বিকেলে তাঁকে ঘিরে ইস্টবেঙ্গল তাঁবুতে সমর্থকদের ভালোবাসার অত্যাচার। তাতে অস্কারের সঙ্গে ভালোভাবে দু'দণ্ড কথা বলার সময় আর কোথায়? একবার ফোন বাজল, দু'বার ফোন বাজল। অবশেষে ফোনে পাওয়া গেল আইএসএল চ্যম্পিয়ন কোচ অস্কার ব্রুজোকে।
প্রশ্ন: ঘুমোচ্ছিলেন না কি?
অস্কার: চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমার ফোনে টেক্সট আর কলের বিস্ফোরণ ঘটেছে বলা যায়। শুধু এদেশ নয়। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ থেকেও ফোন এসেই যাচ্ছে। পরে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে ঘুমোতে যাই ভোর সাড়ে তিনটেয়। স্বাভাবিক কারণে এই ঘুম থেকে উঠেই আপনার ফোনটা ধরলাম।
প্রশ্ন: এটাই কি কোচিং জীবনের সবচেয়ে আনন্দদায়ক মুহূর্ত?
অস্কার: বলতে পারেন। কারণ, দেড় বছর আগে যখন ইস্টবেঙ্গলের দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন সমর্থকরা বিশ্বাস করতেই পারতেন না যে, এই ইস্টবেঙ্গল দু’বছরের মধ্যে লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে পারে। কিন্তু আমার কথায় বিশ্বাস করেছিলেন ইমামির বিভাস আগরওয়াল। এই মরশুমের পরিকল্পনা নিয়ে গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আমি আর বিভাস প্রথম মিটিংয়ে বসি। বিভাসকে প্রতিটি পয়েন্ট ব্যাখ্যা করে বোঝাই, আমরা এরকম ভাবে দল তৈরি করে পরিকল্পনামতো এগোলে আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব। গত বছরের ফেব্রুয়ারির সেই মিটিংয়ে বিভাস আমাকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে কথা দেন, ইমামির তরফ থেকে সবরকম ভাবে সাহায্য করা হবে। বিভাস তাঁর কথা রেখেছেন। আমিও আমার কথা খেলাপ করিনি। দল গঠন থেকে কোচিং, পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়েছি। সুপার কাপটা অল্পর জন্য হাতছাড়া হয়ে যেতে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। নাহলে এই বছর সুপার কাপ, আইএসএল দুটোই আমাদের পাওয়ার কথা ছিল।
সৌভিক চক্রবর্তীর সঙ্গে অস্কার। নিজস্ব চিত্র
প্রশ্ন: সুপার কাপ শুরুর আগেই গোয়া বিমান বন্দরে আপনার গোলকিপার কোচ সন্দীপ নন্দীর সঙ্গে যেভাবে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, ফোকাস সরে গিয়েছিল?
অস্কার: প্রশ্নটা করে ভাল করলেন। কারণ, সেই সময় সন্দীপ নন্দী শুধুই একতরফা সংবাদমাধ্যমের কাছে বলে গিয়েছে। আমি আর আমার কোচিং স্টাফ শুধুই কাজ নিয়ে ফোকাস করেছিলাম।
প্রশ্ন: তাহলে এখন বলুন না, ঠিক কী হয়েছিল?
অস্কার: সন্দীপ সেই সময় আমাদের টিমের বেশ কিছু খবর বাইরে লিক করছিল। আমারা বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রমাণ পেয়েছিলাম। হতে পারে ওর উপর কোনও চাপ ছিল। কিন্তু আমি কী করে মেনে নেব, আমার গোলকিপার কোচ টিমের খবর বাইরে সংবাদমাধ্যমকে বলছে? গোয়ার বিমানবন্দরে এই নিয়ে সন্দীপকে আমি চেপে ধরতেই ও বাছা বাছা কিছু ভারতীয় গালিগালাজ করতে থাকে। পুরো দলের সামনে আমাকে অপমান করে। পুরো কোচিং স্টাফ ঘটনাটা জানে। এরপরও সেই সময় আমি বাইরে কোথাও মুখ খুলিনি। কিন্তু পরিস্থিতি নিজের দিকে ঘোরানোর জন্য সংবাদমাধ্যমকে ফোন করে নিজের মতো করে ঘটনার বিবৃতি দিতে থাকে। আমরা ব্যস্ত ছিলাম, শুধুই দল তৈরির কাজে। তবে একদিক থেকে আমাদের ভাল হয়েছিল। যাঁকে ড্রেসিংরুমে আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, সে কীভাবে আমাদের দলে থাকবে? ফলে সন্দীপের দল ছেড়ে চলে যাওয়াটা আমাদের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে যায়। এরপর পুরো দলটা আরও সংঘবদ্ধ হয়ে যায়।
প্রশ্ন: কী বলছেন? এ তো মারাত্মক অভিযোগ?
অস্কার: ইস্টবেঙ্গল ম্যানেজমেন্ট এবং সমর্থকদের বলছি, আপনারা চিহ্নিত করুন, কারা ক্লাবের এবং দলের ভালোর জন্য সমালোচনা করছেন। প্রাক্তন ফুটবলার দলের ভালোর জন্য কিছু বলছেন, এটা ভালো ব্যাপার তো। কিন্তু কারা নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য দলের সমালোচনা করছেন, সেদিকটা খেয়াল রাখুন। ঠিক সুপার কাপ শুরুর মুখে যা পেরেছে বলেছে। এবার চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচের আগেও দেখুন, ক্রমাগত আমাদের সমালোচনা করে গিয়েছে। সমর্থক, ক্লাব ম্যানেজমেন্ট যদি এদের চিহ্নিত না করেন,পরের সাফল্য পেতে আরও দেরি হবে।
নিজস্ব চিত্র
প্রশ্ন: কিন্তু আপনিও মুম্বই ম্যাচের আগে যেভাবে ঘোষণা করে দিলেন, পরের মরশুমে আপনি থাকবেন না। এটাতেও ড্রেসিংরুমে প্রভাব ফেলতে পারতো।
অস্কার: বরং উল্টো হয়েছে। এই মরশুমের সাফল্যর জন্য গত মরশুমের ফেব্রুয়ারিতে বিভাসের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলাম। অথচ সামনের মরশুম নিয়ে ম্যানেজমেন্ট আমাকে কিছুই পরিস্কার করে বলতে পারছে না। আমি এই জাহাজটার ক্যাপ্টেন। দলের ফুটবলাররা বারবার করে আমার কাছে তাদের ভবিষ্যত জানতে চাইছে। সেই কারণেই সরাসরি নিজের অবস্থান ঘোষণা করা ছাড়া আমার কোনও উপায় ছিল না। ড্রেসিংরুমে সবাই বুঝে যান, তাঁদের কোচ মিথ্যাচার করে না।
প্রশ্ন: তাহলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর ইস্টবেঙ্গলে আপনার ভবিষ্যত কী?
অস্কার: ইস্টবেঙ্গলকে আমি ভালবেসে ফেলেছি। ফলে ভারতে এবং বাইরের কিছু ক্লাবের প্রস্তাব থাকলেও সবাইকে বলেছি, ৩১ মে’র আগে চূড়ান্ত করব না। জুনের প্রথম সপ্তাহে বিভাসের কাছে জানতে চাইব, ওদের কী পরিকল্পনা। ইমামি যদি পরের মরশুমের পরিকল্পনা নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনায় বসে, থেকে যাব। কিছু আলো দেখাতে না পারলে থাকব না। কিন্তু অস্কার টাকা বাড়ানোর চাপ দিয়ে ইস্টবেঙ্গলে থাকল না, এই অভিযোগ কেউ করতে পারবেন না।
প্রশ্ন: ঠিক কোন ম্যাচের পর বুঝতে পারলেন, ইস্টবেঙ্গল এই মরশুমে চ্যাম্পিয়ন হতে পারে?
অস্কার: বেঙ্গালুরুর সঙ্গে ড্র। মুম্বইয়ের সঙ্গে জয়। এই দুটো ম্যাচ পরেই আমি বিশ্বাস করতে শুরু করি, এই মরশুমে আমরা আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হতে পারি। ফুটবলাররাও পরের মরশুমে কী হবে, তা না ভেবে শুধুই এই মরশুমের আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিয়ে ফোকাস করতে শুরু করে দেয়।
প্রশ্ন: একটা সময় বলেছিলেন, মোহনবাগান দল হিসেবে ভীষণ শক্তিশালী।
অস্কার: এখনও বলছি। এই মরশুমে মাঠের ভিতর ট্যাকটিক্যাল লড়াই আমরা সবার থেকে ভালো ফুটবল খেলেছি। কিন্তু যদি মাঠের বাইরে শুধু কাগজে-কলমে দল গঠন বলেন, তাহলে মোহনবাগান, মুম্বই আমাদের থেকে অনেক এগিয়ে ছিল। মোহনবাগান দলটা তো প্রায় ভারতীয় দল। তার উপর চোটের জন্য মহেশ, ক্রেসপোকে পেলামই না। গতকালই চোট থাকার জন্য আনোয়ারকে বসিয়ে দিতে হয়। তবুও কিন্তু আমরা চ্যাম্পিয়ন। কারণ, আমাদের ড্রেসিংরুমের ইউনিটি।
