shono
Advertisement
Mahishasura

অভিশাপ ও পুনর্জন্মের জটিল রহস্য, কীভাবে জন্ম নেন মহাপরাক্রান্ত মহিষাসুর?

শুভ এবং অশুভের যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যকে মন্থন করেছে, তার অন্যতম শীর্ষবিন্দু মহিষাসুর।
Published By: Buddhadeb HalderPosted: 08:50 PM Sep 13, 2026Updated: 09:07 PM Sep 13, 2026

এক অদ্ভুত সমীকরণে গাঁথা অসুরের জন্মবৃত্তান্ত। যেখানে কাম, তপস্যা, অভিশাপ এবং পুনর্জন্মের রক্তিম সুতো একসঙ্গে পেঁচিয়ে তৈরি করেছে এক মহাপরাক্রান্ত নিয়তি। শুভ এবং অশুভের যে চিরন্তন দ্বন্দ্ব ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যকে মন্থন করেছে, তার অন্যতম শীর্ষবিন্দু মহিষাসুর। কিন্তু দেবীর চরণে পরাভূত এই তমোগুণের প্রতীক কেবল এক রণক্ষেত্রের খলনায়ক নন; তাঁর অস্তিত্বের নেপথ্যে লুকিয়ে গভীর শাস্ত্রীয় রহস্য। রয়েছে এক জটিল বংশলতিকাও।

Advertisement

দানবরাজ রম্ভ এবং শাপগ্রস্ত রূপান্তরকামী অপ্সরার মিলনেই এই সত্তার সূত্রপাত। কিন্তু পিতার অকালমৃত্যু এবং মায়ের পতিব্রতা ধ্যানে একই গর্ভে একসঙ্গে দুটি ভিন্ন আত্মিক উপাদানের সমাবেশ ঘটে। একদিকে পিতৃ-আত্মার রূপান্তর হিসেবে জন্ম নেন রক্তবীজ, অন্যদিকে স্বাভাবিক গর্ভস্থ সন্তান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মহিষাসুর। এক গর্ভ থেকে দুই দানবীয় শক্তির এই যুগপৎ বিকাশ পৌরাণিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।

শাস্ত্রীয় ব্যাকরণে অসুরকুল মূলত দনুজ এবং দৈতেয় ধারার প্রতীক। দৈত্যরাজ রম্ভের কঠোর তপস্যা ও অগ্নির বরদানের ফলস্বরূপ এই ধারার চরম পরিণতি ঘটেছিল। পিতার তপস্যার শক্তি এবং মাতার রূপান্তরের ক্ষমতা—এই দুইয়ের যুগপৎ উপস্থিতিতে ঘটেছিল মহিষাসুরের আবির্ভাব। দেবীভাগবত ও মার্কণ্ডেয় পুরাণের সূক্ষ্ম নির্যাস নির্দেশ করে, প্রাক-জন্মের অভিশাপ ও আকস্মিক নিয়তিই মহিষাসুরের দৈহিক ও মানসিক গঠনের প্রধান ভিত্তি।

প্রতীকী ছবি

মহিষাসুরের জন্মকাহিনির সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়টি তাঁর গর্ভধারণের প্রেক্ষাপট। অগ্নিদেব রম্ভকে বর দিয়েছিলেন, তাঁর পুত্র হবে স্বর্গ-মর্ত্য-অসুরলোকের একচ্ছত্র অধিপতি। ঘটনাচক্রে রাজা রম্ভ বিবাহ করেন অভিশাপগ্রস্ত স্বর্গের এক অপ্সরাকে। পৃথিবীতে এসে এই অপ্সরা মানবীর পাশাপাশি মহিষীর রূপ ধারণ করে থাকতেন। একদিন এই অপ্সরাকে অপর এক মায়াবী মোষ কামনা করে বসেন। সেই সময় রাজা রম্ভের সঙ্গে যুদ্ধ বেঁধে যায় তার। যুদ্ধে প্রাণ হারান রম্ভ। তখনই রম্ভের আত্মাকে নিজ গর্ভে স্থান দেন পতিব্রতা মহিষী। ফলে, তার গর্ভে লালিতপালিত হতে থাকে স্বামীর আত্মা, যার পুনর্জন্ম হয় অসুর রক্তবীজ। আর অপর গর্ভস্থ সন্তান যিনি, তিনিই হলেন মহিষাসুর। 

দানবরাজ রম্ভ এবং শাপগ্রস্ত রূপান্তরকামী অপ্সরার মিলনেই এই সত্তার সূত্রপাত। কিন্তু পিতার অকালমৃত্যু এবং মায়ের পতিব্রতা ধ্যানে একই গর্ভে একসঙ্গে দুটি ভিন্ন আত্মিক উপাদানের সমাবেশ ঘটে। একদিকে পিতৃ-আত্মার রূপান্তর হিসেবে জন্ম নেন রক্তবীজ, অন্যদিকে স্বাভাবিক গর্ভস্থ সন্তান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন মহিষাসুর। এক গর্ভ থেকে দুই দানবীয় শক্তির এই যুগপৎ বিকাশ পৌরাণিক ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল।

উত্তরাধিকার সূত্রে মায়ের থেকে মহিষাসুর পেয়েছিলেন রূপ পরিবর্তনের মায়াবী ক্ষমতা। 'কামরূপী' এই ক্ষমতার জোরে তিনি যেমন মুহূর্তের মধ্যে পশুর আকার ধারণ করতে পারতেন, তেমনই মায়াজাল বিস্তার করে ছদ্মবেশে আত্মগোপন করতেও পারতেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ব্রহ্মার প্রাপ্ত বর। পুরুষের অবধ্যতার অহংকার তাঁকে পরম ধৃষ্টতার দিকে ঠেলে দেয়। তিনি নারীশক্তিকে গণ্য করেছিলেন অবলা ও শক্তিহীন হিসেবে। শাস্ত্রে এই অহংকারকেই বলা হয়েছে 'প্রকৃতি-অবমাননা'।

ছবি: সংগৃহীত

পরবর্তীকালে ত্রিভুবন জয় করে তিনি যখন স্বর্গের অধিকার হরণ করেন, তখন সৃষ্টি হয় চরম ধর্মসংকট। দেবতাদের তেজ ও সম্মিলিত সংকল্প রূপ নেয় এক পরমাসুন্দরী চণ্ডিকার। ব্রহ্মার বরকে অক্ষুণ্ণ রেখেও মহাজাগতিক নিয়তি নিজের পথ করে নেয়। যে শক্তিকে মহিষাসুর দুর্বল ভেবেছিলেন, সেই আদি পরাশক্তি 'মহামায়া'ই চণ্ডী রূপে তাঁর বিনাশ ঘটান। একই সঙ্গে কালিকা রূপে ধ্বংস হয় রক্তবীজের রক্তবিন্দু থেকে জন্মানো অসুরের বংশ।

মহিষাসুরের এই ট্র্যাজিক পরিণতি কেবল এক মহাপতন নয়, বরং প্রবৃত্তি ও তমোগুণের উপর সনাতন পরমশক্তির বিজয়ের এক শাশ্বত রূপক।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement