সরকারি নথি অনুযায়ী বছর-বছর ভারতের অরণ্যভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও– বাস্তব চিত্র কিন্তু তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপাতভাবে 'বৃক্ষরোপণ' বা 'বনসৃজন'-এর মাধ্যমে গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এমন মনে হলেও---আদপে তা না লাগছে হোমে, না যজ্ঞে! লিখছেন অরিজিৎ চট্টোপাধ্যায়।
২০১১ সালে জার্মানির বন শহরে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার’ এবং জার্মান সরকার মিলিতভাবে ‘বন চ্যালেঞ্জ’ নামে এক আন্তর্জাতিক প্রকল্প গ্রহণ করে, যার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল– পৃথিবীর নষ্ট বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রায় ৩৫ কোটি হেক্টর বনভূমিকে পুনরুদ্ধার; যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ভারতের ২.৬ কোটি হেক্টর। ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার’-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী– বনভূমি ‘পুনরুদ্ধার’ হল এমন এক পদ্ধতি, যা কেবলমাত্র বনসৃজন বা বৃক্ষরোপণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; যার মধ্যে সেখানে বসবাসকারী বন্যপ্রাণের জীবনযাপনের মানোন্নয়ন, তাদের আবাসভূমির যথাযথ দেখভাল, চলাফেরার পথের সংরক্ষণ এবং সর্বোপরি অরণ্যনির্ভর মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতিসাধনও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে।
‘বন চ্যালেঞ্জ’ সংগঠিত হওয়ার বছর তিনেক পর ২০১৪ সাল নাগাদ ভারত সরকারের পক্ষ
থেকে ‘গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন’ নামে এক জাতীয় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ‘বন চ্যালেঞ্জ’ এবং ‘গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন’-এর মোটের উপর লক্ষ্যও ছিল প্রায় একই– বনভূমির বাস্তুতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং বাস্তুতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল মানুষের (‘ইকোসিস্টেম পিপ্ল’) জীবন-জীবিকার উন্নয়ন নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, বিগত কিছু বছর ধরে বনভূমিনিধন অনিয়ন্ত্রিত হারে বাড়লেও তার মোকাবিলা করার জন্য জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে মানুষের উদ্যোগেরও কোনও অভাব ছিল না।
গন্ডগোলটা বাধল যখন বৃক্ষরোপণ এবং বনভূমি পুনরুদ্ধারের মধ্যে তফাতটাই মানুষ গুলিয়ে ফেলল। ভারতের মতো অধিকাংশ নিরক্ষীয় দেশ– যারা অরণ্যের বিবিধতা এবং জীবজগতের বিচিত্রতার দিক থেকে বিরল– বনভূমি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যে মূল সমস্যার মুখোমুখি– তা হল: গাছ বাঁচাতে গিয়ে অরণ্য হারিয়ে ফেলা। ‘ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’ ‘বনভূমি’-র সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছে: বনভূমি হল এমন বিশেষ অঞ্চল, যার আয়তন কমপক্ষে ১ হেক্টর হতে হবে এবং যেখানকার অন্তত ১০% এলাকা গাছের ছাউনি দিয়ে ঢাকা থাকবে। যার মধ্যে কেবলমাত্র সরকারি নয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিও অন্তর্ভুক্ত। কারণ পশ্চিমঘাট ও উত্তর-পূর্ব ভারতে এমন বেশ কিছু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে, যেখানে এখনও বেশ কিছু পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বনভূমির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।
ইউক্যালিপটাসের পাতা মাটিতে ঝরে, পচে গিয়ে এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক ক্ষরণ করে, যা গাছের তলার মাটিকে সম্পূর্ণ ঝোপশূন্য করে দেয়।
পৃথিবীতে বনভূমির ভূমিকা যে অপরিশোধযোগ্য, তা মানুষের অজানা নয়। তারা জানে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে গাছের গুরুত্ব কতখানি। তাই বর্তমানে একখণ্ড জমি পেলেই যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই বৃক্ষরোপণ করে দিচ্ছে মানুষ– যাকে ‘বনসৃজন’ হিসাবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য নির্ধারিত বিভিন্ন দিনগুলোয় দলবদ্ধভাবে বৃক্ষরোপণ অভিযান তো এখন অতি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এইভাবে যেখানে-সেখানে গাছ লাগিয়ে কখনওই বনভূমির মাত্রা বৃদ্ধি বা উজাড় হয়ে যাওয়া জঙ্গল পরিপূরণ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারি নথি অনুযায়ী বছর-বছর ভারতের অরণ্যভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও– বাস্তব চিত্র কিন্তু তার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই অভিযান আদপে না লাগছে হোমে, না যজ্ঞে!
