shono
Advertisement
West Bengal Assembly Election

সশস্ত্র গুন্ডাদের নির্বাচন বানচাল, নির্বাচন থেকে সরে এসেছিলেন জ্যোতি বসু

’৭২ সালে নির্বাচনের দিন দুপুরবেলা জ্যোতি বসু সরকারকে জানালেন যে, তাঁর কেন্দ্রে কংগ্রেসিরা তাঁর দলের সমর্থকদের ভোট দিতে দিচ্ছে না। জ্যোতি বসু তাঁর এজেন্টদের সরিয়ে নিলেন। নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন। পরের দিন ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’-এর খবর: সশস্ত্র গুন্ডারা পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন বানচাল করে দিল। বঙ্গভোটের ইতিহাসের আজ নবম পর্ব।
Published By: Sucheta SenguptaPosted: 09:26 PM Apr 01, 2026Updated: 09:26 PM Apr 01, 2026

আজকের রাজনীতিতে ‘সেটিং’ এক জনপ্রিয় বিতর্ক। স্বাধীন ভারতে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্যের শাসকদলের ও বিরোধীদের সেটিং হচ্ছে কি হচ্ছে না, তা নিয়ে কত তর্কবিতর্ক, প্যানেল ডিসকাশন। কিন্তু অনেকেই ভুলে গিয়েছি যে, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় – যিনি ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ, কলকাতা থেকে রাজধানী দিল্লিতে বদল এবং শেষপর্যন্ত ভারতবর্ষ থেকে লর্ড কার্জনের বিদায় পর্বের সামগ্রিক ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা তৈরি করেন।

Advertisement

পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৯৭২ সালের সাধারণ নির্বাচন সাংঘাতিক একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। নির্বাচন ছিল ১১ মার্চ। সেইদিন দুপুরবেলা জ্যোতি বসু সরকারকে জানালেন যে, তাঁর কেন্দ্রে কংগ্রেসিরা তাঁর দলের সমর্থকদের ভোট দিতে দিচ্ছে না। আর সেখানে কোনও নির্বাচনই হচ্ছে না। জ্যোতি বসু তাঁর এজেন্টদের সরিয়ে নিলেন। কার্যত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন।  পরের দিন বম্বের বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’-এ খবর বেরল যে, সশস্ত্র গুন্ডারা পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন বানচাল করে দিল। বামপন্থীদের অভিযোগ যে অনেকটাই সত্যি, তা প্রমাণিত হতে লাগল নির্বাচনী ফলাফল বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে।

১৯০৫ সালের সেই তেজস্বী নেতা ‘সুরেন্দ্রনাথ’ ইংরেজদের কাছে ‘surender not’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। ১৯১১ সালের পর নরমপন্থী ও শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনের তিনি পক্ষপাতী হয়ে পড়লেন। ১৯১৯ সালে মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার সুপারিশকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বাংলার সরকারের স্বায়ত্তশাসক বিভাগের মন্ত্রীর পদ নিয়ে নিয়েছিলেন। এই ইংরেজ তোষণের ভূমিকা কিন্তু সেদিন অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। বাংলার বহু মানুষও। মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার সুপারিশকে কংগ্রেস বর্জন করল ঠিকই কিন্তু কংগ্রেস নির্বাচনী ব্যবস্থায় ‘কাউন্সিল এন্ট্রি’ প্রস্তাবকে গ্রহণ করল। দেশবন্ধুর ভাষায় ছিল 'to wreck it from within' অর্থাৎ শাসনতান্ত্রিক সংস্কারের সুযোগ নিয়ে এই সংস্কার পদ্ধতি চূর্ণ করতে হবে। এই কথাটা শুনলে আবার এদেশে কমিউনিস্টদের সংশোধনীয় ব্যবস্থায় প্রবেশ করে সেই ব্যবস্থাকে চূর্ণ করার রণকৌশলের মতো শোনায়।

