স্টাফ রিপোর্টার: গোটা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছে বিজেপি সরকার। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। কে কী খাবে, কী পরবে ঠিক করে দিচ্ছে একজনই। সব হচ্ছে ‘ওয়ান নেশন-ওয়ান ইলেকশন’-এর লক্ষ্যে। গণতন্ত্র উল্লঙ্ঘন, বিচারব্যবস্থা, সংবাদমাধ্যম-সহ সবার গলা টিপে ধরে রাজ্যগুলোর অধিকার কেড়ে গোটা সংবিধানকে এজেন্সি নাগপাশে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে এভাবেই সরব হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বললেন, এই ‘হিটলারতন্ত্র’, ‘স্ট্যালিনতন্ত্রের’ অবসান একদিন হবেই। জিএসটিকে স্বার্থপর করপ্রথা বলে বিঁধে ন্যায় সংহিতাকে মুখ্যমন্ত্রী আখ্যা দিয়েছেন ‘অন্যায় সংহিতা’ বলে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম না করেও আপাদমস্তক তাঁর সরকার এবং তাঁর সিদ্ধান্তকে তুলোধনা করার পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী এ-ও বলেন, “রাজীব গান্ধী, মনমোহন সিং, নরসিমা রাও, আই কে গুজরাল, দেবেগৌড়াজির মতো এত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু এত ‘কিউট’, এত ‘সুইট’, এত ভালো প্রধানমন্ত্রী আমি কখনও দেখিনি।”
শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতায় সংবিধান সংক্রান্ত একটি বিতর্কসভায় অংশ নিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। বিতর্কের বিষয় দেখে প্রথমেই উদ্যোক্তাদের ধন্যবাদ জানান। বক্তব্য রাখতে গিয়ে একেবারে শুরু থেকেই খড়্গহস্ত হন মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। তাঁর কথায়, “কেউ বলছেন নতুন দিন আসছে। তাই নতুন সংবিধান দরকার। কিন্তু আমি মনে করি না তার দরকার আছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে চাইছে বলেই এগুলো করছে। তারা সংবিধানের উদ্দেশ্যই বদলে দিতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে পুরোপুরি বুলডোজ করতে চাইছে।” মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “কেউ যদি বলে ধর্মনিরপেক্ষতা খারাপ, ঐক্যের কথা ভাবা যাবে না, গণতন্ত্র ভয়াবহ, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংসাত্মক-তাহলে আমরা তা মানতে পারব না। আমাদের জাতি পিতাদের আমরা অসম্মান করতে পারব না।” বিচারব্যবস্থার একাংশকেও নিশানা করেন। বলেন, “বিচারব্যবস্থার কিছু অংশও রাজনৈতিক চাপের কাছে ভাল সাজতে চাইছে। যদিও বিচারব্যবস্থাকে আমরা সম্মান করি।” সংবিধান বদলে ফেলার চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রী।
[আরও পড়ুন: সন্দেশখালিতে নারী নির্যাতন মানল পুলিশ, ‘শাহজাহানের গ্রেপ্তারির দায়িত্ব ইডির’, বললেন রাজীব কুমার]
তাঁর কথায়, “এখন সংবিধান পরিচালিত হচ্ছে এজেন্সি দিয়ে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। সংবিধান থেকে সমস্ত শব্দ বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে ললিপপ দেখানো হচ্ছে। চেখে দেখুন। আমি নিজের ধারণা আপনাদের উপর চাপিয়ে দেব না। কিন্তু নিজেরাই আপনারা দেখুন। চারিদিকে ৯৫ শতাংশ শুধু শাসকদল। আর ৫ শতাংশ বিরোধী।” সংসদে দেড়শোর কাছে সাংসদকে সাসপেন্ড করে ন্যায় সংহিতার মতো একাধিক বিল পাস করানো হয়েছে বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর। তাঁর কথায়, “তার পর দিনই ফোন আসছে, তোমরা কি এ নিয়ে কমিটিটা তৈরি করলে? লাঠি চালাচ্ছে লাঠি। ডান্ডা চালাচ্ছে। আমি সরকারে আছি বলে বুঝি। ন্যায় সংহিতা বানিয়েছে? ন্যায় সংহিতা না অন্যায় সংহিতা? আমাকে তো পড়তে হবে। দেখতে হবে তো কী আছে তাতে। তা নয়, পরের দিনই ফোন!” জিএসটি কর নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মত, “জিএসটিকে আমরা সমর্থন করেছিলাম, ভেবেছিলাম গোটা দেশকে এটা শক্তিশালী করবে। কিন্তু এটা ‘সেলফিস’ করপ্রথা। রাজ্যের জন্য যা দরকার, তা কেন্দ্র দিচ্ছে না।”
বিজেপি সরকার পুরোপুরি রাজ্যগুলির ক্ষমতা খর্ব করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, “শুধু একটাই দল, একটাই সরকার, একটাই নীতি থাকবে! একজন মানুষ, তার একটাই ভাষা। সব কিছু একটা। দুটো কিছু থাকবে না! দেশে কেউ থাকবেন না একজন ছাড়া। কেউ কিছু বলতে পারছে না। কেন? না, বিজেপি রেগে যাবে।” CAGকে ইডি-সিবিআইয়ের মতো কেন্দ্র ব্যবহার করতে চাইছে বলে অভিযোগ তোলেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন, “ইডি-সিবিআই তো ছিলই। এখন ক্যাগ তাদের ভাই এসেছে। এটা আর সহ্য করা যাচ্ছে না। লড়াই আপনাকে করে যেতেই হবে। নিশ্চয়ই একদিন এই স্বৈরাচার শেষ হবে। এই হিটলারতন্ত্র, স্ট্যালিনতন্ত্র শেষ হবে একদিন। এজেন্সিরাজও শেষ হবে।” যদিও তিনি বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তিগত রোষ নেই। বলেছেন, “ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনও রোষ নেই। আমি তাঁকে সম্মান করি তাঁর চেয়ারের জন্য।” রাতে অন্ডা ল থেকে মুখ্যমন্ত্রী আসেন বোলপুর। রবিবার সিউড়িতে বীরভূম জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে বক্তব্য রাখবেন তিনি।
