ধরিত্রীর হৃদয় এফেঁাড়-ওফোঁড় করে ভূগর্ভে প্রবেশ করছে একখানা বাঁশের ‘পোল’। যার একপাশে অবহেলায় পড়ে এক ‘একাকী’ মণ্ডুক। প্লাস্টিকের ব্যাঙ। খেলনা আদতে। এক সময় কোনও কিশোরের সম্পত্তি ছিল বোধহয়। কে জানে, সে কিশোর আজ ইহজগতে আছে কি না।
‘‘আমরা এ ভাবেই মৃতদেহ খুঁজি,’’ বাঁশের লাঠিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে তা সজোরে মাটির ভিতরে ঢুকিয়ে দেন এক মেক্সিকান মহিলা। যাঁর দেশে আজ ফুটবল বিশ্বকাপের আসর বসেছে। পরিচয়ে যিনি পুত্রহারা! সন্তান-শোকে যিনি সমস্ত জাগতিক শখ-আনন্দ-মোহ ভুলে জ্যান্ত প্রস্তরমূর্তিতে পরিণত হয়েছেন। ছেলেকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে। যদি পাওয়া যায় সন্তানের দেহের কিছু অংশ-বিশেষ। যদি আধপোড়া চুলে হাত বুলিয়ে আদর করা যায় শেষবারের মতো।
বিশ্বকাপের সময় হারিয়ে যাওয়া মানুষদের খোঁজে আত্মীয়রা। ছবি: সংগৃহীত
‘‘আমরা কালে-কালে শিকারি কুকুরের মতো হয়ে গিয়েছি, জানেন। গন্ধ শুঁকে বুঝে যাই, এ মাটির তলায় মানুষের শরীর রয়েছে কি না,’’ অস্ফুটে বলে চলেন সে মহিলা। হাতের লাঠি কিন্তু থেমে থাকে না। তা মাটি ফুঁড়ে হাঁটতে থাকে অতল থেকে অতলান্তে। অত্যাশ্চর্য লাগবে শুনলে। তবে মৃতদেহ সন্ধানের এক অদ্ভুত পন্থা রয়েছে এঁদের। মাটিতে বাঁশের ‘পোল’ ঢুকিয়ে তাঁরা প্রথমে আন্দাজ করে দেখেন, সহজে তা প্রবেশ করছে কি না? মাটি নরম কি না? তার পর তা বার করে এনে তাঁরা ‘পোলের’ গায়ের গন্ধ শুঁকে-শুঁকে দেখেন। মাছের আঁশটে গন্ধ পেলে ছেড়ে দেন।
কিন্তু পশু-পাখির দেহাংশের পচা-গলা গন্ধ পেলে বিচলিত হয়ে পড়েন বড়। অধিকাংশ সময় সে দেহাংশ পশু-পাখির হয় না যে।
হয়, মানুষের!
মেক্সিকোয় এই মহিলাবর্গের একটা স্বতন্ত্র নাম রয়েছে। গুয়েরেরোস বুস্কাদোরেস দে জালিসকো। ইংরেজিতে জালিসকো সার্চ ওয়ারিয়র্স। মৃতদেহ সন্ধানের ‘সার্চ পার্টি’। যে ‘সার্চ পার্টি’ সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য পরিবারের সমষ্টিকে নিয়ে। যঁারা নিজেদের স্বজন হারিয়েছেন এক সময়। কেউ পুত্র। কেউ স্বামী। কেউ কন্যা।
“কখনও কখনও কংক্রিটের বাক্সে লাঠি গিয়ে আঘাত করে। ঠং করে শব্দ হয়। তখন বুঝি, ওটা কার্টেল বক্স। ওতে নিথর শরীর আছে,” সামনে উপস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত কাগজের সাংবাদিককে অক্লেশে বলে দেন তিনি, পুত্রহারা মেক্সিকান জননী।
সাংবাদিকের ঔৎসুক্য জাগে যা শুনে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন আমদানি করে তিনি জিজ্ঞাসা করেন– ‘‘কী করেন তখন? নিথর দেহ পেলে?’’
‘‘কী আর? প্রার্থনা করি আমরা। সমবেত। নিষ্প্রাণ মানুষগুলোর উদ্দেশে বলি যে, তোমাদের আমরা ভুলে যাইনি। কখনও ভুলে যাব না।’’
খুঁজে দেখলাম, মেক্সিকোয় এই মহিলাবর্গের একটা স্বতন্ত্র নাম রয়েছে। গুয়েরেরোস বুস্কাদোরেস দে জালিসকো। ইংরেজিতে জালিসকো সার্চ ওয়ারিয়র্স। মৃতদেহ সন্ধানের ‘সার্চ পার্টি’। যে ‘সার্চ পার্টি’ সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য পরিবারের সমষ্টিকে নিয়ে। যঁারা নিজেদের স্বজন হারিয়েছেন এক সময়। কেউ পুত্র। কেউ স্বামী। কেউ কন্যা।
আর অধিকাংশই স্বজন হারিয়েছেন মেক্সিকোর কুখ্যাত ড্রাগ-যুদ্ধে!
স্টেডিয়ামের বাইরে নিখোঁজদের তালিকা। ছবি: সংগৃহীত
মেক্সিকো সরকারের খতিয়ান অনুযায়ী, ড্রাগ-যুদ্ধের প্রকোপে পড়ে নিরুদ্দেশ-সংখ্যা এক লক্ষ তিরিশ হাজার! যদিও বেসরকারি সংখ্যা অনেক, অনেক বেশি বলে মনে করে সাধারণ জনতা। ‘সার্চ পার্টি’ প্রদত্ত তথ্য অনুপাতে, গত বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে তিনশো ব্যাগ পাওয়া গিয়েছে। যা স্রেফ এবং স্রেফ, মানুষের হাড়গোড়ে ভর্তি! মেক্সিকোর গুয়াদালাজারা জুড়ে যা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। আবর্জনা-স্তূপে। বাড়ির বাগানে। কনস্ট্রাকশন সাইটে। সর্বত্র। স্বজনহারা উপরোক্ত সার্চ পার্টির হিসাব অনুযায়ী, বাইশটা কবর পাওয়া গিয়েছে শুধু এস্তাদিও অ্যাক্রন অঞ্চলে! এস্তাদিও অ্যাক্রন অর্থাৎ, মেক্সিকোর বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) স্টেডিয়াম!
