রবি কিষানের ওজন কমানোর গল্প এখন সোশাল মিডিয়ায় চর্চার বিষয়। ৫৭ বছর বয়সে কোনও ওজন কমানোর ওষুধ, এমনকী বহুল আলোচিত 'ওজেম্পিক'-এর সাহায্য ছাড়াই তিনি ১৮ কেজি ওজন ঝরিয়েছেন।
অভিনেতার দাবি, এই পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছে কঠোর শৃঙ্খলা, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এবং দিনে মাত্র একবার খাবার খাওয়ার অভ্যাস। তবে চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা, এই পদ্ধতি সবার জন্য নিরাপদ বা উপযুক্ত নয়।
দ্রুত ওজন কমানোর আশায় অনেকেই এখন ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু এটি কোনও ম্যাজিক ফর্মুলা নয়। চিকিৎসকদের কথায়, সঠিক নিয়মে এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং মেনে চললে ওজন কমতে পারে। তবে না বুঝে বা অন্যকে দেখে এই ডায়েট শুরু করলে লাভের বদলে ক্ষতিও হতে পারে।
রবি কিষান। ছবি: সংগৃহীত
কী এই ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং আসলে খাওয়ার সময়সূচি। এখানে কী খাবেন, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় কখন খাবেন। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেতে হয়, আর বাকি সময় উপোস থাকতে হয়। এই দীর্ঘ বিরতিতে শরীর প্রথমে গ্লাইকোজেন ব্যবহার করে। পরে সেই ভাণ্ডার ফুরিয়ে গেলে শক্তির জন্য জমে থাকা চর্বি ভাঙতে শুরু করে। এ কারণেই ওজন কমতে সাহায্য করে এই পদ্ধতি।
তবে চিকিৎসকদের মতে, উপোস করলেই ওজন কমবে, এমন ধারণা ভুল। খাবারের সময় অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত বা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলেই পুরো উপকার নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
কোন ধরনের ফাস্টিং সবচেয়ে জনপ্রিয়?
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ১৬:৮ পদ্ধতি। এতে ১৬ ঘণ্টা উপোস থেকে ৮ ঘণ্টার মধ্যে দিনের সব খাবার খেতে হয়। আরেকটি জনপ্রিয় পদ্ধতি ৫:২ ডায়েট। এতে সপ্তাহের পাঁচ দিন স্বাভাবিক খাবার খাওয়া যায়, আর বাকি দু'দিন ক্যালরি অনেকটাই কমিয়ে দিতে হয়।
সবচেয়ে কঠোর পদ্ধতি হল ওয়ান মিল আ ডে (ওএমএডি)। নাম থেকেই বোঝা যায়, সারাদিনে মাত্র একবার খাবার খেতে হয়। রবি কিষান এই পদ্ধতিই অনুসরণ করেছেন বলে জানিয়েছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দীর্ঘদিন মেনে চলা খুব কঠিন এবং অধিকাংশ মানুষের জন্য উপযুক্তও নয়।
সবার জন্য উপকারী? ছবি: সংগৃহীত
কীভাবে ওজন কমায়?
উপোসের সময় শরীর জমে থাকা চর্বিকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। পাশাপাশি কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়াতে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজমও কিছুটা উন্নত হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, ওজন কমানোর মূল চাবিকাঠি শরীরে ক্যালরির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ। অর্থাৎ, যত ক্যালরি গ্রহণ করছেন, তার চেয়ে বেশি ক্যালরি খরচ করতে হবে।
দিনে একবার খাওয়া কি নিরাপদ?
চিকিৎসকদের মতে, দিনে মাত্র একবার খাবার খাওয়া সবার জন্য নিরাপদ নয়। এতে পর্যাপ্ত প্রোটিন, ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, খিটখিটে মেজাজ, এমনকী মনোযোগের সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
এই কারণেই অধিকাংশ মানুষের জন্য ১৬:৮-এর মতো তুলনামূলক সহজ ফাস্টিং পদ্ধতি বেশি বাস্তবসম্মত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তারকাদের ডায়েট হুবাহু অনুসরণ করা উচিত?
রবি কিষানের ওজন কমানোর গল্প অনুপ্রেরণাদায়ক হলেও, তা সবার ক্ষেত্রে একই ফল দেবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। কারণ একজন তারকার ডায়েটের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, প্রশিক্ষক ও চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানও থাকেন।
একজন মানুষের বয়স, শারীরিক অবস্থা, হরমোন, বিপাকক্রিয়া, দৈনন্দিন কাজের ধরন এবং অন্যান্য রোগ- সবকিছুই নির্ধারণ করে কোন ডায়েট তাঁর জন্য উপযুক্ত হবে।
সিনেমার দৃশ্যে। ছবি: সংগৃহীত
কারা এই ধরনের ফাস্টিং এড়িয়ে চলবেন?
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা, প্রবীণ মানুষ, যাঁদের ইটিং ডিসঅর্ডার রয়েছে এবং দীর্ঘদিনের অসুখে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এইধরনের ফাস্টিং শুরু করা উচিত নয়।
সুস্থভাবে ওজন কমানোর আসল উপায়
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ওজন কমানোর একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে, কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে হলে সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধারাবাহিক স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রবি কিষানের ওজন ঝরানো অনুপ্রেরণা হতে পারে, কিন্তু তাঁর ডায়েট নকল করার আগে নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
