আর্লিং হালান্ড ছকেই কি মেসিকে আটকানোর পরিকল্পনা শুরু করে দিল ইংল্যান্ড?
গত ২১ বছরে ফুটবল মাঠে কোনও মঞ্চেই আর পরস্পরের দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু একথা কীভাবে অস্বীকার করা যাবে, এই ২১ বছরে পরস্পরের মুখোমুখি না হওয়াতে ফুটবলকে কেন্দ্র করে দু’দেশের রেষারেষি তাতে এক বিন্দু কমেনি, বরং বেড়েছে।
এমনিতে বিশ্বকাপের ইতিহাসে বরাবরের জন্য আর্জেন্টিনার উপর জয়ের রোলার চালিয়েছে ইংল্যান্ড। কিন্তু সেই যে ’৮৬। কাঁটার মতো এখনও বিঁধে রয়েছে ব্রিটিশদের। তবে এবার তো আর শুধুই ’৮৬-র হারের প্রতিশোধ নেওয়া নয়। একইসঙ্গে বিশ্বকাপটা এক জার্মানের হাত ধরে ঘরে ফেরাতে চাইছে ইংল্যান্ড। আর বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) এবং ইংল্যান্ডের (England Football Team) মাঝে যে ‘লিওনেল মেসি’ নামক এক অতিমানব বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, এটা অন্তত ইংল্যান্ড কোচ টুখেল পুরো দলটার মাথায় ঢুকিয়ে দিতে পেরেছেন। এমনিতে পিছিয়ে থেকেও নরওয়ের বিরুদ্ধে যেভাবে দল ম্যাচ বার করেছে, তারপর হ্যারি কেনদের শিবিরে একটা বিষয় অন্তত পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে, ইংল্যান্ড এবার মরার আগে মরবে না।
বারবার আশা জাগিয়ে ‘চোকার্স’ বদনাম নিয়ে বিশ্বকাপ থেকে মাথা নিচু করে ফিরতে হয়। কিন্তু এবার এসপার, নাহলে ওসপার। কারণ ইংলিশ ফুটবল কবেই বা দেখেছে, এক বিশ্বকাপে দু’জন ফুটবলার ৬ গোল করে সাফল্যর অন্তিম স্বাদ পাওয়ার জন্য দৌড়চ্ছেন? দলটা আর শুধুই কেন কিংবা বেলিংহ্যামের উপর নির্ভর নয়। কোচ টুখেল পুরো দলটাকে একসূত্রে বেঁধে ফেলেছেন। সঙ্গে নরওয়ের হালান্ডকে বোতলবন্দি। যে হালান্ড ব্রাজিলের বিরুদ্ধে দানবীয় রূপ নিয়ে নেইমারদের বিশ্বকাপ ছাড়া করে দিলেন, সেই হালান্ডই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে একদম শান্তশিষ্ট? অবশ্য হালান্ড যে ইংল্যান্ডের জালে একদমই বল ঢোকাননি, এরকম নয়। দ্বিতীয়ার্ধে যখন ১-১ ফলাফল চলছে। গোল করে ২-১ করে দিয়েছিলেন নরওয়ে স্ট্রাইকার। পরে ‘ভিএআর’-এ দেখা গেল, গোলের আক্রমণ তৈরির সময়ে ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ধাক্কা মেরে বসে আছেন। ফলে গোল বাতিল।
ম্যাচ শেষে হালান্ড এনিয়ে কোনও মন্তব্য না করলেও, হালান্ডের বাবা কিন্তু সোশাল মিডিয়াতে মারাত্মক ক্ষোভ প্রকাশ করে বসে আছেন। শুধুই যে হালান্ডের গোল ‘ভিএআর’ বাতিল করেছে বলে, এরকম নয়। অভিযোগ উঠেছে, ইংল্যান্ডের যে গোল সমতা ফেরে, সেক্ষেত্রেও না কি গোলের আগে মাঠের স্পাইডারক্যামের তারে লেগে দিকভ্রষ্ট হয়েছিল বল। ম্যাচ হেরে এতটাই বিধ্বস্ত ছিলেন যে, ম্যাচ শেষে মিক্সড জোন দিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকরা বারবার কথা বলার অনুরোধ করলেও হালান্ড সামান্য কর্ণপাত করেননি। অথচ ৩৬ মিনিটেই আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপ জোড়ালো শটে যখন ইংল্যান্ডের জাল ছিঁড়ে দিলেন, মনে হচ্ছিল, ইংল্যান্ডের ‘ব্রিং ইট হোম’ স্লোগান এবারও মাঠে মারা গেল। কিন্তু টুখেলের হাতে পড়ে এ অন্য ইংল্যান্ড। প্রথমার্ধেই অতিরিক্ত সময়ে গোল শোধ বেলিংহ্যামের। আর এই গোলটা নিয়েই মাঠের স্পাইডারক্যামের তারে বল লাগা নিয়ে নরওয়ের আপত্তি।
কেনের পাশাপাসি বেলিংহ্যামও ৬ গোল করে দারুণ ফর্মে। আর ঠিক এখানেই আপত্তি ইংল্যান্ড কোচ টুখেলের। কেন-বেলিংহ্যাম অসাধারণ। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হতে গেলে শুধুই এই দুই ফুটবলারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না। দলের বাকিদেরও সমান দায়িত্ব নিতে হবে, জানাচ্ছেন তিনি। সেমিফাইনালে সামনে আর্জেন্টিনা। সাংবাদিকদের সেই সংক্রান্ত প্রশ্ন শেষ করতে না দিয়েই টুখেল বলে উঠলেন, “এখনই লাফালাফি করার কিছু হয়নি। এই পারফরম্যান্স দিয়ে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কিছু হবে না। আরও আরও ভালো খেলতে হবে সেমিফাইনালে।”
এই পর্যন্ত পড়ে আপনি যদি ভাবেন, সেমিফাইনালে উঠে ড্রেসিংরুমে আনন্দের ঝড় বয়ে গিয়েছে, তাহলে ভুল ভাবছেন। কারণ, ম্যাচের খারাপ পারফরম্যান্স নিয়ে কোচ টুখেলের সমালোচনা বেলিংহ্যামের কানেও গিয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের সামনে পরিষ্কার বলে দেন, “কোচ হয়তো জানেন না, গরমের মধ্যে এরকম একটা ম্যাচ বার করা খুব একটা সহজ কাজ নয়। আর সব সময় যে দারুণ ম্যাচ খেলেই জিততে হবে, কে বলেছে? দলের ফুটবলাররা যেভাবে লড়াই করে ম্যাচটা বার করেছে, তাতে কারও সমালোচনার বদলে সবাইকে কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। কারণ, মাঠে কী কষ্ট হচ্ছিল, সেটা একমাত্র ফুটবলাররাই জানে।” আর সামনে যে এবার আর্জেন্টিনা? বেলিংহ্যাম বললেন, “ম্যাচটা আমরা সেমিফাইনাল নয়। ফাইনালের মতো করেই দেখছি।”
আর সবই ঠিক আছে। কিন্তু সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে যেভাবে কোচ টুখেল আর বেলিংহ্যামের মুখে পরস্পরবিরোধী মন্তব্য শোনা যাচ্ছে, বিশ্বকাপের বাকি সময়ে ইংল্যান্ড ড্রেসিংরুমে সবকিছু সহজ ভাবে চললে হয়।
