ত ও একাকী মানুষ, আবার কখনও গভীর অন্ধকারে আটকে থাকা একজন মানুষ হয়ে উঠেছেন। তাঁর চরিত্ররা কেউ নিখুঁত নয়। তারা ভুল করে, ভালোবাসে, হারায়, দ্বিধায় পড়ে, কখনও নিজের কাছেই হেরে যায়। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিজের স্টার পার্সোনা-কে অতিক্রম করার ক্ষমতা। এত বড় তারকা, চাইলেই প্রতিটি চরিত্রের উপর সেই ছাপ চাপিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু অভিনেতা উত্তম কুমার তা কখনওই করেননি।
মানুষের ভালোবাসা, একাকিত্ব, অহংকার, ব্যর্থতা, স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এসবের মতোর-ইমোশনগুলো তো বদলায়নি। সেই অনুভূতিগুলোকে এত নিখুঁতভাবে যিনি জীবন্ত করে তুলেছেন, তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বদলায় কেমন ভাবে? হয়তো একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য এটাই, তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ কোনওদিন শেষ হচ্ছে না!
মহানায়ক উত্তম কুমার
কখনও তারকা-সত্তাকে চরিত্রের অংশ করেছেন, কখনও সেটাকে একেবারে সরিয়ে রেখে ভিতরের রক্ত-মাংসটাকে সামনে টেনে এনেছেন। তাই আমরা 'উত্তমকুমার অভিনয় করছেন' এটা ভুলে গিয়ে চরিত্রটিকেই বিশ্বাস করেছি। আজ সিনেমার ভাষা বদলেছে, নায়কের সংজ্ঞা বদলেছে, দর্শকের রুচিও বদলেছে। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, একাকিত্ব, অহংকার, ব্যর্থতা, স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা এসবের মতোর-ইমোশনগুলো তো বদলায়নি। সেই অনুভূতিগুলোকে এত নিখুঁতভাবে যিনি জীবন্ত করে তুলেছেন, তাঁর প্রাসঙ্গিকতা বদলায় কেমন ভাবে? হয়তো একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য এটাই, তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ কোনওদিন শেষ হচ্ছে না! আর তাই তাঁর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে প্রশ্ন করাটাই হয়তো একটু ভুল। যা প্রয়োজনে মনে করতে হয়, তা কেবলই স্মৃতি। আর যা আলাদা করে মনে করানোর প্রয়োজন হয় না, তা হল অভ্যাস। উত্তমকুমারের কাছে বারবার ফিরে ফিরে আসাটা বাঙালির সেই অভ্যাস।
