shono
Advertisement

Breaking News

Abhishek Banerjee

যেদিন 'দাদা' থেকে 'বস' হলেন অভিষেক, সেদিন থেকেই 'দল' ছিল না তৃণমূল, বলছেন কর্মীরা

‘মমতা মডেল’কে ভুল প্রমাণ করার জন্য অভিষেক যে ‘ডায়মন্ড হারবার’ মডেল তৈরি করতে চেয়েছিলেন নিজের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে গোটা রাজ্যে, সেই হীরকবন্দরে তৃণমূলের জাহাজ বেশিদিন নোঙর ফেলে থাকতে পারল না।
Published By: Subhajit MandalPosted: 04:49 PM May 06, 2026Updated: 08:08 PM May 06, 2026

তাঁর পিসি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে তাঁকে একবারই প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল। সিঙ্গুর আন্দোলনে যখন ধরনা দিচ্ছিলেন মমতা, তাঁর মাথার পিছনে বসেছিলেন অভিষেক (Abhishek Banerjee)। সেটাই তাঁর প্রথম 'পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স'। ২০১১-য় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর তৃণমূলের যুব সংগঠন থাকা সত্ত্বেও অভিষেকের জন্য 'যুবা' নামের সমান্তরাল সংগঠন তৈরির অনুমতি দিয়েছিলেন দলনেত্রী। সেই শুরু। তারপর ২০১৪-য় সোমেন মিত্রর ছেড়ে যাওয়া ডায়মন্ড হারবার থেকে সাংসদ হন। অভিষেক যখন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ পদের জন্য প্রার্থী হন, তখন ডায়মন্ড হারবার তৃণমূলের জন্য 'সেফ সিট'। সেই সেফ সিট থেকে বার তিনেক সাংসদ হয়েছেন তিনি। সেসময়ের সেফ সিটকে তিনি ক্রমে দলের গড় হিসাবে গড়ে তোলেন। শুভেন্দু অধিকারী, সৌমিত্র খাঁ-র পর দলের যুব সভাপতি হন অভিষেক। 'উত্তরাধিকারী'র উপর ক্রমেই ভরসা বাড়ে দলনেত্রীর। ধীরে ধীরে মমতার 'কিচেন ক্যাবিনেট'কে ব্রাত্য করে অভিষেককেরই উত্তরণ শুরু হয়। মুকুল রায়, শোভন চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিম-সহ মুখ্যমন্ত্রীর 'ভরসাস্থলে' ধাক্কা দিয়ে ক্রমেই দলের 'সেনাপতি' হয়ে ওঠেন। আদিরা দলের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকেন। কেউ দল ছাড়েন, কেউ থাকলেও গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন। আবার কেউ কেউ গুরুত্ব পাওয়ার জন্য কালীঘাট ছেড়ে ক্যামাক স্ট্রিটের দিকে পা বাড়ান। একটা সময় দলে অবিসংবাদী দু'নম্বর হয়ে ওঠেন অভিষেক।

Advertisement

সর্বস্তরে 'নিজের লোক' বসাতে শুরু করেন 'নম্বর টু'। প্রথমে সাংগঠনিক, তারপর বিভিন্ন শাখা সংগঠনে অভিষেকপন্থীদের প্রভাব বাড়ে। ২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবিতেও অভিষেক নিজে বিপুল ভোটে জিতে আসেন। নেত্রীর ভরসার জায়গায় নিজেক একমবদ্বিতীয় করে তোলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। ফলস্বরূপ তৃণমূলে আগমন ঘটে ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটির। যাকে তৃণমূল কর্মীরা মুখে আই প্যাক বললেও আড়ালে প্যাক-প্যাকই বলতেন। প্রশান্ত কিশোরের মস্তিস্কপ্রসূত লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকার যেমন সরকারের বিরাট সাফল্য আনল তেমনই বিপুল অর্থ খরচ হলেও সাংগঠনিক স্তরে নবজোয়ার, বিপুল সাড়া ফেলেছিল বলে দলীয় নেতৃত্বের একাংশের মত।

২০১৯-এ লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবিতেও অভিষেক নিজে বিপুল ভোটে জিতে আসেন। নেত্রীর ভরসার জায়গায় নিজেক একমবদ্বিতীয় করে তোলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। ফলস্বরূপ তৃণমূলে আগমন ঘটে ইন্ডিয়ান পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটির। যাকে তৃণমূল কর্মীরা মুখে আই প্যাক বললেও আড়ালে প্যাক-প্যাকই বলতেন। প্রশান্ত কিশোরের মস্তিস্কপ্রসূত লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, দুয়ারে সরকার যেমন সরকারের বিরাট সাফল্য আনল তেমনই বিপুল অর্থ খরচ হলেও সাংগঠনিক স্তরে নবজোয়ার, বিপুল সাড়া ফেলেছিল বলে দলীয় নেতৃত্বের একাংশের মত।

 

সেই সাফল্যের ফল তৃণমূল একুশের ভোটবাক্সে পেয়েছে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তৃতীয় বারের জন্য মসনদে বসেন মমতা। তৃণমূলের একাংশের দাবি, সেইটিই কাল হয়েছে। জেতার পরই মুকুলের ছেড়ে যাওয়া সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদে বসান তৃণমূল সুপ্রিমো। দলের বাইরে গিয়ে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তেও প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ কমে নেতাকর্মীদের। আপ্ত সহায়ক অথবা ব্যক্তিগত সচিবকেই দলের কথা বলতে হয়। ক্রমেই এই ব্যক্তিরাই 'দাদা' হয়ে ওঠেন। কর্মীদের হাত থেকে সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় আইপ্যাকের হাতে। কর্মীদের একাংশের মত, ডেটা দিয়ে কোম্পানি চলে, দল নয়। দল চলে আবেগ দিয়ে। যেদিন থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় 'দাদা' থেকে 'বস' হলেন, সেদিন থেকেই আর দল নয়, প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হল তৃণমূল। নেতা/কর্মী নয়, শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে নীচুতলার সম্পর্ক অনেকটা প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক তৈরি হয়। তৃণমূলের নবজোয়ারে অভিষেক ঢেউ তুলতে চাইলেও, দলে সংস্কারের জোয়ার তেমন দেখা যায়নি। 'মমতাপন্থী'দের পর্দার আড়ালে পাঠিয়ে সেনাপতির সেনাই লাইমলাইটে আসে। বহু জেলায় ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম হয়। এতেই ক্ষুব্ধ হন দলের জন্মলগ্নের কর্মীরা। এই ভরাডুবির তাই অভিষেককেই দলের ভীত ভেঙে দেওয়ার জন্য দায়ী করেছেন অনেকে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধর্মতলার ধরনা মঞ্চে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল ছবি