স্যর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। ফাইল ছবি

বিধান রায়কে উত্তর কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কেন্দ্র বেছে নিতে বলা হল। ওই কেন্দ্র ‘ব্যারাকপুর কেন্দ্র’ নামে জনগণের কাছে বেশি পরিচিত ছিল। এই কেন্দ্র থেকে মনোনীত সদস্য রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্বায়ত্তশাসন বিভাগের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছেন। সেই সঙ্গে ‘স্যর’ উপাধি পেয়েছেন। কিন্তু তখন তাঁর জাতীয় জীবনে এই সবের কারণে জনপ্রিয়তা কিছুটা কমে গিয়েছিল। ‘সেটিং’-এর অভিযোগ উঠেছিল সুরেন্দ্রনাথবাবুর বিরুদ্ধে।

ভোট এগিয়ে এল! স্যর আশুতোষ তখন প্রথম বিধান রায়কে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে উৎসাহিত করলেন। বিধান রায়কে উত্তর কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কেন্দ্র বেছে নিতে বলা হল। ওই কেন্দ্র ‘ব্যারাকপুর কেন্দ্র’ নামে জনগণের কাছে বেশি পরিচিত ছিল। এই কেন্দ্র থেকে মনোনীত সদস্য রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্বায়ত্তশাসন বিভাগের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছেন। সেই সঙ্গে ‘স্যর’ উপাধি পেয়েছেন। কিন্তু তখন তাঁর জাতীয় জীবনে এই সবের কারণে জনপ্রিয়তা কিছুটা কমে গিয়েছিল। ‘সেটিং’-এর অভিযোগ উঠেছিল সুরেন্দ্রনাথবাবুর বিরুদ্ধে। বিধানবাবু স্যর আশুতোষের অনুপ্রেরণায় নির্দল প্রার্থী হিসেবে এই কেন্দ্র থেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। নির্বাচনী ইস্তেহার ঘোষণা করে দেন বলেন যে, তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হবেন না। তিনি নির্বাচনী প্রচার আরম্ভ করেন এই বলে যে, ‘তাঁর ভোটে জেতাই আসল লক্ষ্য নয়! সুরেন্দ্রনাথ যদি ইংরেজদের দেওয়া মন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে বেরিয়ে আসেন, তাহলে তিনি এই নির্বাচন থেকে তাঁর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করতে প্রস্তুত।’

স্যর আশুতোষের অনুপ্রেরণায় ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় তৎকালীন ব্যারাকপুর কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন দাখিল করলেন। ফাইল ছবি

এদিকে, বিধানবাবু যখন নির্দল প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন আসরে অনেকটা এগিয়ে গেলেন, তখন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন তাঁকে একদিন ডেকে পাঠালেন। দেশবন্ধু বিধান রায়কে বললেন যে, তাঁরা অর্থাৎ কংগ্রেস স্বরাজ্য দল উত্তর কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কেন্দ্রে সুরেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে তাঁকে দলীয় প্রার্থী করতে চান। দেশবন্ধু কংগ্রেসের প্রতিজ্ঞাপত্রে বিধানকে সই করতে বললেন। বিধান রায় বলেন যে, কংগ্রেসের আদর্শের সঙ্গে তাঁর কোনও বিরোধ নেই, কিন্তু এখন তিনি প্রতিজ্ঞাপত্রে সই করবেন না। কারণ তিনি ইতিমধ্যেই নির্দল প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি কংগ্রেস স্বরাজ্য দলের প্রার্থী হলে ভোটারদের কাছে তো তাঁর মুখ থাকবে না!

দেশবন্ধু একটু অসন্তুষ্ট হলেন বিধান রায়ের উপর। তিনি বললেন, কংগ্রেস যদি ওই কেন্দ্রে আলাদা প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন, তাহলে বিধান তোমার নির্বাচনী ভাগ্য কী দাঁড়াবে? বিধান রায় জবাবে বললেন, তাহলে খুব দুর্ভাগ্যজনক হবে। সুরেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে ভোট ভাগ হবে। কিন্তু তাঁর কংগ্রেসের প্রার্থীপদ গ্রহণের তাতেও কোনও পথ নেই। কেননা তিনি যেটা বলেছেন, সেটা তাঁর নৈতিক অবস্থান। এখন হেরে যাওয়ার ভয়ে তিনি তাঁর নৈতিক অবস্থান বদলাবেন না। কয়েকদিন পর দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন ঘোষণা করলেন উত্তর কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কেন্দ্রে স্বরাজ্য দল কোনও আলাদা প্রার্থী দেবে না। তাঁরা ডক্টর বিধান রায়ের প্রার্থীপদকেই সমর্থন করবে। তার ফলে বিধান রায় স্বরাজ্য দল সমর্থিত প্রার্থী হলেও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন তাঁর দলের অন্যান্য প্রার্থীর মতোই ওই নির্বাচন কেন্দ্রে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিলেন। কারণ উত্তর কলকাতার মিউনিসিপ্যাল কেন্দ্রে এই নির্বাচনকে দেশবন্ধু নিজের মর্যাদার লড়াই বলে ধরে নিয়েছিলেন।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। ফাইল ছবি

বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯২২ সালের এই ভোট ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে সারা দেশ এই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে ছিল। ১৯২২ সালের ৩০ নভেম্বর উত্তর কলকাতার মিউনিসিপাল কেন্দ্রে ভোটের ফল ঘোষণা হল। বাঙালির রাজনৈতিক জীবনে এক তড়িৎ প্রবাহ ফেলে গেল। অপরিচিত পরিশোধীয় রাজনীতিতে একেবারেই নবাগত। বিধান রায় বিপুল ভোটে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথকে পরাজিত করলেন। বিধান রায় পেলেন ৫৬৮৮ ভোট। সুরেন্দ্রনাথ পেলেন ২২৮৩ ভোট। বিধান রায়ের বয়স তখন মাত্র ৪২। এই নির্বাচনের কয়েক বছর পর স্যর প্রভাসচন্দ্র মিত্র বঙ্গীয় আইন পরিষদের বিধান রায়ের এই জয়লাভ সম্পর্কে অভিযোগ করেন যে, বিধান সুরেন্দ্রনাথের মতো একজন মানুষকে দেশের জনজীবন থেকে একেবারে তাড়িয়ে দিলেন। বিধান রায় কিন্তু বিনীত হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন, ''দেশের রাজনৈতিক জীবনে রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ যে অবদান রেখে গিয়েছেন, দেশবাসী তা কখনও ভুলবে না। আমি সুরেন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। ব্যক্তি হিসেবে তাঁর বিরোধিতার জন্য নয়, সুরেন্দ্রনাথ মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করে নিজেকে ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের সঙ্গে একাত্মবোধ করে ফেলেন। আমি তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এইরকম নৈতিকতার রাজনীতি, এরকম ভোটের রাজনীতি আমরা ভাবতেই পারি না!''

কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডরে চেপে এবার সেই বিধান রায়ের সময় থেকে চলে এলাম ১৯৭২ সালের নির্বাচনে। ১৯৭২-এর নির্বাচন যারা দেখেনি তারাও কিন্তু জানে যে, কী হইহই হয়েছিল দেশে-বিদেশে ৭২-এর নির্বাচন নিয়ে। বামপন্থী দল নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে বিধানসভা বয়কট করেছিল। বিরোধী দলহীন বিধানসভা গণতন্ত্রের মর্যাদা অনেকটা ক্ষুণ্ণ করেছিল। এই সময় ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিক’ ছদ্মনামে বইটি লেখার একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আসলে কে লিখেছিলেন, আমি ঠিক এখনও জানি না। সেই সময় তিনি তাগিদ অনুভব করেন যে, এই নির্বাচন নিয়ে একটা তদন্তের ব্যবস্থা হোক। পুরোটাই ঘটল ব্যক্তিগত উদ্যোগে। তাঁর বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী সাংবাদিক নির্বাচন কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করেছিল। ২৮০টি কেন্দ্রে কারচুপি হয়েছিল কি হয়নি – সে সম্পর্কে একটা রিপোর্ট তৈরি করেছিল তারা। এরপর তিনি ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিক’ ছদ্মনামে একটি বই সম্পাদনা করে প্রকাশ করেন। বইয়ে ২২ জন খ্যাতিমান সাংবাদিক মতামত পেশ করেন। বর্তমানে এই বই বাজারে অমিল। বইটির নাম ছিল: ‘৭২-এর ভোট।’ লেখকের নাম ‘নিরপেক্ষ সাংবাদিক’। প্রকাশক: অনির্বাণ প্রকাশনী, ৩ এ গঙ্গাধর বাবু লেন, কলকাতা-১২। সেকালে দাম ছিল ১০ টাকা।

