ম্যাচের ৮১ মিনিট। স্কোরলাইন ২-২। মহামেডান স্পোর্টিংয়ের বিরুদ্ধে ফ্রি-কিক নিতে দাঁড়িয়ে ১৯ বছরের এক তরুণ। নাম বীর অর্জুন যোশি। কলকাতায় ডুরান্ড অভিষেক। এশিয়ার অন্যতম প্রাচীন ক্লাবের রক্ষণকে ভেদ করে তাঁর বাঁক খাওয়া শট জড়িয়ে গেল জালে। অবিশ্বাস্য এই গোলেই ৩-২ গোলে জিতল সমলেশ্বরী স্পোর্টিং। ১৩৫তম ডুরান্ড কাপে (Durand Cup 2026) এমনই নজরকাড়া ১১ জন তরুণ ফুটবলারকে বেছে নেওয়া হয়েছে 'এমার্জিং প্লেয়ার' হিসাবে। প্রত্যেকে ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক পুরস্কার পাচ্ছেন।
তরুণ প্রতিভাদের উৎসাহ দিতে এবার ডুরান্ড ফুটবল টুর্নামেন্ট সোসাইটির তরফে ছ'টি গ্রুপ থেকেই 'এমার্জিং প্লেয়ার' বেছে নেওয়া হয়েছে। গ্রুপ এ, বি, সি, ই এবং এফ থেকে দু'জন করে এবং গ্রুপ ডি থেকে একজনকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকের পুরস্কারমূল্য এক লক্ষ টাকা। ডুরান্ড কাপের মঞ্চে বড় দলের বিরুদ্ধে নিজেদের মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন একঝাঁক তরুণ ফুটবলার। তাঁদের কেউ এসেছেন সার্ভিসেস ফুটবল থেকে, কেউ উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনও ক্লাব থেকে, কেউ আবার অ্যাকাডেমি থেকে।
১৩৫তম ডুরান্ড কাপে নজরকাড়া ১১ জন তরুণ ফুটবলারকে বেছে নেওয়া হয়েছে 'এমার্জিং প্লেয়ার' হিসাবে। প্রত্যেকে ১ লক্ষ টাকা করে আর্থিক পুরস্কার পাচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে ১৯ বছর বয়সি বীর অর্জুন যোশির গোল নিয়ে। অমন দৃষ্টিনন্দন গোল ভারতীয় ফুটবল মহলে প্রশংসিত হয়েছে। স্পেন ও ইংল্যান্ডের অ্যাকাডেমিতে ফুটবল শেখা অর্জুন বলেন, "সমলেশ্বরী স্পোর্টিং আমাকে খেলার সুযোগ দিয়েছে। তার জন্য কৃতজ্ঞ। আপনি কোথা থেকে এসেছেন বা কোন ভাষায় কথা বলেন, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফুটবলই আমাদের ভাষা।" তাঁর কাছে বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা খেলোয়াড়দের এক সূত্রে বাঁধার মাধ্যম হল ফুটবল।
ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সের দুই তরুণও নজর কেড়েছেন। ডিফেন্ডার্স এফসির বিরুদ্ধে করা নওরেম সোমানন্দ সিংয়ের গোল এই টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা। সোমানন্দ বলেছেন, "ডিফেন্ডার্স এফসির বিরুদ্ধে করা গোলটাই এখনও পর্যন্ত আমার কেরিয়ারের সবচেয়ে বড় মুহূর্ত। বড় দলের বিরুদ্ধে খেলে আমরা অনেক কিছু শিখছি। ওরা কতটা পেশাদার, সেটা কাছ থেকে বোঝা যায়। তরুণ ফুটবলারদের জন্য ডুরান্ড কাপ অবিশ্বাস্য একটা মঞ্চ। এখানে নিজেদের মেলে ধরা যায়। ভালো খেললে সকলের নজরে আসা যায়। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্নের দিকে এগোনো যায়।" তাঁর সতীর্থ স্যামুয়েল কে ভানলালপেকারও এসসি দিল্লির বিরুদ্ধে গোল করে নজর কেড়েছেন। তাঁর কাছে বড় দলের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচই টুর্নামেন্টের সেরা স্মৃতি। ভানলালপেকারের কথায়, "বড় খেলোয়াড়, বড় দল এবং ভালো বিদেশি ফুটবলারদের বিরুদ্ধে খেলে অনেক কিছু শেখা যায়। এই অভিজ্ঞতা আমাকে শারীরিক ও মানসিক ভাবে আরও শক্ত হতে সাহায্য করবে।"
সাউথ ইউনাইটেড এফসির মহম্মদ আলতাব হুসেন এবং রিনশিদ ভি-ও নজর কেড়েছেন। মণিপুরের ১৯ বছরের স্ট্রাইকার আলতাব বেঙ্গালুরুর সুপার ডিভিশনে নজর কেড়েছেন। ভারতীয় অনূর্ধ্ব-২০ দলের শিবিরেও ডাক পেয়েছেন। সাউথ ইউনাইটেডে তিন বছর কাটানোর পর ডুরান্ডে বড় দলের বিরুদ্ধে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সম্মানিত হয়ে তাঁর উপলব্ধি, "এই পুরস্কার দেখিয়ে দিল, পরিশ্রম সত্যিই ফল দেয়। আরও কঠোর পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।"
এক লক্ষ টাকার পুরস্কার তাঁদের পরিশ্রমের স্বীকৃতি। এই পুরস্কার ভবিষ্যতে তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে বলেই মনে করছে ফুটবল মহল।
রিনশিদের গল্প একেবারে অন্যরকম। কেরলের মালাপ্পুরমের ২০ বছরের মিডফিল্ডার কোনও সংগঠিত ফুটবল পরিকাঠামোর মধ্যে বড় হননি। স্থানীয় ট্রায়ালে সাউথ ইউনাইটেডের স্কাউটদের নজরে আসেন তিনি। তারপর শুরু নিয়মিত প্রশিক্ষণ। ডুরান্ডে এসে প্রথমবার দেশের শক্তিশালী দলগুলির বিরুদ্ধে খেলার সুযোগ এসে যায় তাঁর সামনে। "বড় দলগুলির বিরুদ্ধে খেলে বুঝেছি, আমিও আরও উচ্চস্তরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি। এখন আমি অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী," বলেছেন রিনশিদ।
এই ১১ জনের তালিকায় রয়েছেন ইন্ডিয়ান আর্মির সাইকোম বোরিশ সিং। আক্রমণভাগে তাঁর গতি নজর কেড়েছে। গ্রুপ ডি-র একমাত্র এমার্জিং প্লেয়ার এফসি রায়েংদাইয়ের মিদুল দোলে। উত্তর-পূর্ব ভারতের ফুটবলের আরও তিনজন নজরে এসেছেন। ল্যাংসনিং এফসির কিরমেনস্কেম মুখিম গ্রুপ পর্বে করেছেন দু'টি গোল। নংখসেহ এসএস অ্যান্ড সিসির দাওয়ানচা কার্লোস চাল্লামের ঝুলিতে দুই গোল ও একটি অ্যাসিস্ট। গ্রুপ এফ-এ বোড়োল্যান্ড এফসির ঋতুরাজ মোহন এবং কার্বি আংলং মর্নিং স্টার এফসির লালপেখলুয়া লালপেখলুয়াও নজর কেড়েছেন। ডুরান্ড কাপের দীর্ঘ ইতিহাসে এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ। বড় দল ও নামী খেলোয়াড়দের পাশাপাশি তরুণরাও এখানে নিজেদের প্রতিভা মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছেন। এক লক্ষ টাকার পুরস্কার তাঁদের পরিশ্রমের স্বীকৃতি। এই পুরস্কার ভবিষ্যতে তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে বলেই মনে করছে ফুটবল মহল।
