পুরভোট মিটতে না মিটতেই রিসর্ট রাজনীতি ফিরল মহারাষ্ট্রে। ঘটনাচক্রে, এবারও নাটকের পরিচালনায় সেই একনাথ শিণ্ডে! 'ঘোড়া কেনাবেচা'র আশঙ্কায় দলীয় কর্পোরেটরদের মুম্বইয়ের একটি পাঁচতারা হোটেলে বন্দি করলেন উপমুখ্যমন্ত্রী। লক্ষ্য, দর কষাকষির রাস্তা খোলা রাখা।
২০১৯ সালের বিধানসভা ভোটের বিধায়ক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে বিস্তর নাটক, ঘটনার ঘনঘটনা দেখেছিলেন মহারাষ্ট্রবাসী। সেই নাটকই অতিনাটকের পর্যায়ে পৌঁছেছিল ২০২২ সালে শিবসেনায় ভাঙনের সময়। উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বের বিরোধিতা করে শিবসেনার অন্তত ৪০ জন বিধায়ককে নিজের দিকে টানতে তাঁদের হোটেলবন্দি করেছিলেন শিণ্ডে। তাতে মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে পালাবদলও ঘটে। কিছু সময়ের জন্য মুখ্যমন্ত্রীও হয়েছিলেন শিণ্ডে। তবে ২০২৪ সালের লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের পর 'ঘোড়া কেনাবেচা'র সেই 'পরম্পরা'য় বিরতি পড়েছে বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু তা যে নিতান্তই সাময়িক ছিল, তা স্পষ্ট হল মুম্বইয়ের ভোটের পর।
বৃহন্মুম্বই পুরসভার ভোটে শিণ্ডেসেনার ফল আশানুরূপ না হলেও, এক রকম ভাবে 'কিংমেকার' হওয়ার জায়গায় রয়েছেন উপমুখ্যমন্ত্রী শিণ্ডে। কারণ, ২২৭ আসনের মুম্বই পুরসভায় কোনও দলই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। শিণ্ডের জোটসঙ্গী বিজেপি জিতেছে ৮৯ আসনে। আর শিণ্ডেসেনা জিতেছে ২৯ আসনে। অর্থাৎ, তাদের 'মহাজুটি' ম্যাজিক সংখ্যা ছাড়িয়ে ১১৮ আসনে জিতেছে। অন্য দিকে, উদ্ধবেসেনা, রাজ ঠাকরের দল এমএনএস এবং শরদ পাওয়ারের এনসিপি একজোট হয়ে লড়েছে। তাদের ঝুলিতে সব মিলিয়ে গিয়েছে ৭২ আসন। কংগ্রেস আলাদা লড়েছে। তারা জিতেছে ২৪ ওয়ার্ডে। আর আসাদুদ্দিন ওয়েইসির মিম, অখিলেশ যাদবের সমাজবাদী পার্টি পেয়েছে যথাক্রমে আট এবং দু'টি আসন। অর্থাৎ, সব বিরোধী এক ছাতার তলায় এলে মোট আসন সংখ্যা হবে ১০৬। অর্থাৎ, ম্যাজিক সংখ্যা থেকে আট কম। এই পরিস্থিতিতে শিণ্ডের আশঙ্কা, তাঁর দলের কর্পোরেটরদের কেনার চেষ্টা করতে পারে বিরোধীরা। তাই তাঁদের হোটেলে সরানো হয়েছে বলে দাবি।
আবার অন্য অভিমতও রয়েছে। মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মত, শুধু 'ঘোড়া কেনাবেচা' আটকাতে নয়, বিজেপির সঙ্গে দর কষাকষিও যাতে ঠিক মতো করা যায়, সেই চেষ্টাই করছেন শিণ্ডে। কারণ, তিনি সমর্থন তুলে নিলে, বিজেপির একার পক্ষে পুরবোর্ড গঠন করা সম্ভব হবে না। এই যুক্তি দেখিয়ে তিনি মেয়র পদের দাবি জানাতে পারবেন। যা যুক্তিসঙ্গত বলেই মনে করছেন শিণ্ডেসেনার একাংশ। তাঁদের যুক্তি, বিধানসভা ভোটের পর মুখ্যমন্ত্রীর পদ বিজেপিকে নির্দ্বিধায় ছেড়ে দিয়েছিলেন শিণ্ডে। তাই মেয়র পদের দাবি তিনি জানাতেই পারেন। এই যুক্তির সূত্র ধরেই কেউ কেউ মনে করছেন, বিজেপিকে নিয়েও শিণ্ডের ভয় রয়েছে। মেয়র পদ নিয়ে দর কষাকষি হতে পারে আশঙ্কা করে পদ্মশিবিরই যে তাঁর দলের কর্পোরেটরদের ভাঙানোর চেষ্টা করতে পারে, তা বিলক্ষণ জানেন শিণ্ডে। কারণ, এই প্রথম বার দেশের বৃহত্তম (জনসংখ্যার নিরিখে) এবং ধনীতম পুরসভায় মেয়র পদে দলের কোনও নেতাকে বসানোর সুযোগ এসেছে বিজেপির সামনে। তা তারা কোনও মতেই হাতছাড়া করতে চাইবে না।
তবে কেউ কেউ বলছেন, দর কষাকষির জায়গায় রয়েছেন বলে শিণ্ডে নিজে মনে করলেও, আদতে তা সত্য নয়। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজেপি ছাড়া শিণ্ডের গতি নেই। তিনি চাইলেও উদ্ধবের সঙ্গে হাত মেলাতে পারবেন না। এর সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। ফলে তাঁকে বিজেপির সঙ্গেই থাকতে হবে। বিজেপিও তা জানে। শিণ্ডে যদি দর কষাকষি করতেও চান, এই যুক্তিকেই কাজে লাগাবে বিজেপি।
