নখের পাশের চামড়া হঠাৎ লাল হয়ে ফুলে উঠেছে? ছোঁয়া লাগলেই ব্যথা? কখনও আবার নখের কোণে জমেছে পুঁজ? দৈনন্দিন জীবনে খুব পরিচিত এই সমস্যাকেই সাধারণ ভাবে বলা হয় ‘নখকুনি’। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে অনেক সময় বলা হয় প্যারোনাইকিয়া (Paronychia)।
হাত ও পায়ের নখ, দু’জায়গাতেই এই সমস্যা হতে পারে। শুরুতে সামান্য অস্বস্তি মনে হলেও, অবহেলা করলে সংক্রমণ নখের আশপাশের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
নখকুনি আসলে কী?
নখের চারপাশের চামড়া ও নখের ভাঁজে জীবাণুর সংক্রমণ বা প্রদাহ। সাধারণত ব্যাকটেরিয়া দায়ী হলেও কিছু ক্ষেত্রে ছত্রাকের সংক্রমণও এর কারণ হতে পারে। হঠাৎ শুরু হওয়া নখকুনিকে বলা হয় অ্যকিউট প্যারোনাইকিয়া। কয়েক দিন বা সপ্তাহ ধরে ধীরে ধীরে সমস্যা তৈরি হলে তা ক্রনিক প্যারোনাইকিয়া হতে পারে।
কেন হয় নখকুনি?
নখের চারপাশের চামড়া শরীরের ভিতরে জীবাণু ঢোকার বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা তৈরি করে। সেই সুরক্ষায় সামান্য ক্ষত হলেই জীবাণু ঢোকার সুযোগ পায়। নখকুনির সাধারণ কারণগুলির মধ্যে রয়েছে—
- নখ খুব ছোট করে কাটা
- নখের পাশের চামড়া কাটা বা টানা
- দাঁতে নখ কামড়ানোর অভ্যাস
- ম্যানিকিওর বা পেডিকিওর
- বারবার জলে হাত রাখা
- আঘাত বা নখে কোনও সমস্যা
নখের কোণে সংক্রমণের হানা। ছবি: সংগৃহীত
কী কী লক্ষণ দেখা যায়?
নখকুনির লক্ষণ নির্ভর করে সংক্রমণের ধরন ও তীব্রতার উপর। সাধারণত—
- নখের পাশের চামড়া লাল হয়ে যাওয়া
- আক্রান্ত জায়গা ফুলে যাওয়া
- চাপ দিলে বা স্পর্শ করলে ব্যথা
- জায়গাটি গরম মনে হয়
- নখের পাশে পুঁজ জমতে পারে
- নখের রং বা গঠনে বদল আসতে পারে
সংক্রমণ বেশি হলে ব্যথা ও ফোলাভাব দ্রুত বাড়তে পারে। এমনকী জ্বরও আসতে পারে।
নখকুনি হলে বাড়িতে কী করবেন?
সমস্যা যদি একেবারে শুরুতে থাকে এবং পুঁজ না হয়, কিছু সাধারণ যত্নে উপকার মিলতে পারে। আক্রান্ত আঙুল দিনে কয়েক বার হালকা গরম জলে কিছুক্ষণ চুবিয়ে রাখতে পারেন। এরপর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে জায়গাটি ভালো ভাবে মুছে নিন। হাত বা পায়ের আক্রান্ত অংশ যতটা সম্ভব পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
পায়ের নখে সমস্যা হলে এমন জুতো পরুন যাতে আঙুলে চাপ না পড়ে। হাতের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব জল বা ডিটারজেন্টের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন এবং প্রয়োজন হলে সুরক্ষার জন্য গ্লাভস ব্যবহার করুন। ব্যথা বেশি হলে নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক বা কোনও মলম ব্যবহার না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
গরম জলে কিছুক্ষণ চুবিয়ে রাখুন। ছবি: সংগৃহীত
কোন কাজগুলি একেবারেই করবেন না?
নখকুনি হলে সবচেয়ে বড় ভুল হল পুঁজ বা ফোলা জায়গা নিজে থেকে ফুটিয়ে দেওয়া। সুঁচ, ব্লেড বা ধারালো কোনও জিনিস দিয়ে পুঁজ বের করার চেষ্টা করলে সংক্রমণ আরও বেশি ছড়িয়ে যেতে পারে। নখের চারপাশে খুব বেশি জীবাণুনাশক বা অন্য কোনও রাসায়নিক লাগানোও ঠিক নয়। এতে ত্বকের আরও ক্ষতি হতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নখকুনির সঙ্গে যদি পুঁজ জমে, ব্যথা বা ফোলাভাব ক্রমশ বাড়ে, লালচে ভাব ছড়িয়ে পড়ে, নখের নীচে সংক্রমণ দেখা দেয় বা জ্বর আসে, তা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পুঁজ জমে গেলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী সেটি বের করে দিতে পারেন। ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হলে কখনও অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হতে পারে। আবার দীর্ঘদিনের বা ছত্রাকজনিত সমস্যায় চিকিৎসার ধরন আলাদা হতে পারে।
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে, নিজে ডাক্তারি নয়। ছবি: সংগৃহীত
কারা বেশি সতর্ক থাকবেন?
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষ এবং যাঁদের হাত-পা দীর্ঘ সময় জল বা রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকে, তাঁদের নখকুনিকে অবহেলা করা উচিত নয়।
কী ভাবে নখকুনি এড়াবেন?
নখ পরিষ্কার রাখুন, তবে নখের চারপাশের কিউটিকল অকারণে কাটবেন না। নখ খুব ছোট করে কাটবেন না। পায়ের নখ সাধারণত সোজা করে কাটা ভালো এবং কোণ গভীর করে কেটে ফেলা এড়ানো উচিত। নখ কামড়ানো বা নখের পাশের চামড়া দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলার অভ্যাস বন্ধ করুন। ম্যানিকিওর বা পেডিকিওর করালে যন্ত্রপাতি পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত কি না নিশ্চিত করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, নখের পাশে সামান্য ক্ষত হলেও সেটিকে অবহেলা না করা। কারণ নখের চারপাশের এই ছোট্ট ক্ষতই কখনও কখনও সংক্রমণের দরজা খুলে দিতে পারে।
