বুধবার বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ হচ্ছে ইংল্যান্ডের (Argentina vs England)। যা নামেই ফুটবল ম্যাচ। আদতে মহাযুদ্ধ। সবাই হয়তো সেই ’৮২-র ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধে’র উপমা টেনে আনবেন। কিন্তু ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের মধ্যে ফুটবল সম্পর্কিত বৈরিতা শুরু তার বহুকাল আগেই। দুই দেশের প্রথম সাক্ষাৎ ৯ মে ১৯৫১ সালে। সেই আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে ২-১ গোলে জয়ী হয় ইংল্যান্ড। সেই শুরু। এরপর দুই দেশের ফুটবলযুদ্ধ প্রত্যেকবারই নতুন মাত্রা পেয়েছে। ’৬৬ বিশ্বকাপ থেকে ’৮৬ বিশ্বকাপের কোনও সংস্করণকে এই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না। এবার কি মেসি আটলান্টার বুকে পারবেন, ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত সেই ৬৪৯ জন আর্জেন্তাইনের হয়ে এই ‘৩৯’ বছর বয়সে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠতে? নিছক ফুটবল ম্যাচ হলেও এই প্রশ্নটা তুলে রাখতে পারছেন না গোটা বিশ্বের আর্জেন্টিনা সমর্থকরা।
সেমির আগে অনুশীলনে মেসি। ছবি সংগৃহীত।
সেই কারণে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড 'যুদ্ধ' নিয়ে কোনও রকম ঝুঁকি নিতে চাইছে না আয়োজকরা। আটলান্টা স্টেডিয়ামে এই ম্যাচকে ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কারণ ফুটবলীয় দ্বৈরথের পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইতিহাস। স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, শহরজুড়ে প্রায় ১,২০০ পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অলিম্পিক পার্ক, ফ্যান ফেস্ট এলাকা এবং স্টেডিয়ামের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি স্টেডিয়ামের ভেতরে দায়িত্বে থাকবেন আরও ৬০০ জন বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী।
অদ্ভুতভাবেই পৃথিবীর যে প্রান্তে, যে মুহূর্তে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড মুখোমুখি হয়, ঘুরে ফিরে আসে সেই যুদ্ধের আবহ। সেই উত্তেজনা আর মাঠের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মাঠের সীমান্ত ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতে। অনেকটা আমাদের ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেটীয় যুদ্ধের মতো। আটলান্টার মার্সিডিজ স্টেডিয়ামে মেসির সামনে ইংল্যান্ড আর শুধুই বিশ্বকাপের প্রতিপক্ষ দল নয়। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সেই প্রতিপক্ষ মার্গারেট থ্যাচারের দল। ফিফা দুই দেশের সমর্থকদের উপস্থিতি ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে চেষ্টা করেছে। সেমিফাইনালিস্ট হিসাবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড, দুই ফুটবল ফেডারেশনই সমানসংখ্যক টিকিট পেয়েছে।
দুই দলের সমর্থকরা। ছবি সংগৃহীত।
কিন্তু তা বলে ফকল্যান্ড আইল্যান্ড যুদ্ধ এবং অতীতের বিতর্কিত ম্যাচের কথা ঘুরেফিরে আসবে না, তা হয় না। দুই দেশের সমর্থকরা একেবারে তেতে রয়েছেন। ইংল্যান্ড-নরওয়ে ম্যাচের পর হাতাহাতিতে জড়িয়েছিলেন ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। অর্থাৎ, লড়াই অনেক আগেই শুরু হয়ে গিয়েছে। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে সেমিফাইনালে না ঘটে, তার জন্য তৎপর প্রশাসন। তবে আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি সেসব গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাঁর কথায়, "এটা স্রেফ একটা ফুটবল ম্যাচ। অন্য কিছুর সঙ্গে এই ম্যাচকে জড়িয়ে ফেলতে চাই না। বিশেষ করে যা বহু বছর আগে ঘটে গিয়েছে। আমাদের ইতিহাসের অন্যতম দুঃখজনক অধ্যায় ওটা। কিন্তু এই মুহূর্তে তো এখন সেটা নিয়ে কিছুই করতে পারব না।" উল্লেখ্য, দুই দলের ব্যালান্স শিটের দিকে নজর রাখলে যে মহাতারকাদের দিকে চোখ পড়বে তার সর্বাগ্রে হ্যারি কেন এবং লিওনেল মেসি। ফুটবলবিশ্বে বিরল হতে চলা সেন্টার ফরোয়ার্ড ‘প্রজাতি’র শেষ গুটিকয়েক সদস্যের মধ্যে হ্যারি কেন অন্যতম। বক্সের মধ্যে যেমন ভংয়কর, তেমনি নেমে এসে সাহায্য করেন রক্ষণেও। পেনাল্টিও মারেন ঠান্ডা মাথায়। এবার ছ’টা গোলের পাশাপাশি একটা অ্যাসিস্টও করেছেন। অন্যদিকে, মেসির বয়স ৩৯। তবুও এবারের বিশ্বকাপে স্বপ্নের ফর্মে রয়েছেন। আর্জেন্টিনার ভালো-মন্দ সবটাই নির্ভর করছে অধিনায়কের পারফরম্যান্সের উপর। ৮ গোল আর একটা অ্যাসিস্ট করে এবারও বিশ্বকাপের সেরা হওয়ার দৌড়ে প্রথম সারিতেই আছেন।
তৈরি হ্যারি কেনও। ছবি সংগৃহীত।
কোটি কোটি সমর্থকদের নজর থাকবে জুড বেলিংহ্যাম এবং জুলিয়ান আলভারেজের দিকেও। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে বেলিংহ্যামের নাম দেখে প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকেই। কিন্তু সবাইকে চুপ করিয়ে ছ’টা গোল করে ফেলেছেন। এর চারটেই নকআউট রাউন্ডে। সঙ্গে একটা অ্যাসিস্ট। আর আলভারেজ? গত বিশ্বকাপে প্রচারের আলোয় এসেছিলেন। এবার প্রথম দিকে পরিচিত ফর্মে দেখা যায়নি। চোটের সমস্যাও ছিল। তবে সেসব কাটিয়ে স্বমহিমায় ফিরছেন আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড। কোয়ার্টার ফাইনালে দুর্দান্ত গোল করেছেন। এই ম্যাচেও নজরে থাকবেন তিনি।
তাছাড়া ক্লাব ফুটবলে দুর্দান্ত একটা মরশুম কাটিয়েছেন ডেকলান রাইস। ফর্ম ধরে রেখেছেন বিশ্বকাপেও। ইংল্যান্ডের মাঝমাঠের হৃৎপিণ্ড তিনি। আক্রমণ আর রক্ষণে ভারসাম্য তৈরি করেন। অসুস্থতার জন্য শেষ ম্যাচে পুরো খেলতে পারেননি। তাঁর ফিটনেস গুরুত্বপূর্ণ ইংল্যান্ডের জন্য। মনে করিয়ে দেওয়া যাক, এমিলিয়ানো মার্টিনেজের কথাও। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকটাই ধার কমেছে তাঁর। বিশ্বকাপে কয়েকটা বাজে গোল খেয়েছেন এবার। তবে এখনও আর্জেন্টিনার স্বপ্নপূরণের অন্যতম ভরসা এই তারকা গোলকিপারই। ম্যাচ পেনাল্টি শুটআউটে গড়ালে তফাত গড়ে দিতে পারেন ‘দিবু’।