এছাড়া অনেক সময়ই দেখা যায় বৃক্ষরোপণের নামে এমন সব গাছ লাগানো হয় তার মধ্যে বেশিরভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করা। যারা খুব তাড়াতাড়ি বড় হয়ে হয়তো সবুজ আচ্ছাদনের পরিমাণ বাড়ায়, কিন্তু আড়ালে রেখে যায় চরম ক্ষতি। যেমন, ইউক্যালিপটাসের মতো বেশ কিছু গাছ, যাদের হামেশাই বনসৃজনের জন্য ব্যবহার করা হয়, যা খুব তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনৈতিকভাবেও বেশ গুরুত্বওপূর্ণ, কিন্তু পরিবেশের নিরিখে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। এর শিকড় মাটির গভীরে প্রবেশ করে খুব দ্রুত সেখানকার জল শোষণ করে, ফলে মাটির মধ্যে সঞ্চিত জলের আকাল দেখা যায়।
যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে আশপাশের অন্য ছোটখাট স্থানীয় গাছ আর ঝোপঝাড়ের উপর। পর্যাপ্ত জলের অভাবে তাদের আধিক্য কমতে শুরু করে। এছাড়া ইউক্যালিপটাসের পাতা মাটিতে ঝরে, পচে গিয়ে এক বিশেষ ধরনের রাসায়নিক ক্ষরণ করে, যা গাছের তলার মাটিকে সম্পূর্ণ ঝোপশূন্য করে দেয়। গাছের তলায় ঝোপের উপস্থিতি সুস্থ বনভূমির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। এভাবেই বিদেশি গাছের প্রভাব ধীরে ধীরে দেশি গাছের প্রজাতি বৈচিত্রে হ্রাস ঘটায়– যা আঘাত হানে তাদের জিনগত বৈচিত্রেও। এর প্রভাব যে সুদূরপ্রসারী।
আধুনিক সংরক্ষণ পদ্ধতি মূল যে-তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে– তা হল: পরিকল্পনা, প্রয়োগ এবং দেখভাল। বনভূমি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথম দু’টি ধাপ সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলেও দেখভালের মতো দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতি অনুশীলন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বেশিরভাগ সময়। তা সে সাধ্যের অভাবেই হোক, বা ধৈর্যের। তাই কোনও ভূখণ্ডে বনভূমি পুনর্গঠন করার আগে সেই এলাকা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান সঞ্চয় করে সেখানকার জন্য উপযোগী স্থানীয় প্রজাতি ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত। শুধু পরিকল্পনামাফিক বৃক্ষরোপণ করলেই কাজ শেষ হয়ে যায় না, তার যথাযথ খেয়াল রাখাও বনভূমি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে জরুরি।
এই ধরনের হস্তক্ষেপ স্থানীয় জীববৈচিত্রর উপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বনভূমি পুনরুদ্ধার করতে গিয়ে আর-একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হ্যাবিট্যাট’ অবহেলিত রয়ে গিয়েছে, তা হল, ভারতের তৃণভূমি বা গ্রাসল্যান্ড। অপরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ এবং বনভূমির বিস্তার সরাসরি প্রভাব ফেলছে এর উপর। ভারতের তৃণভূমি এবং অন্যান্য উন্মুক্ত প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র কয়েক হাজার বছর ধরে প্রাকৃতিকভাবে বিবর্তিত হয়েছে এবং এগুলি গ্রেট ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড, কৃষ্ণসার হরিণ, নেকড়ে, হায়েনা-সহ বিভিন্ন অনন্য জীববৈচিত্রর নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