উত্তর ২৪ পরগনার বারাকপুর অঞ্চলে, বর্ধমানে, হাওড়ার শিল্পাঞ্চলে, বিভিন্ন কেন্দ্রে দেখা গেল যে, বামপন্থী প্রার্থীরা অনেকেই যাঁরা পুরনো সদস্য – তাঁরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হচ্ছেন। বরানগরের জ্যোতি বসু, দমদমে তরুণ সেনগুপ্ত, নাদনঘাটে মনসুর হাবিব, নোয়াপাড়ায় যামিনীভূষণ সাহা, পানিহাটিতে গোপাল ভট্টাচার্য, কামারহাটিতে রাধিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়নগরের সুবোধ বন্দোপাধ্যায় – এরকম বহু নেতার পরাজয় স্বাভাবিকভাবে খুব সন্দেহের উদ্বেগ করল।

এই বই নিখিল চক্রবর্তীর নিজস্ব সংগ্রহে ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর বহু বই দিল্লির চিত্তরঞ্জন লাইব্রেরিতে দান করা হয়। সেখান থেকেই এই বইটি আমি পাই। অনেক বিশিষ্ট সাংবাদিকের ভোটের অভিজ্ঞতাও পড়ে ফেললাম। কী অদ্ভুত ব্যাপার! বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মতো সাংবাদিক, তিনি লিখছেন যে, ‘নির্বাচনের কারচুপি ও ভীতি প্রদর্শনের ব্যাপারে সিপিএম যে অভিযোগ করেছে, তা মূলত ভিত্তিহীন নয়। অনেক জায়গায় ভোটদাতাদের নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়। ইলেকশন এজেন্টদের ভীতি প্রদর্শন করা হয়। সত্যিকার ভোটারদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে একথা বলছি।’

কে বলছেন? না, বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়! পশ্চিমবঙ্গে ২৮০টি ভোটকেন্দ্রেই যে কারচুপি এবং ভীতি প্রদর্শন হয়েছে, তা আমি বিশ্বাস করি না। কিন্তু আমার যতদূর অনুমান, যেখানে-যেখানে সিপিএম এবং বামপন্থী জোটের শত্রু ঘাঁটি ছিল সেখানে-সেখানে নির্বাচনে নিদারুণ কারচুপি হয়েছে। সেইদিক থেকে এই নির্বাচনকে স্বাচ্ছন্দ্য, নিরুপদ্রব এবং অবাধ নির্বাচন বলা যায় না। এইসব সত্ত্বেও কংগ্রেসের এবার জয় কারচুপির জন্যই ঘটেছে, একথা সত্য নয়। কিন্তু সম্ভবত প্রায় ৫০টি আসনে এটা হয়েছে। বাকি আসনে কংগ্রেসের জয়লাভ অন্যায়ভাবে ঘটেছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির যারা খবর রাখে, তারা জানে এই ভোটে কী কাণ্ড হয়েছিল!

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, অতীতেও এরকম ভোট নিয়ে ভয়াবহ বুথ ক্যাপচারিং এবং রিগিংয়ের ইতিহাস আছে। সেই একই অভিযোগ এখনও তাড়া করে ফিরছে পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রকে!

পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ১৯৭২ সালের সাধারণ নির্বাচন সাংঘাতিক একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা। কল্পনার সাদা অ্যাম্বাসাডরে চেপে আমি পৌঁছে গিয়েছি সেই ’৭২ সালের নির্বাচনের দিন ১১ মার্চ। সেইদিন দুপুরবেলা জ্যোতি বসু সরকারকে জানালেন যে, তাঁর কেন্দ্রে কংগ্রেসিরা তাঁর দলের সমর্থকদের ভোট দিতে দিচ্ছে না। আর সেখানে কোনও নির্বাচনই হচ্ছে না। জ্যোতি বসু তাঁর এজেন্টদের সরিয়ে নিলেন। কার্যত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন। সন্ধ্যা নাগাদ আরও বহু অঞ্চল থেকে এইরকম অভিযোগ শোনা গেল। পরের দিন বম্বের বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইকোনমিক টাইমস’-এ খবর বেরল যে, সশস্ত্র গুন্ডারা পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন বানচাল করে দিল। বামপন্থীদের অভিযোগ যে অনেকটাই সত্যি, তা প্রমাণিত হতে লাগল নির্বাচনী ফলাফল বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে।

