পায়ে ব্যথা হলেই আমরা ভাবি, বেশি হাঁটাহাঁটি হয়েছে, পেশিতে টান ধরেছে বা দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফল। কিন্তু সব পায়ের ব্যথার উৎস যে পা-তেই, তা নয়। অনেক সময় কোমর বা মেরুদণ্ডের সমস্যা থেকেই ব্যথা নেমে আসে কোমর, উরু পেরিয়ে পায়ের পাতায়।
এর অন্যতম কারণ (Leg Pain Cause) হতে পারে সায়াটিকা। কোমরের মেরুদণ্ড থেকে বেরিয়ে হিপ ও পায়ের দিকে নেমে যাওয়া সায়াটিক নার্ভে চাপ বা জ্বালা তৈরি হলে এই সমস্যা দেখা দেয়।
অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞদের কথায়, পায়ের ব্যথাকে অনেক সময় পেশিতে টান বলে মনে করা হয়। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা, ব্যায়াম করা বা বয়স বাড়ার কারণেও ব্যথা হতে পারে। কিন্তু কখনও কখনও সমস্যার উৎস পায়ে নয়, অন্য কোথাও থাকতে পারে।
জানতে হবে ব্যথার কারণ। ছবি: সংগৃহীত
বুঝবেন কীভাবে, ব্যথাটা সায়াটিকার?
সায়াটিকার ব্যথা সাধারণ পেশির ব্যথার মতো নাও হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে কোমর থেকে শুরু হয়ে ব্যথা উরু, পায়ের পাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। মনে হতে পারে, পায়ের ভিতর দিয়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে। কারও ক্ষেত্রে ব্যথা হয় তীব্র, জ্বালাপোড়ার মতো।
শুধু ব্যথাই নয়, সঙ্গে থাকতে পারে পায়ে ঝিনঝিন করা, অসাড়তা বা দুর্বলতা। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে ব্যথা বাড়তে পারে। আবার কাশি, হাঁচি বা বিশেষ কোনও নড়াচড়াতেও ব্যথা তীব্র হয়ে উঠতে পারে। আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, সায়াটিকা থাকলেই যে কোমরে ব্যথা থাকবে, এমন নয়। অনেকের ক্ষেত্রে পায়ের সমস্যাটিই প্রধান হয়ে ওঠে।
পায়ে ব্যথা, অথচ সমস্যা কোমরে কেন?
সায়াটিক নার্ভ শরীরের সবচেয়ে বড় নার্ভগুলির একটি। এটি কোমরের নীচের অংশ থেকে বেরিয়ে নিতম্ব হয়ে পায়ের দিকে নেমেছে। তাই কোমরের কাছে এই নার্ভে চাপ পড়লে তার প্রভাব অনেকটা দূর পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে।
সায়াটিকার অন্যতম সাধারণ কারণ হল কোমরের ডিস্ক ফুলে যাওয়া বা হার্নিয়েটেড ডিস্ক। মেরুদণ্ডের কশেরুকাগুলির মাঝখানে থাকা ডিস্কগুলি চাপ সামলানোর কুশনের মতো কাজ করে। কোনও ডিস্ক ফুলে গেলে বা ছিঁড়ে গেলে পাশের নার্ভে চাপ পড়তে পারে। তখন সেই নার্ভের পথ ধরেই পায়ে ব্যথা বা অন্যান্য অস্বস্তি দেখা দেয়।
এ ছাড়াও বয়সের সঙ্গে মেরুদণ্ডে পরিবর্তন, স্পাইনাল ক্যানাল সরু হয়ে যাওয়া, হাড়ের অতিরিক্ত বৃদ্ধি বা চোটের কারণেও নার্ভে চাপ পড়তে পারে।
তবে পায়ে ব্যথা হলেই সায়াটিকা নয়। পেশি, জয়েন্ট, রক্তনালি বা অন্য কোনও নার্ভের সমস্যাতেও একই রকম উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিজে থেকে রোগ নির্ণয় না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সায়াটিকা নয় তো? ছবি: সংগৃহীত
সায়াটিকা মানেই কি অস্ত্রোপচার?
একেবারেই নয়। সায়াটিকা ধরা পড়লেই অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যার কারণ ও তীব্রতা অনুযায়ী ওষুধ, ফিজিওথেরাপি, প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও দৈনন্দিন কাজকর্মে কিছু পরিবর্তনের মাধ্যমে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
চিকিৎসক প্রয়োজনে পায়ের পেশির শক্তি, রিফ্লেক্স, নড়াচড়া এবং অনুভূতি পরীক্ষা করতে পারেন। পরিস্থিতি বুঝে কিছু ক্ষেত্রে ইমেজিং পরীক্ষারও প্রয়োজন হতে পারে।
কখন আর অপেক্ষা করবেন না?
সব পায়ের ব্যথা নিয়ে দুশ্চিন্তার প্রয়োজন নেই। কিন্তু ব্যথা যদি তীব্র হয়, বারবার ফিরে আসে, কয়েক সপ্তাহেও না কমে বা ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে ব্যথার কারণে হাঁটতে, কাজ করতে, ঘুমাতে বা স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজ করতে সমস্যা হলে বিষয়টি অবহেলা করবেন না। পায়ে দুর্বলতা বা অসাড়তাও দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ভালো থাকতে হলে শরীরচর্চা মাস্ট। ছবি: সংগৃহীত
মেরুদণ্ড ভালো রাখতে কী করবেন?
শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত শরীরচর্চা করা, কোমর ও পেটের পেশি শক্তিশালী রাখা এবং একটানা দীর্ঘক্ষণ বসে না থাকার অভ্যাস মেরুদণ্ডের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করাও ভালো।
তাই পায়ে ব্যথা হলেই শুধু পায়ের দিকে তাকাবেন না। কোমর থেকে শুরু হয়ে যদি ব্যথা পায়ের দিকে নেমে আসে, সঙ্গে থাকে ঝিনঝিন, অসাড়তা বা দুর্বলতা, তাহলে সমস্যার উৎস মেরুদণ্ডেও হতে পারে। সময়মতো কারণটা জানা গেলে উপযুক্ত চিকিৎসার পথও দ্রুত ঠিক করা সম্ভব।