এদিকে, বর্তমানে ভারতে তৃণভূমি ও উন্মুক্ত প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কোনও পরিকল্পিত ব্যবস্থা নেই। ‘ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া’-ও এই সম্পর্কে খুব সীমিত তথ্য প্রকাশ করে। আর কোনওরকম পরিকল্পিত ব্যবস্থা বা প্রকাশিত নিয়ামাবলি না থাকায় এই আবাসস্থলগুলোতেও বৃক্ষরোপণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ধরনের হস্তক্ষেপ স্থানীয় জীববৈচিত্রর উপর দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে, স্থানীয় মানুষ, যারা জীবিকার জন্য এই তৃণভূমি ও উন্মুক্ত বাস্তুতন্ত্রের উপর নির্ভরশীল, তাদেরও জীবনজীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
যা বনভূমি পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক উদ্দেশ্যকেই লঙ্ঘন করে। ভারতের প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের পুরো প্রক্রিয়াই যে কতটা অন্তঃসারশূন্য– তা পরিষ্কার করে দিয়েছে সদ্য প্রকাশিত ‘সিএজি’ (CAG) রিপোর্ট। গত ১২ আগস্ট, ভারতের ‘কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল’ (CAG) পার্লামেন্টে তথ্য সম্বলিত এক রিপোর্ট জমা দেয়, যার মূল সারমর্ম হল, ‘গ্রিন ইন্ডিয়া মিশন’-এর যে ‘লক্ষ্যমাত্রা’ স্থির হয়েছিল, ভারত তার ধারেকাছেও পৌঁছতে পারেনি। মিশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল প্রায় ১৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে বাস্তুতন্ত্রের উন্নতিসাধন এবং হারিয়ে যাওয়া বনভূমির পুনরুদ্ধার।
এই রিপোর্ট যেন মানুষের কাছে এক নিদ্রাভঙ্গের ঘণ্টা। আর যদি এখনও সেই ঘুম না ভাঙে?
কিন্তু ‘সিএজি’ গোষ্ঠী সরাসরি ফিল্ড সার্ভে করে দেখেছে– প্রকল্পের ১২ বছর পরেও সেই লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ শতাংশেরও বেশি অধরা। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণের জন্য দেশের সবুজ আচ্ছাদন বাড়িয়ে কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশনের যে-মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, এই মিশন তা-ও ছুঁতে ব্যর্থ। অর্থাৎ, অপরিকল্পিতভাবে যেখানে-সেখানে গাছ লাগিয়েও শেষ পর্যন্ত কোনও উপকার হয়নি। প্রায় ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা জানিয়েছে এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ সংশ্লিষ্ট সহযোগী গোষ্ঠীর ক্রমাগত ভুল তথ্য প্রদান। এছাড়া এই মিশনের মূল লক্ষ্য ছিল মূলত জলবায়ু-সংবেদনশীল ভূখণ্ডেই অতিরিক্ত মনোনিবেশ করা, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে তার পরিবর্তে কম গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকেই বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এই মিশনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল সরকারের বিভিন্ন জনদরদি প্রকোপের সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে কাজ করা। আর সেখানেই এই প্রকল্পটি মুখ থুবড়ে পড়ে। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আধিকারিকরা বুঝতেই পারেননি যে, এই প্রকল্পগুলো কীভাবে মিলেমিশে কাজ করবে। এছাড়া, বিভিন্ন বেনিয়ম তো আছেই।
এই রিপোর্ট যেন মানুষের কাছে এক নিদ্রাভঙ্গের ঘণ্টা। আর যদি এখনও সেই ঘুম না ভাঙে, তাহলে বনভূমির পুনর্জীবন, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা, বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ থেকে অরণ্যনির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকার উন্নতিসাধন– সবই বিশ বাঁও জলে। আর আমরা ঠান্ডা ঘরে বসে থাকা শহুরে মানুষজন যদি ভাবি এর আঁচ আমাদের গায়ে এসে লাগবে না– তাহলে বলতে বাধা নেই, আমাদের জন্য শিয়রে সমন অপেক্ষা করছে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক, আশুতোষ কলেজ
arijit8chatterjee@gmail.com
