উপরে উঠছে লিফট! লিফটের দরজার বাইরে আটকে যুবকের শরীর। লিফট ও দেওয়ালের মধ্যে মাত্র কয়েক ইঞ্চি ফাঁক। তার মধ্যে প্রায় চেপ্টে যান নাগেরবাজারের অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই অবস্থায় ঘষটে উপরে উঠতে থাকে তাঁর শরীর। আর তাতেই হয় ‘চেস্ট কম্প্রেশন।’ যার ফলে ভেঙে যায় তাঁর বুকের পাঁজরের ২১টি হাড়। ‘পলিট্রমা’র কারণে ফুসফুস, হৃদপিন্ড, প্লীহা, যকৃৎ ফেটে রক্তক্ষরণ হয়। ভেঙে যায়, হাত, পা, ঘাড়। ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকরা লালবাজারের গোয়েন্দাদের এই তথ্য জানানোর পর কীভাবে এই ‘পলিট্রমা’ হল, তা জানার চেষ্টা করেন আধিকারিকরা। গোয়েন্দাদের তদন্তেই উঠে এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। লিফটের সেনসর কাজ না করার মতো একাধিক যান্ত্রিক ত্রুটি সামনে এসেছে। তার উপর এই লিফট বিপর্যয়ের পিছনে ‘হিউম্যান এরর’ ও লিফটে সাময়িক বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকার তত্ত্বও পুলিশ খতিয়ে দেখছে। লিফট কিছুটা ওঠার পর অরূপ আর জি কর হাসপাতালের ট্রমা সেন্টারের বেসমেন্টে স্ত্রীর উপর এসে পড়েন। গোয়েন্দা পুলিশকে অরূপের স্ত্রী সোনালি জানিয়েছেন, তখনও বেঁচে ছিলেন অরূপ। রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করছিলেন তিনি। কিন্তু উদ্ধারকাজ দেরি হওয়ার ফলে কোনও চিকিৎসার সুযোগই পাননি অরূপ।
বেসমেন্টে পৌঁছনোর পর অরূপ তাঁর পা এবং শরীরের অংশ দিয়ে লিফটের দরজা আটকানোর চেষ্টা করেন। আবার অরূপের ঘনিষ্ঠদের কাছ থেকে পুলিশ এ-ও জেনেছে যে, তাঁর জামার অংশ লিফটের দরজার মধ্যে আটকে যায়। এই অবস্থায় একজন লিফটম্যান উপর থেকে লিফট তোলার জন্য বোতাম টেপেন। তাতেই লিফট উঠতে শুরু করে। কিন্তু এখানেই পুলিশের প্রশ্ন, যেখানে স্বয়ংক্রিয় লিফটের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ না হলে লিফট চালুই হয় না, সেখানে কীভাবে দরজায় অরূপের শরীর অথবা জামা আটকে থাকলেও তা চালু হতে শুরু করল? এই ক্ষেত্রে ওই মুহূর্তে লিফটের সেনসর কাজ করেনি বলে নিশ্চিত গোয়েন্দারা। আবার লিফটম্যান ও নিরাপত্তারক্ষীরা উদ্ধারকাজ না করে কেন খারাপ হয়ে যাওয়া লিফট তোলার চেষ্টা করলেন, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
এদিন আর জি করের (RG Kar Case) এই ঘটনায় পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দা জানান, লিফটের যে ত্রুটি ছিল, সেই বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী-ই জানিয়েছেন যে, তাঁরা সুইচ টেপার পর লিফট উপর থেকে বেসমেন্টে চলে যায়। এর পরই ঘটে এই ঘটনা। গোয়েন্দা পুলিশের মতে, এই ঘটনায় ধৃত পাঁচজন নিরাপত্তারক্ষী ও লিফটম্যানকে জেরা করা হলেও কোনও সদুত্তর মেলেনি। এই ঘটনার ব্যাপারে ধৃতদের কোনও অনুশোচনা নেই বলে পুলিশের দাবি। ধৃতরা পুলিশকে জানিয়েছে, রাতের ডিউটিতে তারা কেউ লিফটে থাকে না। বহু বছর ধরে এটাই হয়ে এসেছে। একজন লিফটম্যান গোয়েন্দাদের কাছে স্বীকার করেন, ঘটনার রাতে ডিউটি চলাকালীনই সাততলার উপর লিফটম্যানদের আড্ডার আসর বসেছিল। মোবাইলে গান চালিয়ে ‘মজা’য় ব্যস্ত ছিলেন।
রবিবারই আর জি কর হাসপাতালে গিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ লিফটম্যান, নিরাপত্তারক্ষীদের লগ বুক, রোস্টার খাতা ও রেজিস্টার খাতা বাজেয়াপ্ত করে। ইতিমধ্যেই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা লিফটের সেনসর, সুইচ ও সার্কিট পরীক্ষা করেছেন। ওই লিফটে মাঝেমধ্যেই বিদ্যুৎ সংযোগ চলে যায়। তাই লিফট বন্ধ হয়ে যায়। এই ব্যাপারটি জানা সত্ত্বেও কেন লিফটম্যানরা কর্তৃপক্ষকে জানাননি, তা নিয়ে পুলিশ প্রশ্ন করেছে। লিফট পরীক্ষার পরও বেশ কিছু বিষয় ফরেনসিকের কাছেও ধোঁয়াশা হয়ে রয়েছে। যেখানে এই মাসের প্রথমেই পিডব্লু়ডি-র আওতায় যে সংস্থাটি দেখভাল করে, সেটি লিফট পরীক্ষা করে সবুজ সংকেত দিয়েছে, সেখানে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে কীভাবে এই বিপর্যয় হয়, তা জানতে পিব্লুডিকে লালবাজার চিঠিও দিচ্ছে। সোমবার ফের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা আর জি করে যাচ্ছেন। লিফটের ইঞ্জিনিয়ার তথা বিশেষজ্ঞদের ঘটনাস্থলে থাকতে বলা হচ্ছে। তাঁদের সামনেই লিফটের অবস্থা পরীক্ষা করে দেখে ত্রুটির কারণ বের করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
