আসছে শ্রাবণ মাস। আর কদিন পরেই মেতে উঠবেন শিবভক্তরা। বাঁকে জল নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে তাঁরা পৌঁছবেন দেবাদিদেবের দরবারে। এই পুণ্য লগ্নে মহাদেবের কৃপা পেতে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মহিমা অপরিসীম। সনাতন ধর্ম মতে, এই ১২টি পবিত্র স্থানে স্বয়ং শিবলিঙ্গ থেকে জ্যোতিঃপুঞ্জ নির্গত হয়েছিল। তবে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসই নয়, জ্যোতিষশাস্ত্রের সঙ্গেও রয়েছে গভীর যোগ। জ্যোতিষীদের মতে, মহাবিশ্বের ১২টি রাশিচক্রের সঙ্গে এই ১২টি জ্যোতির্লিঙ্গের এক আধ্যাত্মিক সংযোগ রয়েছে। নিজের রাশি মেনে নির্দিষ্ট জ্যোতির্লিঙ্গের স্মরণ বা পূজা করলে গ্রহের ফেরে জেরবার জীবনও শান্ত হয়, কাটে দুর্ভাগ্যের মেঘ।
ফাইল ছবি
মেষ রাশি (রামেশ্বরম, তামিলনাড়ু)
মেষ রাশির জাতকদের জন্য তামিলনাড়ুর রামেশ্বরম জ্যোতির্লিঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরাণ মতে, লঙ্কা জয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্র স্বয়ং এই শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখানে মহাদেবের আরাধনা করলে জাতকের মনের জোর ও সাহসিকতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মেষ রাশির অধিপতি গ্রহ মঙ্গল হওয়ায়, রামেশ্বরমের পুজোয় সমস্ত রক্তজনিত ব্যাধি ও শত্রুভয় দূর হয়। জীবনের বড় কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই জ্যোতির্লিঙ্গের স্মরণ করলে সফলতা নিশ্চিত হয়।
বৃষ রাশি (সোমনাথ, গুজরাট)
বৃষ রাশির জাতকদের জন্য গুজরাটের সমুদ্রতীরে অবস্থিত সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ প্রধান উপাস্য। চন্দ্রদেব স্বয়ং নিজের অভিশাপ মুক্তির জন্য এই পরম পবিত্র জ্যোতির্লিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করে শিবের আরাধনা করেছিলেন। এই রাশির অধিপতি গ্রহ শুক্র, যা ধন ও ঐশ্বর্যের কারক। শ্রাবণ মাসে সোমনাথের চরণে মন প্রাণ সঁপে দিলে জাতকের আর্থিক অনটন চিরতরে দূর হয়। পারিবারিক জীবনে সুখ ও মানসিক শান্তি ফিরে আসে। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের মন্দা কাটিয়ে নতুন জোয়ার আসে।
মিথুন রাশি (নাগেশ্বর, গুজরাট)
মিথুন রাশির জাতক-জাতিকাদের জন্য গুজরাটের দ্বারকার কাছে অবস্থিত নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ বিশেষ ফলদায়ী। নাগেশ্বর কথার অর্থ হল নাগ বা সর্পকুলের ঈশ্বর। এই জ্যোতির্লিঙ্গের আরাধনা করলে জাতকের কুণ্ডলীতে থাকা সমস্ত রকমের সর্পদোষ বা কালসর্প দোষ কেটে যায়। বুধ গ্রহের জাতকদের জন্য এই পুজো অত্যন্ত শুভ। এর ফলে জাতকের বুদ্ধি তীক্ষ্ণ হয় এবং বাচনিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি ঘটে।
ফাইল ছবি
কর্কট রাশি (ওঁকারেশ্বর, মধ্যপ্রদেশ)
কর্কট রাশির জাতকদের জন্য মধ্যপ্রদেশের নর্মদা নদীর তীরে পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ওঁকারেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মোক্ষদায়ক। এই দ্বীপটির আকার অবিকল হিন্দু ধর্মের পবিত্র প্রতীক 'ওঁ' কারের মতো। কর্কট রাশির অধিপতি গ্রহ হল চন্দ্র, যা মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণ করে। ওঁকারেশ্বরের পুজো করলে জাতকের মানসিক চঞ্চলতা ও অবসাদ দূর হয়। শরীর ও স্বাস্থ্যের দ্রুত উন্নতি ঘটে। আসন্ন শ্রাবণে এখানে জল ঢাললে সমস্ত মানসিক ইচ্ছা পূরণ হয়।
সিংহ রাশি (বৈদ্যনাথ, ঝাড়খণ্ড)
সিংহ রাশির জাতকদের জন্য ঝাড়খণ্ডের দেওঘরে অবস্থিত বৈদ্যনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ অত্যন্ত জাগ্রত। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, লঙ্কাধিপতি রাবণ কঠোর তপস্যা করে এই লিঙ্গটি নিয়ে যাচ্ছিলেন। শিব এখানে বৈদ্য বা চিকিৎসক রূপে বিরাজ করেন। সিংহ রাশির জাতকদের অধিপতি গ্রহ হল স্বয়ং সূর্য। বৈদ্যনাথের চরণে প্রার্থনা করলে জাতকের দীর্ঘদিনের ক্রনিক রোগব্যাধি দূর হয়। সমাজে মান-সম্মান, যশ, খ্যাতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা লাভের পথ সুগম হয়।
ফাইল ছবি
কন্যা রাশি (মল্লিকার্জুন, অন্ধ্রপ্রদেশ)
কন্যা রাশির জাতক-জাতিকাদের জন্য অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলম পর্বতের মল্লিকার্জুন জ্যোতির্লিঙ্গের পূজা করা শ্রেয়। এখানে শিব ও শক্তি অর্থাৎ মহাদেব এবং দেবী পার্বতী একসঙ্গে অবস্থান করছেন। বুধ গ্রহের জাতকদের জন্য এই স্থান পরম পবিত্র। মল্লিকার্জুনের আরাধনায় জাতকের পারিবারিক কলহ দূর হয় এবং ব্যবসায় দারুণ লক্ষ্মীলাভ ঘটে। কর্মক্ষেত্রে পদোন্নতির যোগ তৈরি হয়। এই শ্রাবণে মল্লিকার্জুনকে স্মরণ করলে বুদ্ধির বিকাশ ঘটে ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
তুলা রাশি (মহাকালেশ্বর, মধ্যপ্রদেশ)
তুলা রাশির জাতকদের জন্য মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শহরের ক্ষিপ্র নদীর তীরে অবস্থিত মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ প্রধান আশ্রয়। এটিই একমাত্র দক্ষিণমুখী জ্যোতির্লিঙ্গ, যা কাল বা মৃত্যুকে নিয়ন্ত্রণ করে। তুলা রাশির জাতকদের জন্য মহাকালের উপাসনা অত্যন্ত ফলদায়ী। মহাকালের ভস্ম আরতি দর্শন বা স্মরণ করলে অকালমৃত্যুর ভয় কেটে যায়। জীবনের সমস্ত আইনি জটিলতা এবং শত্রুতার অবসান ঘটে। জাতকের জীবনে স্থায়িত্ব আসে এবং মানসিক শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বৃশ্চিক রাশি (ঘৃষ্ণেশ্বর, মহারাষ্ট্র)
বৃশ্চিক রাশির জাতকদের জন্য মহারাষ্ট্রের ইলোরা গুহার কাছে অবস্থিত ঘৃষ্ণেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে শেষ বা দ্বাদশ তম জ্যোতির্লিঙ্গ। মঙ্গলের জাতকদের জন্য এই আরাধনা অত্যন্ত শুভ ফল এনে দেয়। ঘৃষ্ণেশ্বরের পুজোয় জাতকের জীবনের সমস্ত গোপন শত্রুতা ও ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের না হওয়া কাজ বা আটকে থাকা সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়। মনের সমস্ত নেতিবাচক চিন্তা দূর হয়ে পজিটিভ এনার্জি বাড়ে।
ধনু রাশি (কাশী বিশ্বনাথ, উত্তরপ্রদেশ)
ধনু রাশির জাতকদের জন্য উত্তরপ্রদেশের বারাণসীতে অবস্থিত কাশী বিশ্বনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ মোক্ষলাভের সেরা স্থান। মা গঙ্গার তীরে অবস্থিত এই ধামকে মহাদেবের প্রধান বাসস্থান বলা হয়। এই রাশির অধিপতি গ্রহ দেবগুরু বৃহস্পতি। কাশী বিশ্বনাথের কৃপায় জাতকের আধ্যাত্মিক চেতনা বৃদ্ধি পায় এবং উচ্চশিক্ষার পথ প্রশস্ত হয়। শ্রাবণ মাসে বিশ্বনাথের চরণে গঙ্গাজল অর্পণ করলে জীবনের সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে যায় এবং পরম সুখ লাভ হয়।
ফাইল ছবি
মকর রাশি (ত্র্যম্বকেশ্বর, মহারাষ্ট্র)
মকর রাশির জাতকদের জন্য মহারাষ্ট্রের নাসিকের কাছে গোদাবরী নদীর উৎপত্তিস্থলে অবস্থিত ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ পরম আরাধ্য। এই লিঙ্গের বিশেষত্ব হল, এখানে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর—এই তিন দেবতাই বিরাজমান। শনিদেবের এই রাশির জাতকদের জন্য ত্র্যম্বকেশ্বরের পুজো অত্যন্ত জরুরি। এর ফলে শনির সাড়ে সাতি বা ঢাইয়ার কুপ্রভাব সম্পূর্ণ কেটে যায়। কর্মজীবনে স্থায়িত্ব আসে, বেকারদের কর্মসংস্থান হয় এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে বিশাল সাফল্যের যোগ তৈরি হয়।
কুম্ভ রাশি (কেদারনাথ, উত্তরাখণ্ড)
কুম্ভ রাশির জাতকদের জন্য হিমালয়ের কোলে মন্দাকিনী নদীর তীরে অবস্থিত কেদারনাথ জ্যোতির্লিঙ্গ প্রধান ভরসা। মহাভারতের পাণ্ডবরা এখানে এসে মহাদেবের কৃপায় পাপমুক্ত হয়েছিলেন। শনির জাতকদের জন্য কেদারনাথের পুজো অত্যন্ত অলৌকিক ফল দেয়। কেদারনাথের স্মরণে জাতকের সমস্ত অলসতা দূর হয় এবং কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘদিনের ঋণ থেকে মুক্তি মেলে। আসন্ন শ্রাবণের পুণ্যলগ্নে কেদারনাথের আরাধনা করলে মোক্ষলাভের পথ সহজ হয়ে যায়।
ফাইল ছবি
মীন রাশি (ভীমশঙ্কর, মহারাষ্ট্র)
মীন রাশির জাতক-জাতিকাদের জন্য মহারাষ্ট্রের পুনের কাছে অবস্থিত ভীমশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ অত্যন্ত ফলদায়ী। ভীমা নদীর উৎসস্থলে অবস্থিত এই রুদ্রলিঙ্গ অসুর ভীমের দর্প চূর্ণ করতে আবির্ভূত হয়েছিল। বৃহস্পতির জাতকদের জন্য ভীমশঙ্করের পুজো বিশেষ কল্যাণকর। এর ফলে জাতকের মনের সব দুর্বলতা দূর হয় ও সাহস বৃদ্ধি পায়। সমাজসেবামূলক কাজে সাফল্য আসে। শ্রাবণ মাসে এখানে পুজো দিলে জীবনের সমস্ত অশান্তি কেটে গিয়ে অপার আধ্যাত্মিক আনন্দ লাভ হয়।
