২৯ মার্চ রবিবাসরীয় বিকেলে শুটিং চলাকালীনই সলিল সমাধি হয় রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Rahul Arunoday Banerjee)। বিজয়গড় কলোনির 'বাবিন'-এর মৃত্যুতে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত শূন্যতা। তালসারিতে শুটিং করতে গিয়ে অভিনেতার এহেন মর্মান্তিক পরিণতিতে দানা বাঁধছে রহস্য। বাংলা মেগা 'ভোলে বাবা পাড় করে গা'-র শুটিংয়ে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় প্রযোজনা সংস্থার উত্তরে সন্তুষ্ট নয় আর্টিস্ট ফোরাম। শনিবার দুপুরে রাহুলপত্নী অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকারকে (Priyanka Sarkar) নিয়ে রিজেন্ট পার্ক থানায় যান সংগঠনের সদস্যরা। সঙ্গে ছিলেন চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, ভরত কল, লাবণী সরকার, ঋত্বিক চক্রবর্তী, যিশু সেনগুপ্ত, বিদীপ্তা চক্রবর্তী, সৌরভ দাস-সহ আরও অনেকে। সেখান থেকে বেরিয়ে 'জাস্টিস ফর রাহুল' মিছিলের (Justice for Rahul Banerjee) উদ্দেশে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে জমা হন সকলে। 'ভোলে বাবা পার করেগা' মেগার অন্যতম অভিনেতা ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও মিছিলে যোগ দিয়েছেন।
"যে ইউনিট থেকে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গেল তাদেরই কোনও হেলদোল নেই। কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই । আমরা প্রত্যেকে ইউনিটের তরফে কী জানানো হয় সেই অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু, কিছুই হল না। তাই অগত্যা পথে নেমে প্রতিবাদ করতে হচ্ছে।..."
শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় সাংবাদিকদের জানান, আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রযোজনা সংস্থার নীরব ভূমিকায় অসন্তুষ্ট আর্টিস্ট ফোরাম। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, "রাহুলের মৃত্যু ঘিরে ২০ টা ভার্সন শুনতে পাচ্ছি। কোনটা আসল ঘটনা সেই সত্যিটা আগে প্রকাশ্যে আসুক। তারপর বিচার।" রিজেন্ট পার্ক থানা থেকে বেরিয়ে সোজা মিছিলের উদ্দেশে রওনা আর্টিস্ট ফোরামের। সেখানেই সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালের সঙ্গে কথা বললেন ইম্পার সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত।
ক্ষোভ উগরে দিয়ে পিয়া বলেন, "যে ইউনিট থেকে এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে গেল তাদেরই কোনও হেলদোল নেই। কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই । আমরা প্রত্যেকে ইউনিটের তরফে কী জানানো হয় সেই অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু, কিছুই হল না। তাই অগত্যা পথে নেমে প্রতিবাদ করতে হচ্ছে। আমাদের এই মিছিলে কোনও স্লোগান নেই। কারণ এটা কোনও রাজনৈতিক মিছিল নয়, রাহুলের স্ত্রী, সন্তান যাতে সঠিক বিচার পায় সেই উদ্দেশেই আজ আমরা প্রত্যেকে পথে নেমেছি। যাদের উত্তরের অপেক্ষা করছিলাম তারা নিদেনপক্ষে রাহুলের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারত। সেটুকুও করল না। দেখা যাক আমাদের এই মৌন প্রতিবাদে ওদের টনক নড়ে কিনা।"
বিচার পাক রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়, পথে টলিউড। ছবি- অপ্রতীম পাল
"যেটা অবাক লাগছে ৭২ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে, ছেলেখেলা হচ্ছে? রাহুলের মৃত্যু ঘিরে রাজনীতি ঢুকে পড়ছে। কে কার মদতপুষ্ট এসব নিয়ে কথা হচ্ছে। এখন তো এগুলো নিয়ে চর্চার সময় না। আমার পরিষ্কার বক্তব্য, যে মানুষটা চলে গিয়েছে সে তো নিজের পক্ষে কোনও সাফাই দিতে পারছে না। আত্মসমর্পণ করার সুযোগও নেই। আর সেই ফাঁকে ওঁর উপর ঘটনার সম্পূর্ণ দায়ভার চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা...।"
পরিচালক অরিন্দম শীলের বক্তব্য, "ফেসবুক পোস্টে তো আমার যা বক্তব্য সেটা আগেই বলেছি। আমার যেটা অবাক লাগছে ৭২ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে, ছেলেখেলা হচ্ছে? রাহুলের মৃত্যু ঘিরে রাজনীতি ঢুকে পড়ছে। কে কার মদতপুষ্ট এসব নিয়ে কথা হচ্ছে। এখন তো এগুলো নিয়ে চর্চার সময় না। আমার পরিস্কার বক্তব্য, যে মানুষটা চলে গিয়েছে সে তো নিজের পক্ষে কোনও সাফাই দিতে পারছে না। আত্মসমর্পণ করার সুযোগও নেই। আর সেই ফাঁকে ওঁর উপর ঘটনার সম্পূর্ণ দায়ভার চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা আমি দেখছে পাচ্ছি। ধারাবাহিকের প্রযোজনা সংস্থার প্রযোজক, পরিচালক, প্রোডাকশন ম্যানেজার প্রত্যেকের বক্তব্যে অসঙ্গতি। আমার প্রথম প্রশ্ন, শুটিংয়ের অনুমতি ছিল? শহরের বাইরে শুটিং করতে গেলে অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। দীঘা, তালসারির মতো জায়গায় জোয়ার এলে সমুদ্র কতটা ভয়ংকর আকার ধারণ করে সেটা প্রত্যেকে জানে। পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থেকেও শুটিং হয়েছিল? সেটা জানা প্রয়োজন। আমি শুনেছি কেউ কেউ নাকি বলছে দড়ি দিয়ে রাহুলকে তোলার চেষ্টা করা হয়েছিল। যদি সেটা সত্যি হয়েও থাকে তাহলে আমার প্রশ্ন নিরাপত্তার জন্য চারটে টিউব-ও রাখা হয়নি!"
"আমরা যাঁরা অভিনয় করি তাঁদের অনেকসময়ই অনেক কিছু তোয়াক্কা না করে কাজ করতে হয়। তবে জোয়ারের সময় শুটিং করানো মোটেই ঠিক নয়। এবার থেকে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময় এসে গিয়েছে।"
'জাস্টিস ফর রাহুল' মিছিলে টলিউড। ছবি- অপ্রতীম পাল
অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তীর দাবি, "রাহুলের মৃত্যু ঘিরে রহস্য দানা বাঁধছে। অনেকের কথায় অনেক অসঙ্গতি রয়েছে। কিছু তো লুকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। রাহুলের কাঁধে সব দোষ চাপিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হওয়ার একটা নোংরা মানসিকতা দেখছি যেটা অত্যন্ত জঘন্য। ওঁর মৃত্যুর সঠিক তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। রাহুলের সঙ্গে যাঁরা কাজ করেছে প্রত্যেকের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। এমন এক আশ্চর্য তারকা যার আলো বহুদূর ছড়িয়ে পড়ে। বিজয়গড় কোলনি থেকে অনেক অনেক... দূর পর্যন্ত।" নিরাপত্তার খামতিতে সহমত পোষণ করেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী। তাঁর কথায়, "আমরা যাঁরা অভিনয় করি তাঁদের অনেকসময়ই অনেক কিছু তোয়াক্কা না করে কাজ করতে হয়। তবে জোয়ারের সময় শুটিং করানো মোটেই ঠিক নয়। এবার থেকে নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময় এসে গিয়েছে।"
ফেডারেশনের সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাসের সংযোজন, "রাহুলের এই মর্মান্তিক মৃত্যুর নেপথ্যে প্রকৃত সত্য উদঘাটন হোক। অনেকের অনেকরকম বক্তব্য শুনছি। দ্বন্দ্বমূলক সেইসব মতামতের ঊর্ধ্বে সেদিন শুটিং সেটে কী ঘটেছিল সেটা জানাই মূল লক্ষ্য। প্রত্যকের সত্যিটা জানার অধিকার আছে। একইসঙ্গে বলব, ফেডারেশন কিন্তু অনেকদিন আগেই সেফটি প্রটোকল নিয়ে কথা বলেছিল। তখন ফেডারেশনকেই দোষারোপ করে বলা হয়েছিল আমরা কাজে বাধা দিই। সিনেমা, সিরিয়ালের চরিত্রের প্রয়োজনে পাহাড়, সমুদ্র সর্বত্রই শুটিং হওয়া স্বাভাবিক। কিন্ত যদি সেফটি প্রটোকল আমান্য করলেই এই ধরণের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটার সম্ভবনা থেকেই যায়। তালসারিতে শুটিংয়ের সময় নিরাপত্তার জন্য কয়েকটা বোট, কিছু লোকজন রাখলেই এই দুর্ঘটনাটা ঘটত না।"