'৭২-এর নির্বাচনে গুন্ডামির কথা শুনে জ্যোতি বসু নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। ফাইল ছবি

উত্তর ২৪ পরগনার বারাকপুর অঞ্চলে, বর্ধমানে, হাওড়ার শিল্পাঞ্চলে, বিভিন্ন কেন্দ্রে দেখা গেল যে, বামপন্থী প্রার্থীরা অনেকেই যাঁরা পুরনো সদস্য – তাঁরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হচ্ছেন। বরানগরের জ্যোতি বসু, দমদমে তরুণ সেনগুপ্ত, নাদনঘাটে মনসুর হাবিব, নোয়াপাড়ায় যামিনীভূষণ সাহা, পানিহাটিতে গোপাল ভট্টাচার্য, কামারহাটিতে রাধিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়নগরের সুবোধ বন্দোপাধ্যায় – এরকম বহু নেতার পরাজয় স্বাভাবিকভাবে খুব সন্দেহের উদ্বেগ করল। সন্দেহ বাড়তে থাকল যখন দেখা গেল বামফ্রন্টের প্রত্যেকটা শরিক দলের প্রতিটা বড় নেতা পরাজিত হল। আর বেশিরভাগই খুব কম ভোট। ’৭১ সালেও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন হয়েছিল। তখন বামফ্রন্টের মিলিত আসন সংখ্যা ছিল ১২৫। আর এক বছরের ব্যবধানে সেই আসন সংখ্যা কমে দাঁড়াবে ২০-তে। এটা বিশ্বাস করা খুব কঠিন। বিশেষ করে যখন দেখা যায়, ১৯৬৭ সাল থেকে বামপন্থীদের আসন সংখ্যা প্রতিটি পরবর্তী নির্বাচনে বেড়েছে বরং কমেনি। তাহলে নির্বাচনে জোচ্চুরি হয়েছে।

বামফ্রন্টদের এই অভিযোগ শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের তরফ থেকেও সরাসরি প্রত্যাখ্যাত হল না! কংগ্রেসের অনেক নেতা বললেন, জোচ্চুরি এই প্রথম হয়নি। সিপিএমও আগে বহু জালিয়াতি করেছে। তাঁদের মতে, এইবার মার্কসবাদী কমিউনিস্টদের বিশেষ যন্ত্র কাজ করেনি, তাই এইবার ওই দলের বিপর্যয়! কিন্তু পাল্টা অভিযোগ করে কি মূল অভিযোগ কাটানো যায়? জয়প্রকাশ নারায়ণের মতো প্রবীণ নেতা যিনি নিশ্চয়ই মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির এসইউসিআই-এর সমর্থক নন। যখন তদন্তের প্রয়োজনের কথা অনুভব করে বসলেন, তখন আর অভিযোগের কথা ‘ভিত্তিহীন’ বলা হল না। ভোটগ্রহণ অবাধ এবং ন্যায়সংগত উপায়ে যদি না-হয়ে থাকে, তাহলেও তদন্ত হওয়া উচিত বলে দাবি উঠল। ক্রমশ বিভিন্ন সাংবাদিক তাঁরা বললেন, লিখলেন এবং প্রমাণিত হয়ে গেল, ভোটে কারচুপি হয়েছে। এই বইটিতে যেসব বিশিষ্ট সাংবাদিক লিখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে যেমন বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় ছিলেন, তেমনই ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন বসু, ছিলেন ধীরেন ভৌমিক, ধীরেন বসু, জীবনলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অজিত চক্রবর্তী, সুমন্ত সেন, অরুণ বাগচি, মহেন্দ্র চক্রবর্তী, সত্যেন সেন, তুষাররঞ্জন পত্রনবিশ, গৌরকিশোর ঘোষ – এরকম আরও অনেকে।

শেষপর্যন্ত এই দিনটা গণতন্ত্রের ঘন কালো দিন হয়ে রইল। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, অতীতেও এরকম ভোট নিয়ে ভয়াবহ বুথ ক্যাপচারিং এবং রিগিংয়ের ইতিহাস আছে। সেই একই অভিযোগ এখনও তাড়া করে ফিরছে পশ্চিমবঙ্গের গণতন্ত্রকে!

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement