ব্রিটেনে নিলামে উঠতে চলেছে সপ্তদশ শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় 'অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল কম্পিউটার'। আগামী ২৯ এপ্রিল লন্ডনের সোথবি'স নিলামঘরে বিক্রি হবে একদা জয়পুরের মহারানি গ্রায়ত্রী দেবীর সংগ্রহে থাকা এই সামগ্রী। এই যন্ত্র এতটাই অভিনব যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল অঙ্কের নিখুঁত সমাধান করে দিতে পারে নিমেষে। পিতলের এই যন্ত্রের অসাধারণ ক্ষমতার জেরে এটিকে সুপারকম্পিউটার বা প্রাচীন স্মার্টফোন হিসেবে গণ্য করেন বিজ্ঞানীরা। সোথবের ইসলামিক ও ভারতীয় শিল্প বিভাগের প্রধান বেনেডিক্ট কার্টার এই যন্ত্রকে বিরলতম জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই যন্ত্রটি মুঘল ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত নিদর্শন। সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে লাহোরের (বর্তমানে পাকিস্তান) দুই ভাই কাইম মহম্মদ ও মহম্মদ মুকিম এটি তৈরি করেছিলেন। এখানে ফারসি ভাষায় নক্ষত্রদের নামের পাশাপাশি দেবনাগরী লিপিতে তাদের সংস্কৃত প্রতিশব্দও খোদাই করা আছে যন্ত্রটিতে। এতে তুলে ধরা হয়েছে প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির অসাধারণ সমন্বয়। যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছিল লাহোরের তৎকালীন শাসক আগা আফজলের জন্য। ভারতে তখন জাহাঙ্গির ও শাহজানের শাসনকাল।
এই যন্ত্রে ৯৪টি শহরের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের পাশাপাশি ৩৮টি নক্ষত্রের নিখুঁত অবস্থান রয়েছে, যা আজও এতটাই নির্ভুল যে এটি যেকোনও মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের জটিল অঙ্কের নিখুঁত হিসেব রাখা পিতলের এই যন্ত্র পরে জয়পুরের প্রাক্তন মহারাজা দ্বিতীয় সওয়াই মানসিংহের সংগ্রহে আসে। রাজার মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী মহারানি গায়ত্রী দেবী এর মালিকানা পান। পরে ইংরেজদের আমলে ব্যক্তিগত সংগ্রহে চলে আসে যন্ত্রটি। প্রথমবারের মতো, এটি সর্বসাধারণের জন্য প্রদর্শন ও নিলাম করা হচ্ছে।
এই যন্ত্রে ৯৪টি শহরের অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশের পাশাপাশি ৩৮টি নক্ষত্রের নিখুঁত অবস্থান রয়েছে, যা আজও এতটাই নির্ভুল যে এটি যেকোনও মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে।
দাবি করা হয়, প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই যন্ত্রটি সেই সময়ের এক শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ৮.২ কিলোগ্রাম ওজনের এবং প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার উঁচু এই যন্ত্রটি একটি সাধারণ অ্যাস্ট্রোল্যাবের চেয়ে চারগুণ বড়। দুর্লভ তো বটেই পাশাপাশি এর রাজকীয় ঐতিহ্যের কারণে বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন এটি ১.৫ থেকে ২.৫ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ১৫ থেকে ২৫ কোটি টাকা) মূল্যে বিক্রি হতে পারে। অতীতে এতদামে জ্যোতির্বিজ্ঞানের কোনও সামগ্রী কখনও বিক্রি হয়নি।
অক্সফোর্ডের ইতিহাসবিদ ডঃ ফেডেরিকা জিগান্তের মতে, এটি সপ্তদশ শতাব্দীর জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময়, নক্ষত্রের সঠিক অবস্থান, কূপের গভীরতা এবং ভবনের উচ্চতা মাপতে করতে সাহায্য করত। এছাড়াও, এটি মক্কার দিক নির্ণয় করতে এবং পঞ্জিকা ব্যবহার করে নির্ভুল রাশিফল তৈরি করতে ব্যবহৃত হত।