মেক্সিকোর তিনটে স্টেডিয়ামে এবার বিশ্বকাপের ম্যাচ হচ্ছে। এস্তাদিও অ্যাজটেকা। এস্তাদিও বিবিভিএ। এবং এস্তাদিও অ্যাক্রন। শেষের স্টেডিয়াম চারটে বিশ্বকাপ ম্যাচ আয়োজন করেছে। সেখানেই উদ্ধার হয়েছে বাইশখানা মনুষ্য-কবর! এস্তাদিও অ্যাক্রন থেকে আট মাইল উত্তরে আবার পাওয়া গিয়েছে দু’শো সত্তরটা বডি ব্যাগ!
হারিয়ে যাওয়া মানুষের পরিবারবর্গের কাছে বিশ্বকাপ তাই উৎসব নয়, প্রহসন মাত্র! কারও পুত্র উধাও, কারও বা কন্যা। ‘‘আমাদের বলা হয়েছিল, ঘর-দোর সুন্দর করে সাজাতে হবে। সংস্কার করতে হবে। রেনোভেট করতে হবে। শহরে বিশ্বকাপ ফুটবল হবে। আর ফুটবল! শহরটাই তো আর আমাদের থাকল না,’’ হাহাকার করতে থাকেন ভিক্টোরিয়া নামের এক ভদ্রমহিলা। যঁার সন্তান-অন্তর্ধানের এ নিয়ে ছ’বছর হল! ‘‘বিশ্বকাপ যেন আমাদের আরও বেশি করে যন্ত্রণা দিচ্ছে। বল মারলে, বল তো ফিরে আসবে। কিন্তু আমাদের সন্তান ফিরবে কবে, বলতে পারেন?’’
স্টেডিয়ামের বাইরে নিখোঁজদের তালিকা। ছবি: সংগৃহীত
প্রত্যুত্তরে নিরুত্তর থাকা ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না মার্কিন সাংবাদিকের। যাঁর লেখা পড়ে এত কিছু জানা। তা, স্বজনহারাদের যন্ত্রণার প্রতিবাদ কাকে বলে, বিশ্বকাপ উদ্বোধনের দিন রন্ধ্রে-রন্ধ্রে টের পেয়েছিল মেক্সিকো। সে দেশের বিভিন্ন শহরজুড়ে একযোগে, এক সময়ে রাস্তায় নেমে পড়েছিলেন শত-শত মানুষ। বিশ্বফুটবলের মঞ্চকে প্রতিবাদের ‘সমরাস্ত্র’ করে। মার্কিন সাংবাদিকের লেখায়, গার্সিয়া বলে এক মহিলার কথা পাওয়া যায়, যিনি হারিয়ে যাওয়া মেয়ের মুখের আদলে একটা নেকলেস বানিয়েছেন। এবং তিনিও আজ বুস্কাদোরেস সার্চ পার্টির অন্যতম চরিত্র। “আমার মেয়ের বয়স ছিল চব্বিশ। নাম জেসিকা। ২০১৯ সালে সেই যে হারিয়ে গেল, আর ফিরল না। পরে শুনলাম, মেরে মাটিতে পুঁতে দিয়েছে। আমার ছেলেটাও হারিয়ে গেল ২০১১ সালে। চিরতরে। পরে ওকে খুঁজে পেয়েছিলাম, জানেন। আমার হাতে সরকারের পক্ষ থেকে একমুঠো ছাই ধরিয়ে দিয়ে বলা হয়েছিল, এ তোমার সন্তানেরই ছাই। একটা ডেথ সার্টিফিকেট পর্যন্ত পেলাম না ছেলের। আমাদের আবার বিশ্বকাপ?”
এস্তাদিও অ্যাক্রন স্টেডিয়াম চারটে বিশ্বকাপ ম্যাচ আয়োজন করেছে। সেখানেই উদ্ধার হয়েছে বাইশখানা মনুষ্য-কবর! এস্তাদিও অ্যাক্রন থেকে আট মাইল উত্তরে আবার পাওয়া গিয়েছে দু’শো সত্তরটা বডি ব্যাগ!
সশরীর সামনে উপস্থিত না থাকলেও বেশ শুনতে পাচ্ছিলাম, কথাগুলো বলার সময় গার্সিয়ার আর্তনাদ। ভেবে কেমন শিরশির করছিল শরীর। বিশ্বকাপকে আমরা বলি, ফুটবলের দোল। বসন্ত-উৎসব। যে ‘হাউই’-য়ে চেপে চার বছর পর-পর ফুটবলের ‘অরোরা বোরিয়ালিস’ প্রত্যক্ষ করে বাঙালি। কে জানত, চল্লিশে পৌঁছে বিশ্বকাপ নিয়ে এক নব্য সংজ্ঞা অভিধানে জুড়তে হবে।
বিশ্বকাপ শুধুই যে আর আনন্দ-উৎসবের প্রতিশব্দ নয়। কিংবা বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের মহামঞ্চ নয়। বরং বিশ্বকাপ আজ থেকে কখনও কখনও সন্তানের নিথর দেহ অঁাকড়ে থাকা নিঃস্ব এক মা!
