জাদুকরের শো শেষ হয়ে গেলে কী পড়ে থাকে? হলভর্তি রংচঙে কাগজ, হাততালির গুঞ্জনের জলছাপ আর বিস্ময়। তা থেকেই যায়। সোমবাসরীয় সন্ধে যখন রাতের দিকে গড়াচ্ছে, তখনই ভেসে এল খবরটা। আর জাতীয় দলের হয়ে খেলবেন না তিনি। আর নীল-সাদা জার্সি পরবেন না লিওনেল মেসি! অমনি এক সাধারণ ফুটবলপ্রেমীর বুকের ভিতরেও যেন অগ্নিশলাকা জ্বেলে দিল কেউ। ক্লাবের হয়ে অবশ্য খেলবেন। কিন্তু দেশের হয়ে নামবেন না আর কখনও। ভাবতে গেলে অপ্রত্যাশিত কিছু কি? আমরা কি জানতাম না এমন কিছুই হয়তো হতে চলেছে? কিন্তু সম্ভাবনা আর ঘটনা- দুইয়ের অভিঘাত এক হতে পারে না। হচ্ছে না তাই।
‘হরিপদ কেরানি’র মতো করে পিএফ-গ্র্যাচুইটির নিশ্চিত জীবন চান না চ্যাম্পিয়নরা। তাঁরা চান এমন এক 'টাস্ক', যেখানে নিজের হাড়-মজ্জা-রক্ত ঝরিয়ে দিতে হবে। আগুনের উপরে হাঁটা কিংবা আকাশ ছোঁয়ার উপমাও দেওয়া যেত। আসলে লিওনেল মেসির অবসর এক সাধারণ ফুটবলপ্রেমীর বুকের ভিতরেও যেন অগ্নিশলাকা জ্বেলে দেয়। নানা কথার ফুলঝুরি জ্বলে ওঠে। স্মৃতিতে ভেসে আসে অসামান্য সব গোল... করা কিংবা করানো! তবে তার সঙ্গেই মনে পড়ে, বিশ্বজয়ী হওয়ার পরে বিশ্বকাপের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকার সেই মুহূর্ত। কিংবা এই তো ক'দিন আগে দেখা বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর কান্নায় ভেঙেচুরে যাওয়া একটা মুখ। মেসি মানে মুহূর্তের কোলাজ। জাদুকরের শো শেষ হওয়ার কথাটা বলা হয়তো ঠিক নয়। শো চলবে। তবে নীল-সাদা জার্সির মাহাত্ম্য ফুরিয়ে গেলে কতটুকু আর পড়ে থাকবে?
ফাইনাল হেরে চোখে জল মেসির
বিশ্বকাপের পরই বাবাকে হারিয়েছেন। হর্হে মেসি ছিলেন আর্জেন্তিনীয় ফুটবল তারকার সর্বক্ষণের সঙ্গী। ছিলেন এজেন্টও। স্পেনের কাছে হেরে বিশ্বজয়ীর তকমা খোয়ানো। তারপর কেবল ব্যক্তিগত নয়, ফুটবল-জীবনের লাইটহাউসকেও হারিয়ে ফেলা! এমন সব হারানো সময়ে জাতীয় দলের জার্সিটা খুলেই ফেললেন এলএমটেন। এবার?
স্মৃতিতে ভেসে আসে অসামান্য সব গোল... করা কিংবা করানো! তবে তার সঙ্গেই মনে পড়ে, বিশ্বজয়ী হওয়ার পরে বিশ্বকাপের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকার সেই মুহূর্ত। কিংবা এই তো ক'দিন আগে দেখা বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের পর কান্নায় ভেঙেচুরে যাওয়া একটা মুখ।
মেসির কি এরপর মাঠে নামতে গেলে মনে পড়বে শুরুর দিনগুলোর কথা? বয়স তখন মাত্র ১৩। আর্জেন্টিনা ছেড়েছেন। ততদিনে সকলেই বুঝতে পেরেছেন ঠিকমতো প্রশিক্ষণ পেলে এই ছেলে অনেক দূর যাবে। কিন্তু এত প্রতিভা সত্ত্বেও তাঁর শারীরিক বৃদ্ধি ততটা হচ্ছিল না। আর তাই নিয়মিত বৃদ্ধির হরমোন ইনজেক্ট করাতে হচ্ছিল শরীরে। এত কষ্টের পরও মেসি সব ভুলে যেতেন মাঠে নেমে। পায়ে বল মানেই যেন এক আশ্চর্য ভ্রমণ। একজন প্রকৃত পারফর্মার এই আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রাখতে চান না কোনওদিনই। মেসিও রাখেননি। কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার চাপ সেই আনন্দের সমান্তরালে বয়ে যেত। অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপে দেশকে কাপ এনে দিয়ে হয়ে ওঠেন জাতীয় তারকা। সেই শুরু। সেই থেকেই প্রত্যাশার পারদ তাঁকে ঘিরে আকাশ ছুঁয়েছে। বিশ্বকাপ জিতিয়েও রেহাই মেলেনি। এবারও শুরু থেকেই যেন তাঁর একার কাঁধে জাতীয় দলের পতাকা।
স্রেফ ক্লাবের হয়ে খেলায় ততদূর চাপ থাকবে না এই বয়সে, এমন রত্নখচিত মুকুট মাথায়। বরং নিজেকে আরও বেশি বালক হিসেবেই দেখতে পাবেন তিনি। একেবারে বাল্যকালের মতো পায়ে বল নিয়ে ছুটে যাওয়ার সেই আনন্দভুবনে এবার ছুটে বেড়ান আপনি, মেসি। ফুটবলের রাজপুত্রের সেই ভালোবাসার ছুট দেখতেও মুখিয়ে থাকব আমরা, যাদের কাছে মেসি মানেই ম্যাজিক, মেসি মানেই মূর্চ্ছনা, মেসি মানেই মায়া।
