দীর্ঘদিন থেকে নেপালের নিম্নমানের চা আমদানি করে দার্জিলিং চায়ের ব্র্যান্ডে চালানোর অভিযোগে সরব ছিলেন উত্তরের চা বণিকসভাগুলো। তাদের দাবি মেনে ভারতীয় চা পর্ষদ বাধ্যতামূলক গুণমান পরীক্ষার নিয়ম চালু করেছে। আর তাতেই আটকে গেল নেপালের ৩ লাখ কেজিরও বেশি তৈরি অর্থোডক্স চা। সেই ধাক্কায় বেসামাল নেপালের ৫৩টি চা কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়েছে।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, "অবশেষে চা পর্ষদ নড়েচড়ে বসায় ভারতের চা উৎপাদনকারীরা দেশীয় বাজারে চায়ের দাম পাবেন। কাচা পাতার দামও ঠিক থাকবে।"
চা বণিকসভাগুলো সূত্রে জানা গিয়েছে, ১ মে থেকে ভারতের চা পর্ষদ বিদেশ থেকে আমদানি করা চায়ের 'স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর' (এসওপি) অর্থাৎ গুণগত মান পরীক্ষার নিয়ম কার্যকর করেছে। ওই কারণে নেপাল থেকে ভারতে প্রবেশ করা প্রতিটি ট্রাকের চায়ের নমুনা আলাদাভাবে বাধ্যতামূলক ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সেটা করতে গিয়ে ৩ লাখ কেজিরও বেশি নেপালি চা আটকে পড়েছে। পরীক্ষার রিপোর্ট পেতে দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় লাগতে পারে। ওই সময় নেপাল থেকে পাঠানো চা বিক্রি করা সম্ভব নয়। যদি নমুনা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না-হয় তবে সেই চা হয় নষ্ট করতে হয় অথবা ফেরত পাঠাতে হয়।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টে জমা দেওয়া চা পর্ষদের একটি হলফনামায় বলা হয়েছে ২০২৫ সালে নেপালের চায়ের ৪৩টি নমুনার মধ্যে ২২টি ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার পরীক্ষায় ফেল করেছে। চা বণিকসভাগুলো সূত্রে জানা গিয়েছে, নেপাল সরকার ভারতীয় চা রফতানির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ হারে শুল্ক লাগু করেছে। অথচ নেপাল থেকে ভারতে শুল্ক ছাড়াই বছরে ১১ মিলিয়ন কেজি সিটিসি এবং ৫ মিলিয়ন কেজি অর্থডক্স চা ভারতে ঢুকছে। নেপালের সস্তা এবং গুণমানে খারাপ চা শিলিগুড়ির বাজারে ঢোকার পর এক শ্রেণির ব্যবসায়ী দার্জিলিং চা হিসেবেও বিক্রি করছে। এর ফলে একদিকে যেমন দার্জিলিং চায়ের গৌরব ক্ষুণ্ণ হচ্ছে তেমন অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের ২১০টি বটলিফ কারখানায় উৎপাদিত সিটিসি এবং অর্থডক্স চায়ের বাজারে সংকট ঘনিয়েছে।
কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান স্মল টি গ্রোয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বিজয়গোপাল চক্রবর্তী বলেন, "অবশেষে চা পর্ষদ নড়েচড়ে বসায় ভারতের চা উৎপাদনকারীরা দেশীয় বাজারে চায়ের দাম পাবেন। কাচা পাতার দামও ঠিক থাকবে।" একমত কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান সতীশ মিত্রুকা। ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনাইটেড ফোরাম অব স্মল টি গ্রোয়ার্স'-এর চেয়ারম্যান রজত কার্জি অভিযোগ করেন, বিদেশ থেকে সস্তায় নিম্নমানের চা আমদানি বেড়ে চলায় দেশের চায়ের অভ্যন্তরীণ চায়ের বাজারে খারাপ প্রভাব পড়ছে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ভারতে আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৫.৭১ মিলিয়ন কেজি। ২০২৪ সালে একই সময়ে বিদেশ থেকে চা আমদানির পরিমাণ ছিল ২২.৬৭ মিলিয়ন কেজি।
জানা গিয়েছে, একে নেপালের গুদামে অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে ৭ লাখ কেজির বেশি চা। তার উপর ৩ লাখ কেজিরও বেশি নেপালি চা আটকে পড়ায় ওই দেশের ৫৩টি চা কারখানা ১৫ জুন থেকে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
ওই সমস্যা নিয়ে সংসদে সরব হয়েছিলেন রাজ্যসভার সাংসদ হর্ষবর্ধন শ্রীংলা। তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের প্রথম ছয়মাসে আফ্রিকা মহাদেশ ও নেপাল থেকে নিম্নমানের চা আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। ওই চা ঐতিহ্যবাহী দার্জিলিং চায়ের ব্র্যান্ড নেমে বাজারে চলছে। এর ফলে জিআই ট্যাগ প্রাপ্ত দার্জিলিং চা বিশ্বের দরবারে গৌরব হারাচ্ছে। হর্ষবর্ধন শ্রীংলার দাবি, দার্জিলিং চা নেহাতই পানীয় নয়। আন্তর্জাতিক ঐতিহ্যপূর্ণ এবং ভারতের গৌরব। চায়ের গৌরব রক্ষার অর্থ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করা। কিন্তু সাংসদ এবং চা বণিকসভাগুলোর দাবি মেনে চা পর্ষদ নড়েচড়ে বসতে বিপদ গর্জেছে নেপালের চা শিল্পে।
জানা গিয়েছে, একে নেপালের গুদামে অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে ৭ লাখ কেজির বেশি চা। তার উপর ৩ লাখ কেজিরও বেশি নেপালি চা আটকে পড়ায় ওই দেশের ৫৩টি চা কারখানা ১৫ জুন থেকে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। 'সূর্যোদয় অর্থোডক্স টি প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন অব নেপাল' সূত্রে জানা গিয়েছে, তৈরি চা বিক্রি করতে না পারা, গুদাম পূর্ণ হয়ে যাওয়া এবং চাষিদের কাছ থেকে কেনা কাঁচা চা পাতার দাম পরিশোধের সমস্যার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। জানা গিয়েছে, ভারতে বিধিনিষেধ কার্যকর হওয়ার পরও কারখানাগুলো কয়েক সপ্তাহ উৎপাদন চালিয়ে গিয়েছে। কিন্তু লোকসান বেড়ে যাওয়ায় আর সম্ভব হয়নি।
