বাদামের মুঠো, ফলের স্মুদি বা খেজুর-গুড়ের লাড্ডু। দেখতে-শুনতে সবই স্বাস্থ্যকর। কিন্তু ‘হেলদি’ বা ‘স্বাস্থ্যকর’ তকমা থাকলেই কি ইচ্ছেমতো খাওয়া যায়? উত্তরটা কিন্তু না। পরিমাণের দিকে নজর না রাখলে এই স্বাস্থ্যকর খাবারগুলিই বাড়িয়ে দিতে পারে আপনার দৈনিক ক্যালরির হিসাব।
ওজন কমানো বা সুস্থ থাকার চেষ্টা করছেন? তাই হয়তো বিস্কুটের বদলে গ্রানোলা, চিপসের বদলে বাদাম, মিষ্টির বদলে ফলের স্মুদি বা চিনি দেওয়া মিষ্টির বদলে খেজুর-গুড় দিয়ে তৈরি লাড্ডু বেছে নিচ্ছেন। সিদ্ধান্তটা মোটেই খারাপ নয়। কিন্তু সমস্যা শুরু হতে পারে তখনই, যখন ‘স্বাস্থ্যকর’ ভেবে এই খাবারগুলি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেয়ে ফেলেন।
পুষ্টিবিদদের মতে, খাবারের উপাদান স্বাস্থ্যকর হলেই তার ক্যালরি কম হবে, এমন নয়। বরং কী দিয়ে তৈরি, কতটা খাচ্ছেন এবং কত ঘন ঘন খাচ্ছেন, তিনটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কোনও খাবার থাকলেই তার পরিমাণের হিসাব বাদ দেওয়া যায় না। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার বাদ দেওয়ার দরকার নেই, বরং ‘হেলদি’ শব্দটির আড়ালে লুকিয়ে থাকা অতিরিক্ত ক্যালরি সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
১. গ্রানোলা
ওটস, বাদাম, বীজের মতো উপাদান থাকার কারণে গ্রানোলাকে স্বাস্থ্যকর প্রাতরাশ বলেই ধরা হয়। কিন্তু বাজারের অনেক গ্রানোলায় চিনি, মধু বা বিভিন্ন ধরনের সিরাপ-জাতীয় কিছু মেশানো থাকে। ফলে দেখতে স্বাস্থ্যকর হলেও ক্যালরির পরিমাণ কম নাও হতে পারে। আরও একটি সমস্যা হল পরিমাণ। প্যাকেটের গায়ে যে পরিমাণকে এক সার্ভিং বলা হয়, আমরা অনেক সময় তার চেয়ে অনেক বেশি গ্রানোলা বাটিতে নিয়ে ফেলি।
তাই শুধু প্যাকেটের সামনে ‘হেলদি’, ‘ন্যাচারাল’ বা ‘নো জাঙ্ক’ ধরনের দাবি দেখেই সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। উপকরণের তালিকা এবং পুষ্টিগুণের তথ্য দেখে নেওয়া জরুরি। তাতেই বোঝা যাবে শরীরে কতটা পরিমাণ শর্করা ও ক্যালরি প্রবেশ করতে পারে।
২. বাদাম ও পিনাট বাটার
বাদাম স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, প্রোটিন ও ফাইবারের ভালো উৎস। তাই স্বাস্থ্যকর খাবারের তালিকায় বাদাম বা পিনাট বাটারের জায়গা থাকবেই। কিন্তু সমস্যা হল, বাদাম ও পিনাট বাটার দুটোই যথেষ্ট ক্যালরি-সমৃদ্ধ। অল্প পরিমাণেই অনেক ক্যালরি পাওয়া যায়। ফলে ‘একটু একটু করে’ খেতে খেতে কখন বেশি খেয়ে ফেলছেন, তা টেরও পাওয়া যায় না।
বিশেষ করে বড় একটা প্যাকেট থেকে বাদাম বা বয়াম থেকে বারবার চামচে করে পিনাট বাটার খাওয়ার অভ্যাসে পরিমাণের হিসাব রাখা কঠিন। বাদাম বাদ দেওয়ার দরকার নেই। পরিমাণ নিয়ন্ত্রণটা জরুরি।
