shono
Advertisement
Deepti Sharma

দীপ্তির বং কানেকশন! 'মেন্টর' মিঠুর মুখে কুমোরটুলির ফ্ল্যাটের গল্প, বিশ্বজয়ীর অপেক্ষায় বেহালাও

দীপ্তি দলে যোগ দেওয়ার পর থেকে ট্রফি জিততে শুরু করে বাংলা।
Published By: Sulaya SinghaPosted: 08:16 PM Nov 04, 2025Updated: 08:16 PM Nov 04, 2025

প্রসেনজিৎ দত্ত: সাত বছর আগের একদিন। ১৫ মে, ২০১৭। দিনটার কথা অনেকের মনে থাকবে। অনেকের হয়তো নয়। সেদিন প্রথমবার ওয়ানডে'তে ৩০০ রানের গণ্ডি অতিক্রম করেছিল ভারতের মেয়েরা। যার কাণ্ডারি দীপ্তি শর্মা ও পুনম রাউত। ১০৯ রান করে পুনম চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লেও মারমুখী মেজাজ ধরে রেখেছিলেন দীপ্তি। করেন ১৬০ বলে ১৮৮। আজ তিনি বিশ্ববন্দিত। বিশ্বকাপের সেরাও। সেই দীপ্তিকে নিয়ে তৃপ্তি ঝরে পড়ল বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং জাতীয় নির্বাচক মিঠু মুখোপাধ্যায়ের গলায়। কলকাতার কুমোরটুলিতে দীপ্তি থাকতেন মিঠু মুখোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাটে। অনেকটাই কাছ থেকে দেখেছেন তাঁকে। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল-কে শোনালেন সেসব কথা।

Advertisement

আগ্রার মতো শহর থেকে বেড়ে ওঠা দীপ্তি ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর এই উত্থানের নেপথ্যে দাদা সুমিত শর্মার আত্মত্যাগ। তিনিও ক্রিকেটার ছিলেন। উত্তরপ্রদেশে অনূর্ধ্ব দলগুলিতেও খেলেছেন। যখনই অনুশীলনে যেতেন, আঠার মতো লেগে থাকতেন বোন। একদিন বাউন্ডারি লাইনের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন দীপ্তি। অনুশীলন চলছিল অনুশীলনের মতোই। হঠাৎই একটা বল আগুয়ান দীপ্তির দিকে। বল নিয়ে কোনও কিছু না ভেবে বিশাল থ্রো। বল সাঁ করে চলে যায় বাইশ গজের কাছাকাছি। অতটুকু মেয়ে, হাতে এত জোর... এ তো বিস্ময়! দাদা সুমিত কানপুরের একলব্য স্পোর্টস স্টেডিয়ামে পরের দিন থেকেই দীপ্তিকে নিয়মিত অনুশীলনে নিয়ে আসা শুরু করেন। সেই মেয়েই আজ বিশ্বজয়ী।

তখন ভারতীয় দলের তারকা দীপ্তি। চারদেশীয় সিরিজে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচ আলোয় এনেছিল তাঁকে। আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওপেনিং জুটিতে মেয়েদের ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩২০ রান যোগ করার নজির গড়েছিলেন দুই ভারতীয় ওপেনার দীপ্তি শর্মা ও পুনম রাউত। তারপর ’১৭ বিশ্বকাপ আর ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গ... শুনতে শুনতে সেই মাকড়সার গল্পটার কথা মনে পড়ছিল। জীবনে সফল হতে গেলে অধ্যবসায়ের কোনও বিকল্প নেই। এমনটা কিন্তু লেখক উপলব্ধি করেছিলেন মাকড়সার জাল বোনা দেখে। জাল বুনতে গিয়ে মাকড়সাটি মাঝেমাঝেই যেমন পড়ে গিয়ে ফের উঠছিল, তেমন জীবনও। সেখান থেকেই রসদ নিয়ে চরৈবেতি মন্ত্রেই হয়তো উত্তরপ্রদেশ থেকে বাংলায় এসেছিলেন দীপ্তি, ঘরোয়া ক্রিকেট খেলবেন বলে।

উত্তরপ্রদেশ থেকে বাংলায় খেলতে আসতে প্রভাবিত করেছিলেন 'মেন্টর' মিঠু মুখোপাধ্যায় এবং ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রাক্তন অধিনায়ক ঝুলন গোস্বামী। বাংলায় খেলার সময় একেবারে সাধারণ মেয়ের মতোই মিঠু মুখোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাটে থাকতেন ততদিনে তারকা বনে যাওয়া দীপ্তি। মিঠুদি বলেন, "ওর মতো মেয়ে হয় না। একেবারে মাটির মানুষ। পা সব সময় মাটিতে থাকে। কখনও অহংকার করতে দেখিনি। ও যখন বেঙ্গল খেলতে চায়, প্রস্তাবটা লুফে নিয়েছিলাম। তখন এমনিই একজন ব্যাটার খুঁজছিলাম আমরা। দীপ্তির মতো অলরাউন্ডার পাওয়াটাও ভাগ্যের।" ফিরে এসে লড়াই করার নামই জীবন। ওঠানামাকে ভালোবাসতে হয়। একে অতিক্রম করতে হয়। নাহলে বেঁচে থাকায় আনন্দ নেই। দাদার সঙ্গে যখন প্র্যাকটিসে আসতেন দীপ্তি, তখন প্রাক্তন ক্রিকেটার হেমলতা কলার নজরে আসে। সূত্র ধরিয়ে দেওয়ার কাজটি করেছিলেন হেমলতা। আর এরপর তাঁর সেই তাগিদটাকে হয়তো আরও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন মিঠু মুখোপাধ্যায় এবং ঝুলন গোস্বামী।

ঠাকুরপুকুরের আবাসনে দীপ্তি।

দীপ্তি দলে যোগ দেওয়ার পর থেকে ট্রফি জিততে শুরু করে বাংলা। ২০২৩-এ ঝুলন গোস্বামীর নেতৃত্বে সিনিয়র ওয়ানডে টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন হয় বঙ্গ ব্রিগেড। ওই প্রতিযোগিতায় পাঁচশোর কাছাকাছি রান করে সর্বোচ্চ স্কোরার হয়েছিলেন তিনি। এহেন দীপ্তি কিন্তু নিরামিষাশী। বজরংবলির ভক্ত। "ও খুবই নিষ্ঠাবান। বজরংবলির ভক্ত। ভেজিটেরিয়ান। প্রত্যেকদিন হনুমান চালিশা পড়ে ঘুমাতে যায়। এটাই হয়তো ওকে জোর জুগিয়েছে। ওর মধ্যে কখনও কোনও বায়নাক্কা দেখিনি। মুখ ফুটে কখনও কিছু চাইত না। তবে প্রতিদিন সকালে নিয়ম করে চারটে করে আলমন্ড খেত। নিজেকে ফিট রাখতে ডায়েটও মেনটেন করত। আমি যখন ক্রিকেটের কাজে এদিক-ওদিক যেতাম, ওর তত্ত্বাবধান করত আমার বোন, সৌমা চক্রবর্তী। দীপ্তির দাদাও এই ফ্ল্যাটে অনেকবার থেকে গিয়েছে। বিশ্বকাপের আগেও দীপ্তি কুমোরটুলির ফ্ল্যাটে এসেছিল।" বিশ্বকাপ ফাইনালের পর কি কথা হয়েছে? "এই মুহূর্তে ও ব্যস্ত। তাই মেসেজে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। রিপ্লাই দিয়েছিল।"

দীপ্তির সঙ্গে মাঠে যাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "বছর দশ আগেকার কথা। আমি তখন শ্যামবাজারের চন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় মেমোরিয়াল ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে প্রশিক্ষণ দিতাম। সেই সময় ওখানকার গৌরীমাতা উদ্যানে বেশ কয়েকবার দুপুরে ও সেখানে গিয়ে নকিং করেছে। প্র্যাকটিসের ব্যাপারে দীপ্তি খুবই দায়িত্ববান। নিজের কন্ট্রিবিউশনের ব্যাপারে ও খুবই সচেতন। কতটা দিতে পারলাম দলকে, যে কোনও ম্যাচই হোক, সেটা সব সময় কাউন্ট করে ও। তাছাড়া সিএবি'তে ও রেগুলার প্র্যাকটিস করত। গত বছরই ও বেঙ্গল থেকে উত্তরপ্রদেশ পাড়ি দিয়েছে। ডিএসপি হয়েছে। ওকে দারুণ লাগে ওই পোশাকে। ইউপি'তেই ও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলবে।"

বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে এক আসরে ২০০ রান এবং ২২টি উইকেট নেওয়া দীপ্তি ভালো বাংলাও বলতে পারেন। এমনই জানালেন মিঠুদি। কেবল ভাষাটা বলাই নয়, বাংলার আদবকায়দাও তাঁর নখদর্পণে। রিচা ঘোষের সঙ্গে যখন ব্যাটিং করেন দীপ্তি, একে অপরের সঙ্গে বাংলায় কথা বলেন। এহেন দীপ্তি কয়েক বছর আগে বেহালার ঠাকুরপুকুরে ফ্ল্যাট কিনেছেন। সেই আবাসনের বাসিন্দা চন্দন চক্রবর্তী বললেন, "দীপ্তি আমাদের আবাসনের এক প্রিয় বাসিন্দা। যখনই ও এখানে থাকে পার্কের ছোট্ট চৌখুপি পেয়ে নেমে পড়ে আমাদের বাচ্চাদের নিয়ে। ওয়ার্ল্ড কাপ খেলতে যাওয়ার আগেও খেলে গিয়েছে। বাচ্চাদের শিখিয়েছে, এভাবে ব্যাট করবে, ওভাবে বোলিং বা ফিল্ডিং করবে। বাচ্চাগুলো উচ্ছ্বসিত, অনুপ্রাণিত। আমাকে হেঁটো প্রণাম করে বলেছিল, 'আঙ্কেল'!" এই দীপ্তির জন্য এখন অপেক্ষা করছে ঠাকুরপুকুর। তিনি এলেই ঘটা করে সংবর্ধনা দেবেন আবাসনের বাসিন্দারা।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
  • দীপ্তিকে নিয়ে তৃপ্তি ঝরে পড়ল বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং জাতীয় নির্বাচক মিঠু মুখোপাধ্যায়ের গলায়।
  • কলকাতার কুমোরটুলিতে দীপ্তি থাকতেন মিঠু মুখোপাধ্যায়ের ফ্ল্যাটে।
  • অনেকটাই কাছ থেকে দেখেছেন তাঁকে। সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল-কে শোনালেন সেসব কথা।
Advertisement