ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে ফের রহস্য মৃত্যু পুরুলিয়ার পরিযায়ী শ্রমিকের। মহারাষ্ট্রের পুনের পর এবার কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে এই ঘটনা ঘটলো। মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের নাম প্রসন্ন কুমার (৩৯)। বাড়ি ঝালদা দু'নম্বর ব্লকের চেক্যা গ্রাম পঞ্চায়েতের চেক্যাতে। এই গ্রামটি পুরুলিয়ার কোটশিলা থানার অন্তর্গত। বাড়তি রোজগারের আশায় গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে বেঙ্গালুরুতে কাজে গিয়েছিলেন তিনি। এরপর একাধিকবার বাড়ি ফেরার ইচ্ছাপ্রকাশ করলেও তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ঠিকাদার সংস্থা আটকে রাখে বলে অভিযোগ। এমনকি ৩-৪ বার লুকিয়ে কর্মস্থল থেকে স্টেশনে আসার পরেও ওই ঠিকাদার সংস্থা ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
গত বৃহস্পতিবারও পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা হয় প্রসন্নের। সেই সময়েও খুব শীঘ্রই বাড়ি ফিরবেন বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু এর মধ্যেই অঘটন! শুক্রবার ঘুমন্ত অবস্থায় ওই রাজ্যেই মৃত্যু হয় প্রসন্নের। পরিবারের অভিযোগ, খুন করা হয়েছে তাকে। এমনকী প্রসন্নের মাথা, ডান হাতের আঙুল, নাকে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছে পরিবার। এদিকে খবর পেয়েই মৃত পরিযায়ী শ্রমিকের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর উদ্যোগে দেহ দ্রুত বাড়িতে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের পাশে থাকারও আশ্বাস দিয়েছেন ডায়মন্ডহারবারের সাংসদ। একইসঙ্গে আইনি সহায়তা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সাহায্য করার কথাও জানান তিনি।
প্রসন্নের অভাবের সংসার। বাড়িতে স্ত্রী এবং দুই ছেলে। এক ছেলে এবার মাধ্যমিক দিয়েছে। আরেকজন নবম শ্রেণীর ছাত্র। তাদের রেখেই গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বেঙ্গালুরুতে পাড়ি দিয়েছিলেন প্রসন্ন। বেঙ্গালুরুর সাম্পিগেহাল্লি থানা এলাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ড্রাইভারের কাজ করতেন তিনি। ঠিকাদার সুষেনকুমার তেওয়ারির অধীনে এই কাজ করতেন। পরিবারের অভিযোগ, প্রায় এক বছর কেটে গেলেও তাকে বাড়িতে ফিরতে দেওয়া হয়নি। এই নিয়ে তিনি স্ত্রী কুন্তি কুমার ও পরিবারের কাছে আক্ষেপ করতেন বলেও দাবি।
গত বৃহস্পতিবারও স্ত্রী-র সঙ্গে রাত পর্যন্ত কথা হয় প্রসন্নের। সেই সময়েও খুব শীঘ্রই বাড়ি ফিরবেন বলে জানান। কিন্তু পরের দিন অর্থাৎ শুক্রবার সকাল থেকে তার সঙ্গে কোনওভাবেই যোগাযোগ করা যায়নি। যা নিয়ে ক্রমশ উদ্বেগ বাড়ছিল পরিবারের। বারবার ফোন করেও কোনও সাড়া মিলছিলো না। এর মধ্যেই ফোনে পরিবারকে জানানো হয়, প্রসন্ন আর নেই। ঘুমন্ত অবস্থাতেই মৃত্যু হয়েছে তার। এরপরেই কান্নায় ভেঙে পড়ে পরিবার। মৃতের শ্যালক গুরুবন্থ কুমারের অভিযোগ, ''প্রসন্নকে খুন করা হয়েছে। ডান হাতের আঙুলে আঘাত রয়েছে। আঘাত রয়েছে মাথায় এবং নাকেও।''
তাঁর কথায়, শুধু বাড়ি ফিরতে দেওয়া হয়নি তা নয়। ২০ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হবে বলেও তা দেওয়া হতো না ঠিক মতো। ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পরিবার। শুক্রবার মৃতদেহ উদ্ধার হলেও শনিবার বিকাল পর্যন্ত ময়নাতদন্ত হয়নি। পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের জেলা সভাপতি উজ্জ্বল কুমার বলেন, "পরিবারের তরফে আমাকে জানানোর পর মৃতদেহ দ্রুত ফেরানোর চেষ্টা করি। কিন্তু সেখানকার পুলিশ সাহায্য না করায় আমি কলকাতায় গিয়ে আমাদের নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অফিসে যোগাযোগ করি। আমাদের নেতার হস্তক্ষেপে কাজ হয়। তবে শনিবার বিকাল পর্যন্ত ময়নাতদন্ত হয়নি।"
পুরুলিয়া জেলা তৃণমূলের সভাপতি তথা বান্দোয়ানের বিধায়ক রাজীব লোচন সরেন বলেন, " অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে গিয়েই বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের রহস্য মৃত্যু হচ্ছে। আমরা পরিবারের সঙ্গে দেখা করেছি। তাদেরকে বলেছি আমরা পাশে আছি।"
কয়েকদিন আগেই মহারাষ্ট্রের পুণেতে কাজে গিয়ে খুন হন কুড়মি পরিযায়ী শ্রমিক সুখেন মাহাতো। তার বাড়ি পুরুলিয়ার জঙ্গলমহল বরাবাজারের তুমড়াশোলের বাঁধডিতে। যা নিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে রাজ্য-রাজনীতি। ঘটনার পরেই পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে ফের ভিন রাজ্যে কাজে গিয়ে রহস্যমৃত্যু পুরুলিয়ার শ্রমিকের।