শুধু দল নয়, দল এবং সরকারের পাশাপাশি তিনি প্যারালাল কাঠামো তৈরি করেন। সরকারের তৈরি করা সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও সেই সমস্ত এলাকায় 'সেবাশ্রয়' নিয়ে গিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার পরিকল্পনা করেন অভিষেক। মানুষ পরিষেবা পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সরকারের এত সুযোগ-সুবিধা থাকা সত্ত্বেও 'ডায়মন্ড মডেল' নিয়ে সমালোচনা ছিল চিরকাল। এতেই সমান্তরাল সরকার চালানোর তত্ত্ব আরও প্রকট হয়। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের পাশাপাশি তৃতীয় প্রধান হিসাবে উত্থান ঘটে ডায়মন্ড হারবার ফুটবল ক্লাবের। 'দিদিকে বলো'র পাশাপাশি 'এক ডাকে অভিষেক' শুরু করেন তৃণমূলের 'যুবরাজ'। অভিষেকের নামে রাতারাতি গজিয়ে ওঠে একাধিক ফ্যান্স ক্লাব। সমর্থকদের মধ্যে 'দিদির অনুগামী'র পাশাপাশি 'দাদার অনুগামী', 'অভিষেকের সেনা'র আমদানি হয়। এতেই অহংকার এবং দম্ভের জন্ম হয়। যেভাবে তাঁর জন্য অতিরিক্ত নিরাপত্তা, রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে তাঁকে ভিভিআইপি ট্রিটমেন্ট, জন্মদিনে তৃণমূল কর্মীদের একটি গোষ্ঠীর সংগঠিত উদ্‌যাপন, তাঁর কনভয়ের শয়ে শয়ে গাড়িতে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া রাজপথ, জেলায় জেলায় তাঁর অনুগামীদের প্রভাব বৃদ্ধি, এসব দলের অনেকেরই না পসন্দ ছিল। পুরনোদের সরিয়ে নতুনদের আনার চেষ্টা করেছিলেন। বিধানসভা ভোটের প্রার্থিতালিকাতেও তার ছাপ ছিল। মোট ৭৪ কেন্দ্রে জয়ী বিধায়কদের বদলে নতুন মুখ আনেন। অবশ্য সংস্কার আরও আগেই শুরু হয়েছিল। অভিষেক নিজে তৃণমূলের বিকল্প হিসাবে 'উন্নততর' তৃণমূলের কথা বলতেন। দল চালানোর পুরনো পন্থা ভুলে তিনি কর্পোরেট ধাঁচের আগমন ঘটান। সাধারণ কর্মী বা স্থানীয় নেতাদের উপর আস্থা না রেখে সরাসরি গ্রাউন্ড রিপোর্টের জন্য পেশাদারি সংস্থা নিয়োগ করেন। অনেক সময় তাঁর দল চালানোর প্রশ্ন নিয়ে অস্ফুটে প্রশ্ন উঠেছে দলের অন্দরে। এমনকী নেত্রীর সঙ্গেও মতবিরোধ হয়েছে।

সেবাশ্রয়ে অভিষেক। ফাইল ছবি।

অভিষেকের উত্থানে মাঠে ময়দানে রাজনীতি করা পুরনো কর্মীরা উপেক্ষিত। দীর্ঘদিন ধরে যারা সংগ্রাম করে আসছেন, স্রেফ আই প্যাকের রিপোর্টের ভিত্তিতে অনেককে ব্রাত্য করে দেওয়া হচ্ছে। এই তালিকাটা দীর্ঘ। সুদূর উত্তরের রবীন্দ্রনাথ ঘোষ থেকে শুরু করে খাস কলকাতার সুব্রত বক্সি পর্যন্ত। দলের সবস্তরই যেন আদি-নব্যতে ভাগ হয়ে যায়। ২০২৬-এ তৃণমূলের ভরাডুবির নেপথ্যে এগুলিকেও অনেকে কারণ হিসাবে ঠাওরেছেন। বস্তুত রাজনীতিতে 'প্যারাস্যুট' নেতা যাঁদের বলা যায়, অভিষেক তার আদর্শ উদাহরণ। 'মমতা মডেল'কে ভুল প্রমাণ করার জন্য অভিষেক যে 'ডায়মন্ড হারবার' মডেল তৈরি করতে চেয়েছিলেন নিজের কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে গোটা রাজ্যে, সেই হীরকবন্দরে তৃণমূলের জাহাজ বেশিদিন নোঙর ফেলে থাকতে পারল না।

অনুগামী জাহাঙ্গির খানের সঙ্গে অভিষেক। ফাইল ছবি।


এখন প্রশ্ন হল, দল ক্ষমতা হারানোর পর অভিষেকের কী হবে? কোন পথে এগোবে তাঁর রাজনীতি? কর্মীদের আসল 'সেনাপতি' হওয়ার সময় কিন্তু এখন। ডিজে বাজাবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যিনি, সুর নরম করে এবার গান্ধীবাদী হয়ে দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন? সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

 

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement