shono
Advertisement

Breaking News

Alternative Fuels

বিকল্প জ্বালানি ও 'ব্রাজিল মডেল', ভারতের ভবিষ্যৎ কী?

১৯৩১ থেকে ব্রাজিল পেট্রোলের সঙ্গে ৫% ইথানল মিশিয়ে জৈব জ্বালানির প্রয়োগ শুরু করে। এখন ১০০% শতাংশ ইথানল দিয়ে গাড়ি চলছে সেখানকার বিভিন্ন শহরে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 10:58 AM Aug 21, 2026Updated: 11:12 AM Aug 21, 2026

১৯৩১ থেকে ব্রাজিল পেট্রোলের সঙ্গে ৫% ইথানল মিশিয়ে জৈব জ্বালানির প্রয়োগ শুরু করে। এখন ১০০% শতাংশ ইথানল দিয়ে গাড়ি চলছে সেখানকার বিভিন্ন শহরে। বিভিন্ন মাত্রার জৈব জ্বালানির সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে তৈরি হওয়া গাড়ির ইঞ্জিনের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে তারা। ভারত সে-পথে যেতে চায় অদূর ভবিষ্যতে। কিন্তু এর ভাল ও মন্দ সম্ভাবনা কী কী? লিখছেন পার্থপ্রতিম বিশ্বাস

Advertisement

ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ জার্সি যেমন বিশ্ব ফুটবলের উদ্দীপন বিভাব, তেমনই শক্তির ক্ষেত্রে ‘বিকল্প’ জৈব জ্বালানির প্রযুক্তিতে এ মুহূর্তে বিশ্বসেরা মডেল হয়ে উঠেছে ব্রাজিল। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ফুটবল বিশ্বকাপে অফিশিয়াল জ্বালানি রূপে তুলে ধরা হয়েছিল জৈব জ্বালানিকে। এখন জ্বালানি বিভ্রাটে জেরবার হয়ে আমাদের দেশের মানুষ ফের ব্রাজিলের নামোল্লেখ করছে। ভারতের সংসদ থেকে শুরু করে পাড়ার চায়ের দোকান– সর্বত্র বাতাবরণ সরগরম ‘ই২০’ জ্বালানি ঘিরে। বিতর্ক, যুক্তি ও পাল্টা-যুক্তিতে খেই হারিয়ে ফেলছে মানুষজন। এমন প্রেক্ষিতে জ্বালানি বিতর্কে নতুন ইন্ধন জুগিয়েছে দেশের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি. অনন্ত নাগেশ্বরনের প্রকাশ্য অবস্থান। জৈব জ্বালানির প্রয়োগ নিয়ে দেশের সরকারের গৃহীত নীতির বিরুদ্ধে মতামত ব্যক্ত করেছেন। কাজেই সরকারের জৈব জ্বালানি নীতির ভবিষ্যৎ কোন পথে তা আলোচনায় উঠে আসা স্বাভাবিক।

জৈব জ্বালানি, এগিয়ে ব্রাজিল

পেট্রোলের সঙ্গে ইথানল মিশিয়ে তা জৈব জ্বালানি রূপে ব্যবহার করছে এখন পৃথিবীর বহু দেশ। সে তালিকায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে ব্রাজিল এবং আমেরিকা। ১৯৩১ সাল থেকে ব্রাজিল পেট্রোলের সঙ্গে ৫% ইথানল মিশিয়ে জৈব জ্বালানির প্রয়োগ শুরু করে। ১৯৭০ সালে প্রবল পেট্রো জ্বালানির সংকটের প্রেক্ষিতে কৃষিনির্ভর ব্রাজিল, পেট্রোলের মতো আমদানি-নির্ভর জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে, দেশজ ইথানলের প্রতিস্থাপনের মাত্রা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সেই সংকটে চিনির বাজারদর কমে যাওয়ায় ব্রাজিলের বিপুল আখ চাষের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আখ থেকে ইথানলের মতো জ্বালানি তৈরি করে ব্রাজিল একদিকে জ্বালানির দামে নিয়ন্ত্রণ এনেছিল। সেই সঙ্গে বিশ্ববাজারে আখ চাষিদের ‘বিকল্প’ জীবিকার পথও খুলে দিয়েছিল।

একদা পেট্রোলে ৫% ইথানল মেশানো দিয়ে শুরু করে এখন ১০০% শতাংশ ইথানল দিয়ে গাড়ি চলছে ব্রাজিলের বিভিন্ন শহরে। আমাদের দেশেও সড়ক পরিবহণ মন্ত্রী অদূর ভবিষ্যতে (২০৩০ সাল থেকে) পেট্রোলে ৩০% ইথানল মিশিয়ে ‘ই৩০’ জ্বালানি চালুর উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন। এমনকী, ব্রাজিলের মতো ১০০% ইথানলে (ই১০০) গাড়ি চালানোর লক্ষ্যও স্থির করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সন্দেহ নেই, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকটের নিরিখে জ্বালানি ক্ষেত্রে স্বয়ম্ভর হতে এবং আমদানির খরচ কমাতে পেট্রোলে ইথানলের প্রতিস্থাপন যেমন জরুরি তেমনই দূষণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও তা অত্যন্ত কার্যকর।

ফ্লেক্স ফুয়েল প্রযুক্তি

কিন্তু এখন বিতর্ক দানা বেঁধেছে নতুন জৈব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক হারে প্রয়োগের আগে যে-যে প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল তার অসম্পূর্ণতা ঘিরে। ব্রাজিল যেহেতু জৈব জ্বালানি ব্যবহারে পৃথিবীর অন্যতম ‘উন্নত মডেল’, সেহেতু তাদের সাফল্যের কারণগুলি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন– এ দেশের মাটিতে জৈব জ্বালানির সফল প্রয়োগের লক্ষ্যে। মনে রাখতে হবে যে, ৮-১০ বছরের চেষ্টায় নয়, ব্রাজিল ১৯৭৫ থেকে প্রায় ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষা করার পরে এখন জৈব জ্বালানি প্রয়োগে সাফল্যের মুখ দেখেছে। এই ৫০ বছরে ‘ই৫’ থেকে ‘ই১০০’ জ্বালানিতে উত্তরণের ক্ষেত্রে তাদের উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ ছিল– বিভিন্ন মাত্রার জৈব জ্বালানির সঙ্গে বিভিন্ন সময় তৈরি হওয়া গাড়ির ইঞ্জিনের মেলবন্ধন ঘটানো। সেই উদ্দেশ্যে যথাযথ গবেষণা ঘটিয়ে তারা ‘ফ্লেক্স ফুয়েল’ প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটাতে পেরেছে। যার অর্থ: একটি গাড়ির ইঞ্জিনের প্রযুক্তি বিভিন্ন মাত্রার, বিভিন্ন ধরনের জৈব জ্বালানি ব্যবহারে সক্ষম। সে-দেশের পেট্রোল পাম্পে ‘ই২০’ থেকে শুরু করে ‘ই১০০’ পর্যন্ত বিভিন্ন মাত্রার জ্বালানি কিনতে পাওয়া যায়। যেদিন যে-জ্বালানির দাম কম হয়, ক্রেতা তা গাড়িতে জ্বালানি হিসাবে ভরে নেন।

জৈব জ্বালানি চালু করতে গিয়ে ব্রাজিল প্রায় ৩০ বছর ধরে ধাপে ধাপে ওই জৈব জ্বালানির ব্যবহারোপযোগী ‘ফ্লেক্স ফুয়েল’ ইঞ্জিন তৈরির কাজ শেষ করেছে।

জ্বালানি অভিন্ন, ইঞ্জিন ভিন্ন

এখানেই তফাত ব্রাজিল আর আমাদের দেশের জ্বালানি নীতিতে। এ দেশের পেট্রোল পাম্পে এখন মেলে কেবল ‘ই২০’। অথচ দেশের লক্ষ লক্ষ গাড়ির ইঞ্জিন সেই জ্বালানির জন্য মানানসই নয়। ফলে গাড়ির ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তাড়া করছে সাধারণ মানুষকে, যে-আশঙ্কা আদৌ অমূলক নয়। আর একই সঙ্গে নতুন ‘ই২০’ জ্বালানির ধাক্কায় বেসামাল ইঞ্জিনের মাইলেজ কমছে। ফলে বাড়ছে গাড়িচালকদের রাস্তায় গাড়ি ছোটানোর খরচ। তৈরি হচ্ছে জন অসন্তোষ। নতুন ওই জৈব জ্বালানি সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার কারণে।

ব্রাজিলে যে ‘ফ্লেক্স ফুয়েল’ গাড়ির ইঞ্জিন রয়েছে তা এ দেশে চালু করা অসম্ভব নয়। সরকার পরিকল্পনা করলে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই পুরনো গাড়িগুলির ইঞ্জিনের প্রয়োজনীয় রূপান্তর ঘটানো যায় অল্প খরচেই। এক্ষেত্রে বিভিন্ন গাড়ি প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ জারি করতে হবে সরকারকে। ফলে এ দেশের বাজারে ‘ই২০’ পেট্রোল বাধ্যতামূলক করার আগে সরকারের উচিত ছিল– এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টির প্রতি যথাযথ গুরুত্ব আরোপ করা। যা উপেক্ষিত হওয়ায় এখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উষ্মা ও উৎকণ্ঠা।

সর্বঘটে কাঁটালি কলা

জৈব জ্বালানি চালু করতে গিয়ে ব্রাজিল প্রায় ৩০ বছর ধরে ধাপে ধাপে ওই জৈব জ্বালানির ব্যবহারোপযোগী ‘ফ্লেক্স ফুয়েল’ ইঞ্জিন তৈরির কাজ শেষ করেছে। এমনকী, এখনও তারা ক্রেতাদের কোনও বিশেষ একটি জ্বালানি ব্যবহারে বাধ্য করছে না। বরং একাধিক গোত্রের জৈব জ্বালানির সুযোগ থাকছে তাদের বিভিন্ন পাম্পে, যেটা এ-দেশে মিলছে না। ফলে ব্রাজিলে নতুন জ্বালানির মানানসই নতুন গাড়ির ইঞ্জিনের প্রযুক্তি সামাজিকভাবে সাফল্যের সঙ্গে গৃহীত হওয়ার কারণে তেমন কোনও জন অসন্তোষ দেখা যায়নি। এ প্রেক্ষিতে ‘ই২০’
জ্বালানি ছোট-বড়, নতুন-পুরনো সব গাড়িতেই ‘সর্বঘটে কঁাটালি কলা’-র মতো বাধ্যতামূলক করায় দেশব্যাপী যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা প্রকাশ্যে কবুল করেছেন স্বয়ং দেশের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা। তঁার মত, এ-দেশে প্রায় ৮০ লক্ষ মোটরসাইকেল কিংবা ২০২৩ সালের আগে তৈরি গাড়িতে ‘ই২০’ বাধ্যতামূলক করার পরিবর্তে/ পাশাপাশি ‘ই১০’ পেট্রোল ব্যবহারের সুযোগ থাকা উচিত। এই মতামত থেকেই স্পষ্ট, জৈব জ্বালানি দেশের বাজারে প্রয়োগের আগে আর্থ-সামাজিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া নিয়ে উপযুক্ত যাচাই করা দরকার ছিল।

ভুট্টা বা আখ থেকে ইথানল তৈরি করতে প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণ জল।

লাভের গুড় পিঁপড়ে না খায়
আমাদের দেশে আপাতত পেট্রোলে ২০ শতাংশের বেশি ইথানল প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন নেই। খাদ্য নিরাপত্তার প্রেক্ষিতে কথাটি বলা। এখানে ইথানল তৈরি হচ্ছে মূলত ভুট্টা থেকে। ভুট্টার জন্য দেশের সরকারের ধার্য মূল্য– অন্যান্য সমগোত্রীয় ফসলের তুলনায় ঢের বেশি। ফলে চাষের জমিতে ভুট্টা চাষের বাড়বাড়ন্ত হলে অঙ্কের নিয়মে সেই জমিতে কমবে চিনেবাদাম, সয়াবিন কিংবা সরষের চাষ। যেগুলি এ দেশের ভোজ্য তেলের জোগান নিশ্চিত করে। মনে রাখতে হবে, পেট্রোলের মতো ভোজ্য তেলের ক্ষেত্রেও চাহিদা অনেকখানি পূরণ হয় আমদানি করা তেল দিয়ে। আর, এই দেশের জনসংখ্যা ব্রাজিলের তুলনায় ৭ গুণ বেশি। ফলে ইথানলের উৎপাদন হইহই করে বাড়লে ভোজ্য তেলের উৎপাদনে টান পড়তে পারে। তাড়াহুড়ো করে ‘ই৩০’ বা ‘ই৭৫’ জৈব জ্বালানি বানিয়ে পেট্রোলিয়ামের আমদানির খরচ কমাতে গিয়ে শেষমেষ লাভের গুড় পিঁপড়েতে না খায়!

ভুট্টা বা আখ থেকে ইথানল তৈরি করতে প্রয়োজন প্রচুর পরিমাণ জল। আপাতভাবে ভাল দাম পাওয়ার লক্ষ্যে দেশে আখ কিংবা ভুট্টার উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা লাগাম ছাড়া হলে অন্যান্য চাষের জন্য ধার্য জলের ভাণ্ডারে টান পড়া অনিবার্য। যার জেরে খাদ্য নিরাপত্তার সংকট ঘনীভূত হতে পারে। পরিবেশ রক্ষার তাগিদে পেট্রোলে ইথানল মিশিয়ে জৈব জ্বালানির প্রয়োগের যে পরীক্ষামূলক পর্ব চলছে এ দেশে, তা সম্পর্কে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে। অন্যথায়, জ্বালানির সংকটের মোকাবিলা করতে গিয়ে মানুষের পেটের জ্বালা তীব্র হলে দূষণমুক্ত পরিবেশের মূল দাবিসমূহ গুলিয়ে যেতে পারে।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়
drppb@yahoo.in

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement