shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

দামোদরের চরে ভাঙছে 'বিশ্বাসে'র সেতু, SIR-এ ‘কাঁচি’ বনাম উন্নয়নের দড়ি টানাটানি আসানসোল দক্ষিণে

এখানে শিল্পাঞ্চলের ধোঁয়া আর দামোদরের বালির মধ্যে লুকিয়ে আছে ২০২৬-এর আসল রায়। তা কোনদিকে যাবে, দেখা যাবে ৪ মে।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 06:12 PM Apr 09, 2026Updated: 06:42 PM Apr 09, 2026

ভোরবেলা বার্নপুরের নেহরু পার্কের ধার ঘেঁষে বয়ে চলা দামোদরের দৃশ্য বড় মনোরম। এ নদের বুক চিরে জেগে থাকা বাঁশের সাঁকোটা আজ শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, একরাশ ক্ষোভ আর বঞ্চনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওপারে বাঁকুড়া, এপারে পশ্চিম বর্ধমান - দুই জেলার হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য ঝুলে থাকে ওই নড়বড়ে বাঁশের উপর। শুধু কি মানুষের ভাগ্য? এই সেতু তো এলাকার রাজনৈতিক লড়াইয়েরও এক বড় হাতিয়ার। ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে (West Bengal Assembly Election) অন্যতম হটস্পট আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটভাগ্যও এখন এই সাঁকোর মতো দোদুল্যমান। একদিকে ‘সেতু নেই তো ভোট নেই’ স্লোগান, অন্যদিকে এসআইআরের পর ভোটার তালিকায় বিপুল সংখ্যক নাম বাদ। এসবের প্রভাব কোন শিবিরকে কতটা চাপে ফেলতে পারে, সেই জল মাপছে ঘাসফুল, পদ্ম - দুই শিবিরই। অর্থাৎ কড়া টক্কর তৃণমূল প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম বিজেপির অগ্নিমিত্রা পলের।

Advertisement

​আসানসোল দক্ষিণের এবারের লড়াই কেবল রাজনীতির নয়, অস্তিত্বের। দামোদর বিহারীনাথ সেতুবন্ধন কমিটির আন্দোলনে এখন কাঁপছে শিল্পাঞ্চল। বিদায়ী বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পল রাজ্যের দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করেছেন, "যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্য সড়কের সেতু রাজ্যের দায়িত্ব, মুখ্যমন্ত্রী কেন বঞ্চনা করেছেন?" পালটা ঘাসফুল শিবিরের দাবি, কেন্দ্রের সদিচ্ছা থাকলে অনেক আগেই টাকা আসত। কাজ হয়ে যেত। এই দড়ি টানাটানির মাঝে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। বর্ষায় যখন সাঁকো তলিয়ে যায়, তখন মাইলের পর মাইল ঘুরে কৃষক বা স্কুল পড়ুয়াদের যাতায়াত করতে হয়।

আসানসোল দক্ষিণের এবারের লড়াই কেবল রাজনীতির নয়, অস্তিত্বের। দামোদর বিহারীনাথ সেতুবন্ধন কমিটির আন্দোলনে এখন কাঁপছে শিল্পাঞ্চল। বিদায়ী বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পল রাজ্যের দিকে আঙুল তুলে প্রশ্ন করেছেন, "যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্য সড়কের সেতু রাজ্যের দায়িত্ব, মুখ্যমন্ত্রী কেন বঞ্চনা করেছেন?" পালটা ঘাসফুল শিবিরের দাবি, কেন্দ্রের সদিচ্ছা থাকলে অনেক আগেই টাকা আসত। কাজ হয়ে যেত। এই দড়ি টানাটানির মাঝে সাধারণ মানুষ দিশেহারা। বর্ষায় যখন সাঁকো তলিয়ে যায়, তখন মাইলের পর মাইল ঘুরে কৃষক বা স্কুল পড়ুয়াদের যাতায়াত করতে হয়। মানুষের প্রশ্ন, "ভোট আসবে, ভোট যাবে। আমাদের স্থায়ী সেতুর স্বপ্ন কি স্বপ্নই থেকে যাবে?"

ছাব্বিশের ভোটযুদ্ধ (West Bengal Assembly Election) এখানে ঠিক কেমন হতে চলেছে, তা বোঝার আগে ​আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্রটি একবার ঘুরে দেখা যাক। এখানকার জনবিন্যাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। শিল্পাঞ্চল হওয়ার সুবাদে এখানে অবাঙালি, মূলত হিন্দিভাষী ভোটারদের সংখ্যা বেশ ভালো এবং তাঁদের বড় প্রভাব রয়েছে। এই কেন্দ্রে তফসিলি জাতির সংখ্যা প্রায় ২০-২২ শতাংশ এবং তফসিলি উপজাতির সংখ্যা ৫-৭ শতাংশের কাছাকাছি। আদিবাসী এবং তফসিলি জাতি ভোটারদের মন পাওয়া বিজেপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ​সংখ্যালঘুদের মধ্যে এই কেন্দ্রে মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশ গত নির্বাচন পর্যন্ত তৃণমূলের দিকেই ঝুঁকেছিল। তবে এবার মহিলা ভোটাররা ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ বনাম ‘নিরাপত্তা’ - দুয়ের মধ্যে কোন ইস্যুকে বেছে নেবেন, সেটাই দেখার।

​এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা SIR। আসানসোল দক্ষিণে এক ধাক্কায় ৪১ হাজার নাম বাদ পড়াটা কেবল প্রশাসনিক বিষয় নয়, রাজনৈতিক বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ​এই কেন্দ্রে শুরুতে ভোটার সংখ্যা ছিল ২,৯১,০৭৮ জন। বর্তমানে তা কমে ২,৪৮,০৯১ জন। ​এসআইআরের চূড়ান্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, বিচারাধীন থাকা মোট ১৬ হাজার ৭২৯ জনের মধ্যে ১০ হাজার ৪৪৪ জনের নামই বাদ পড়েছে।শেষমেশ অবশ্য এই বিশাল সংখ্যক ভোটার বাদ যাওয়া ‘পরিকল্পিত চক্রান্ত’ বলেই সরব হয়েছে রাজ্যের শাসকদল। তবে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের দাবি, এটা ভোটার তালিকার পদ্ধতিগত পরিচ্ছন্নতা। কিন্তু যাঁদের নাম বাদ গেল, তাদের ক্ষোভ ইভিএমে কীভাবে প্রতিফলিত হবে, সেটা বোধহয় অতি বড় জ্যোতিষীর পক্ষেও আগাম আন্দাজ করা দুঃসাধ্য।

২০১৬ সালে সিপিএম প্রার্থী হেমন্ত প্রভাকরকে হারিয়ে তৃণমূলের তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় বিধায়ক হন। কিন্তু পরেরবার অর্থাৎ ২০২১ সালে আর তাঁকে প্রার্থী করেনি শাসক শিবির। যুব তৃণমূলের সভানেত্রী সায়নী ঘোষকে প্রার্থী করা হয়। আসানসোল দক্ষিণের মাটি কামড়ে পড়ে থেকেও তিনি বিজেপির অগ্নিমিত্রা পলের কাছে পরাজিত হন। এরপ অবশ্য ধীরে ধীরে আসানসোলের হাওয়া ঘুরতে থাকে। ২০১৪ সাল থেকে দেশে মোদি হাওয়া ভেসে আসানসোল বিজেপির বাবুল সুপ্রিয়কে দু'বার সাংসদ হিসেবে বেছে নিয়েছিল। পরে উপনির্বাচনে বিজেপিকে হারিয়ে সাংসদ হন তৃণমূলের তারকা প্রার্থী শত্রুঘ্ন সিনহা। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনেও শত্রুঘ্ন সিনহাই জিতে আসেন। এবার ছাব্বিশের যুদ্ধ।

ছাব্বিশে ভোট ময়দানের লড়াই: ঘরের ছেলে বনাম বিদায়ী বিধায়ক

​২০২১ সালে আসানসোল দক্ষিণে বিজেপির তারকা প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ঘাসফুল শিবিরের সৈনিক ছিলেন সায়নী ঘোষ। ‘বহিরাগত’ তকমা আর পদ্ম ঝড়ের মুখে হারতে হয়েছিল তাঁকে। বিধায়ক হন অগ্নিমিত্রা পল। তবে ছাব্বিশে সমীকরণ বদলেছে। তৃণমূল ফিরিয়ে এনেছে পুরনো চাল তথা ‘ঘরের ছেলে’ তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়কে। যিনি আগে এই কেন্দ্রের বিধায়ক, আসানসোল-দুর্গাপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান এবং মেয়রও ছিলেন। ​তৃণমূলের দাবি, তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে এলাকায় প্রভূত উন্নয়ন হয়েছে। সায়নী ছিলেন 'সাময়িক বিচ্যুতি'। 

'ঘরের ছেলে' তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্রে বাজি তৃণমূলের।

