হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে প্রতিদিনের খাবারে কী থাকছে, তার গুরুত্ব কম নয়। আর স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকায় ফলের জায়গা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ফলে থাকা ফাইবার, পটাশিয়াম, ভিটামিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদান রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও রক্তনালির স্বাস্থ্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন-ও হার্টের যত্নে খাদ্যাভ্যাসে নানা ধরনের ফল ও সবজি রাখার পরামর্শ দিচ্ছে।
তবে কোনও একটি ফল খেলেই হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমবে, এমনটা নয়। বরং নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে বিভিন্ন ফল খাওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ১১টি ফলের তালিকায় রয়েছে—
১. আম
আম শুধু স্বাদের জন্য নয়, ভিটামিন সি ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টেরও ভালো উৎস। এই উপাদানগুলি শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে আম কোলেস্টেরল ও শরীরের অতিরিক্ত চর্বির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে এনে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমায়। তবে আমে প্রাকৃতিক চিনি তুলনামূলক বেশি থাকায় পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি।
২. আপেল
আপেলে রয়েছে ফাইবার ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। নিয়মিত আপেল খাওয়া কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। আপেলের ফাইবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও সহায়ক। প্রাতঃরাশে বিস্কুট বা প্যাকেটজাত খাবারের বদলে গোটা একটি আপেল বেছে নিতে পারেন।
৩. বেরিজাতীয় ফল
স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, রাস্পবেরির মতো বেরিজাতীয় ফলেও রয়েছে ফাইবার ও অ্যান্ট-অক্সিডেন্ট। এগুলি প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে, রক্তনালিকে সুরক্ষিত রাখতে এবং স্বাস্থ্যকর কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ বজায় রাখতে সাহায্য করে। দই, ওটস বা স্মুদির সঙ্গে বেরি খাওয়া যেতে পারে।
৪. কলা
কলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান হল পটাশিয়াম। শরীরে সোডিয়ামের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে পটাশিয়াম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কলায় ফাইবার ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টও রয়েছে। তবে কিডনির সমস্যা থাকলে বেশি পটাশিয়াম-সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. নাশপাতি
নাশপাতিতে রয়েছে ফাইবার ও বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ। এগুলি রক্তনালির স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। নাশপাতি থেকে পাওয়া কিছু উপাদান শরীরে নাইট্রিক অক্সাইডের কার্যকারিতাকে উন্নত করে, যা রক্তনালিকে শিথিল রাখতে সাহায্য করে। ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও এর ভূমিকা থাকতে পারে।
৬. আঙুর
আঙুরে রয়েছে বিভিন্ন অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও উদ্ভিজ্জ যৌগ, যা রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। কিছু গবেষণায় আঙুরের সঙ্গে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সম্পর্কও পাওয়া গেছে। তবে এ ক্ষেত্রে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
৭. বেদানা
বেদানায় রয়েছে প্রচুর অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও পলিফেনল। এগুলি অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমাতে এবং রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। বেদানার রস ও নির্যাস নিয়ে একাধিক গবেষণা হয়েছে। তবে চিনি মেশানো বেদানার জুসের বদলে গোটা ফল খাওয়াই ভালো।
৮. পেঁপে
পেঁপেতে রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ, ফাইবার, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম। এইগুলি রক্তনালি ও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী । পেঁপেতে থাকা বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা নিতে পারে। ফাইবার থাকায় এটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসেরও অংশ হতে পারে।
৯. আনারস
আনারসে রয়েছে ভিটামিন সি এবং ব্রোমেলাইন নামের একটি প্রাকৃতিক উৎসেচক। ব্রোমেলাইনে প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমানোর সম্ভাব্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। খাদ্যতালিকায় আনারস থাকলে শরীর পাবে ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ উপাদানের যোগান। কিছু গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, ব্রোমেলাইন রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ করে।
১০. কিউই
ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, পটাশিয়াম ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ কিউই হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। নিয়মিত কিউই খাওয়া রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে।
১১. অ্যাভোকাডো
অ্যাভোকাডোতে রয়েছে আনস্যাচুরেটেড বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও ফোলেট। এইগুলি কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। একটি গবেষণায় সপ্তাহে অন্তত দুটি অ্যাভোকাডো খাওয়ার সঙ্গে করোনারি হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমার সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে।
শুধু ফল নয়, নজর দিন সারাদিনের খাদ্যাভ্যাসে
হার্টকে ভালো রাখতে শুধু তালিকা মেনে ১১টি ফল খেলেই হবে না। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি, দানাশস্য, ডাল, বাদাম এবং স্বাস্থ্যকর ফ্যাট রাখতে হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত নুন, চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোও জরুরি। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ২০২৬ সালের নির্দেশিকাতেও হার্টকে ভালো রাখতে খাদ্যাভ্যাসের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
