স্টাফ রিপোর্টার: ময়নাতদন্তের নামে নিজেদের শিশুসন্তানের মৃতদেহ নিয়েও বাবা-মায়ের সম্পর্কের টানাপোড়েনের অমানবিক মুখ দেখল কলকাতা ও মেমারি!
এক চিকিৎসক দম্পতির সম্পর্কের দড়ি টানাটানির রেশ গিয়ে পড়েছিল আদালত পর্যন্ত। তাতেও শেষ হল না। বাবা-মায়ের এই সম্পর্কের টানাপোড়েনের শিকার হল তাঁদের দু’বছরের ছোট্ট শিশুও। শিশুটির অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর তার নিথর ছোট্ট দেহ নিয়েও টানা ২৪ ঘণ্টা ধরে চলল বাবা-মায়ের তীব্র টানাহেঁচড়া। এর ফলে মৃত্যুর পরেও ২৪ ঘণ্টাতেও সৎকার হল না ওই ছোট্ট শিশুকন্যা অরুন্ধতীর মৃতদেহ। বাবার অভিযোগ পেয়ে ময়নাতদন্তের জন্য মেমারি থেকে শিশুর মৃতদেহ কলকাতায় নিয়ে আসে পুলিশ। এরপরেও চলে ময়নাতদন্তের নামে শিশুর দেহ নিয়ে টানাপোড়েন। শুক্রবার কাঁটাপুকুর মর্গে সারাদিন পড়ে রইল শিশুর দেহ। এরপর বাবার দাবি মেনে এদিন রাতেই দেহ নিয়ে যাওয়া হল মেডিক্যাল কলেজ পুলিশ মর্গে। শনিবার ময়নাতদন্তের কাজ হবে বলে আশা করছে পুলিশ।
দু’বছরের একরত্তি শিশুর ভেন্টিলেটরটি খুলে নেওয়া হবে, নাকি কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র চলবে, তা নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল বাবা-মায়ের মধ্যে। এরই মাঝে বৃহস্পতিবার রাতে লড়াই শেষ হয়ে যায় ছোট্ট শিশুটির। তার জীবনদায়ী পরিষেবার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায় রাত দু’টোয়। কিন্তু মৃত্যুর পরও মেলেনি শান্তি। রাতভর শিশুটির সৎকার নিয়েও বাবা-মায়ের মধ্যে চলল দড়ি টানাটানি। নজিরবিহীন, নির্মম এই ঘটনা পূর্ব বর্ধমানের মেমারির। শিশুটির বাবা পেশায় চিকিৎসক রামচন্দ্র ভদ্রর অভিযোগ, তাঁর চিকিৎসক স্ত্রী দেবযানী গোস্বামী দেহ লোপাট করতে মৃত শিশুকে মেমারিতে বাপের বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। রামচন্দ্রবাবু স্ত্রীর বিরুদ্ধে পাটুলি থানায় সন্তানকে খুনের চেষ্টার অভিযোগও দায়ের করেন। স্বামীর যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে দেবযানী অবশ্য জানিয়েছেন, কলকাতার একটি নার্সিংহোমে তাঁদের শিশুর মৃত্যুর খবর স্বামীকে তিনি এসএমএস মারফত জানিয়েছিলেন। এরপরই তিনি নিজের শিশুসন্তানের দেহ সৎকার করার জন্য মেমারিতে নিয়ে যান।
[ওলার ভিতরেই সন্তান প্রসব গৃহবধূর, তারপর…]
বাবা রামচন্দ্রের অভিযোগ, কাউকে কিছু না জানিয়ে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে সন্তানের সৎকারের চেষ্টা করেছিলেন দেবযানী। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। দেবযানীর পালটা দাবি, গত এক বছর ধরে তিনি নিজেই শিশুটির চিকিৎসার সমস্ত খরচ সামলাচ্ছিলেন। কোনও দায়িত্ব পালন করেননি রামচন্দ্র। উলটে রামচন্দ্র তাঁকে ফোন করে হুমকি দিয়ে বলেন, মেমারি থেকে যেভাবে হোক শিশুটির দেহ তিনি নিজের কাছে নিয়ে আসবেন।
রামচন্দ্রবাবু কলকাতার এনআরএসের রেডিওলজি বিভাগে কর্মরত। বিয়ের দু’বছর পর তাঁদের একটি শিশুকন্যার জন্ম হয়। ততদিনে অবশ্য চিকিৎসক দম্পতির মধ্যে দাম্পত্য অশান্তি অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। শিশুটি জন্মের পরই অসুস্থ হয়ে পড়ে। দুধ খাওয়ার সময় গলায় দুধ আটকে যায় শিশুটির। এই অবস্থায় শিশুটি কার কাছে থাকবে তা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অশান্তি চরমে পৌঁছয়। শেষপর্যন্ত এই বিবাদ হাই কোর্ট অবধি গড়ায়। হাই কোর্টের নির্দেশে ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শিশুকে রাখার দায়িত্ব পান মা দেবযানী। বৃহস্পতিবার শিশুটি কলকাতার এক বেসরকারি নার্সিংহোমে মারা যায়। মা দেবযানী মৃত শিশুকে মেমারিতে নিয়ে গেলে চিকিৎসক রামচন্দ্র ভদ্রর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কলকাতার পাটুলি থানার পুলিশ দেবযানীর বাড়িতে গিয়ে মৃত শিশুটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়। শুক্রবার শিশুটির দেহের ময়নাতদন্ত করার কথা ছিল। কাঁটাপুকুর মর্গে ময়নাতদন্তের কাজ শুরু হতেই রামচন্দ্র দাবি তোলেন, শিশুর প্যাথোলজিক্যাল ময়নাতদন্ত করতে হবে। কাঁটাপুকুর মর্গে এই ময়নাতদন্তের কোনও ব্যবস্থা নেই। ময়নাতদন্তের কাজ এদিন থমকে যায়। ময়নাতদন্তের জন্য দেহ নিয়ে আসা হয় মেডিক্যাল কলেজ পুলিশ মর্গে। বাবা-মায়ের এই আচরণের নিন্দা করেছেন স্টেট কমিশন ফর প্রোটেকশন অফ চাইল্ড রাইটস-এর চেয়ারম্যান অনন্যা চট্টোপাধ্যায় চক্রবর্তী। তাঁর কথায়, বাবা-মায়ের মধ্যে অশান্তির জেরে শিশুটিকে কষ্টভোগ করতে হয়েছে। এটা খুবই দুঃখজনক ঘটনা।
[স্কুলে ছড়াচ্ছে মাদক মেশানো ক্যান্ডি, জারি সতর্কতা]
The post অমানবিক! মৃত শিশুর দেহ নিয়েও মা-বাবা’র টানাহেঁচড়া appeared first on Sangbad Pratidin.