৩. স্মুদি
ফল খাওয়ার সহজ ও সুস্বাদু উপায় হিসেবে স্মুদির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কিন্তু ফল থাকলেই স্মুদি কম ক্যালরির হবে, এমনটা ভাবা ভুল। স্মুদিতে ফলের সঙ্গে দুধ, দই, খেজুর, মধু, পিনাট বাটার একসঙ্গে যোগ করলে ক্যালরির পরিমাণ অনেকটাই বেড়ে যায়। প্রতিটি উপাদান আলাদাভাবে স্বাস্থ্যকর হলেও সবকটি একসঙ্গে প্রয়োজন নাও হতে পারে।
পুষ্টিবিদের পরামর্শ, একটি স্মুদিতে একসঙ্গে তিন-চার রকম ফল, খেজুর, মধু ও পিনাট বাটার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। সহজ রাখুন। খাবারের প্রয়োজন অনুযায়ী উপাদান বেছে নিন।
৪. ড্রাই ফ্রুট
কিশমিশ, খেজুর, এপ্রিকটের মতো শুকনো ফলে পুষ্টি রয়েছে। কিন্তু ফল থেকে জলীয় অংশ বাদ দেওয়ার ফলে এগুলির প্রাকৃতিক চিনি বা শর্করা ও ক্যালরি তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। সমস্যা হল, শুকনো ফল দেখতে ছোট। ফলে অল্প খাচ্ছেন মনে হলেও একসঙ্গে বেশ অনেকটা খেয়ে ফেলা সহজ। একটি ছোট বাটির শুকনো ফলেই তাই প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি ক্যালরি শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
তাই ড্রাই ফ্রুট খাবেন না, এমন নয়। শুধু মনে রাখুন, আকারে ছোট হলেও এটি ‘হালকা’ খাবার নয়। পরিমাণ মেপে খাওয়াই ভালো।
৫. ঘরে তৈরি ‘হেলদি’ লাড্ডু
খেজুর, গুড়, ঘি, বাদাম বা কোনও বীজ সহযোগে তৈরি লাড্ডু সাধারণ মিষ্টির তুলনায় অনেকের কাছেই স্বাস্থ্যকর বিকল্প। কিন্তু ঘরে তৈরি বা স্বাস্থ্যকর উপাদান দিয়ে তৈরি হলেই লাড্ডু ক্যালরিমুক্ত হয়ে যায় না।
খেজুর ও গুড়েও শর্করা রয়েছে। এর পাশাপাশি বাদাম, বীজ ও ঘি থেকে যোগ হয় যথেষ্ট ক্যালরি। ফলে রিফাইন্ড শর্করা নেই বলেই এই লাড্ডু যত খুশি খাওয়া যাবে, এমনটা নয়।
‘হেলদি’ মানেই যত খুশি নয়
স্বাস্থ্যকর খাবারকে ভয় পাওয়ার বা খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং এই খাবারগুলিই সুষম খাদ্যতালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। শুধু মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যকর খাবারেও ক্যালরি থাকে। তাই প্যাকেটের গায়ে লেখা ‘হেলদি’ শব্দের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল খাবারের উপাদান, তৈরির পদ্ধতি এবং সবচেয়ে বেশি, খাওয়ার পরিমাণ।
স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া ভালো অভ্যাস। কিন্তু সেই খাবারও যদি অজান্তে বেশি খেয়ে ফেলেন, তাহলে লক্ষ্যটা পূরণ হওয়ার বদলে উলটে দৈনিক ক্যালরির হিসাব বেড়ে যেতে পারে।