বর্তমানে আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা আসনটি বিজেপির দখলে থাকলেও, আসানসোল পুরনিগম তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে। পঞ্চায়েত এলাকাগুলোতেও শাসকদলের দাপট বেশি। কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া এবং সেতুর দাবিতে যে জনবিক্ষোভ দানা বেঁধেছে, তা পুরসভা বা পঞ্চায়েতের পাটিগণিত উলটে দিতে পারে।

আবার ​অগ্নিমিত্রা পল দাবি করছেন, বিধায়ক হিসেবে তিনি কেন্দ্রের দরজায় দরজায় ঘুরেছেন, কিন্তু বিরোধী বিধায়ক হওয়ায় রাজ্য সরকার তাঁকে কাজ করতে দেয়নি। শিল্পাঞ্চলের বেহাল রাস্তা আর বন্ধ কলকারখানার দায় তিনি চাপাচ্ছেন রাজ্যের উপর। স্থানীয়দের অবশ্য দাবি, অগ্নিমিত্রা বিধায়ক হওয়ার পর থেকে আসানসোলকে অনেক সময় দিয়েছেন। নানা আন্দোলনে তাঁকে দেখা গিয়েছে। তবে কাজ বিশেষ করে উঠতে পারেননি। 

বর্তমানে আসানসোল দক্ষিণ বিধানসভা আসনটি বিজেপির দখলে থাকলেও, আসানসোল পুরনিগম তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে। পঞ্চায়েত এলাকাগুলোতেও শাসকদলের দাপট বেশি। কিন্তু ভোটার তালিকায় নাম বাদ যাওয়া এবং সেতুর দাবিতে যে জনবিক্ষোভ দানা বেঁধেছে, তা পুরসভা বা পঞ্চায়েতের পাটিগণিত উলটে দিতে পারে। ​রায়গঞ্জ যেমন একদা কংগ্রেসের দুর্গ হয়েও আজ তৃণমূল-বিজেপির লড়াইয়ের ক্ষেত্র, আসানসোল দক্ষিণও অনেকটা সেই পথেই। বাম ও কংগ্রেসের সমর্থন তলানিতে ঠেকেছে। তাই মূল লড়াই দ্বিমুখী - তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে। তবে সাম্প্রতিককালে আর জি কর কাণ্ড থেকে শুরু করে ভোটার তালিকা নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা - এই ইস্যুগুলো সাধারণ মানুষের মনের উপর গভীর রেখাপাত করেছে।

বিদায়ী বিধায়ক বিজেপির অগ্নিমিত্রা পল কি পারবেন জনসমর্থন নিজের দিকে টেনে রাখতে?

এসবের মাঝে সিপিএম প্রার্থী শিল্পী হালদার অবশ্য অন্য সুরে প্রচার সারছেন। বামফ্রন্টের ইস্তেহারে প্রকাশিত প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে চাইছেন তিনি। শিল্পীর কথায়, ''২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর থেকে রাজ্য রসাতলে চলে গিয়েছে। একদিকে মন্দির-মসজিদ, অন্যদিকে সীমাহীন দুর্নীতি - এই দুয়ের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই। বিকল্প বামপন্থা প্রতিষ্ঠার লড়াই। মানুষ এবার চাইছে, বামফ্রন্ট পুনরায় আসুক। তাহলে রাজ্যে শিক্ষা, কর্মসংস্থানের সুযোগ আসবে।''

আসানসোল দক্ষিণের সিপিএম প্রার্থী শিল্পী হালদার।

​আসানসোল দক্ষিণের অলিগলি এখন উন্নয়নের হিসেব মেলাচ্ছে। একদিকে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ ও তৃণমূলের পুরনো অভিজ্ঞ প্রার্থী তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্যদিকে মোদি ম্যাজিককে এগিয়ে নিয়ে যেতে বিজেপি প্রার্থী অগ্নিমিত্রা পলের আগ্রাসী রাজনীতি। কিন্তু শেষপর্যন্ত দামোদরের পাড়ের মানুষ যদি ‘নো ব্রিজ, নো ভোট’ দাবিতে অনড় থাকেন, তবে যে কোনও বড় শক্তির কপাল পুড়তে পারে! শিল্পাঞ্চলের ধোঁয়া আর দামোদরের বালির মধ্যে লুকিয়ে আছে ২০২৬-এর আসল রায়। সেতুর দাবি পূরণ না হলে, বিশ্বাসের সেতুটাই হয়তো রাজনীতিকদের জন্য সবচেয়ে বেশি নড়বড়ে হয়ে উঠবে।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement